গাঙ্গুলিবাবু সকাল থেকে খবরের কাগজের অপেক্ষায় বসে। ৯ টা বাজতে চললো এখনো টাবলুটার পাত্তা নেই। এতো বেলা করলে তো খবরটা ও বাঁশী হয়ে যায়। কি আর হবে তখন খবর পড়ে। সকাল সকাল মেজাজটা ও খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
বারান্দায় হালকা রোদ এসেছে, টবের গাছগুলো বেশ চনমন করছে। শীতকালের ফুলের গাছগুলো কি রঙিন। আজকাল আকাশের রঙটাও বেশ নীল নীল লাগে।সেটা মনে হয় কোরোনার এই দয়া। করোনা র কিছু কিছু ভালো অবদান ও আছে। গাঙ্গুলিবাবুর মনে পড়ে না কত বছর আগে নীল আকাশ দেখেছে। নীল তো দূরের কথা, বারান্দা থেকে আকাশ দেখার সৌভাগ্য ই বা আজকাল কতজনের হয় এই কলকাতা শহরে। নেহাত ওনার সামনে প্রাইমারি স্কুল এর মাঠ তাই ভাগ্গি , নাহলে কবে প্রোমোটারের হাতে চলে যেত।
রান্নাঘর থেকে খুটখাট শব্দ এসেই চলেছে। গিন্নি সারাদিন যে রান্নাঘরে কি করে, কে জানে। সেই তো Lunch এ ডাল , ভাত, পোস্ট আর মাছ কিছু বললেও মুশকিল - ইদানীঙ মেজাজটা ও তুঙ্গে থাকে। গাঙ্গুলী বাবুর মনে হয় সকালের চা তা একটু দুজনে মাইল বসে খাবে। সে আর হয়না। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরেও গাঙ্গুলী বাবুর routine এ বিশেষ পরিবর্তন আসেনি। উনি সাত সকালেই ঘুম থেকে উঠে Morning walk তা সেরে ফেলেন। কলকাতার বাঙালিরা বেলা অব্দি ঘুমোতে ভালোবাসে, তাই গাঙ্গুলী বাবু নিরিবিলিতে সাত সকালে একটু বাইরের হাওয়া খেয়ে আসেন। সকালের বাজারের প্রথম খদ্দের দেড় মধ্যে গাঙ্গুলী বাবু ধরা বাঁধা। বৈণির দর কষাকষির সুবিধে তও পেয়ে যান। অবসর নেওয়ার পর সাধারণত তিনি সকাল থেকে তিন বার বাজার যেতেন। শেষ বার যখন বাজার উঠে যাওয়ার সময়, তখন বেশ দর দাম করা যেত। আনন্দবাজারে প্রকাশিত দিনের সবজির দামের চেক্যে যদি কমে ভালো জিনিস আন্তে পারতেন তাহলে বেশ খোশ মেজাজে থাকতেন। নিজেকে ওনার বেশ সম্পন্ন বলে বলে মনে হতো। আজকাল তো করোনা র দোয়ায় বাজার খালি একবার যাওয়া। কিন্তু সকালের বৈণি তা বেশ কাজের। সেই কোনো না কোনো উপায় বেরিয়ে যাই আর মানুষ নিজের দৈনিন্দিন জীবন চালিয়ে যায়।
বাজার থেকে ফিরে তো আজকাল ধোয়া ধুয়ি ও অনেক বেড়ে গেছে। বাড়ি ফিরেই গাঙ্গুলী বাবু আলু পেয়াঁজের সাথে নিজের স্নান টাও সেরে ফেলেন। স্নান আর পুজো সেরে সকালের জলখাবার এর সাথে খবরের কাগজ নিয়ে বসেন। তা আর আজকে হলো কি টাবলু তা সব মাটি করে দিলো। কতবার ওকে বলা হয়েছে খবরের কাগজ দিতে দেরি না করতে। কিন্তু কে কার কথা শোনে। রোজ এই দেরি করে, তবে জলখাবারের আগে চলে আসে. আজকে তো তও হলো না। যাগ্গে কাগজ টা আসলে না হয় আরো এক কাপ চা খাওয়া যাবে।
আজকের জলখাবার তা মন্দ ছিল না - পরোটা আর আলুর তরকারি। সঙ্গে মিষ্টি হলেই ভালো বলা যেত। মিষ্টি ভাবতেই জানুলজি বাবুর পাড়ার ' গোপাল স্বীটস 'এর কথা মনে পড়লো। গত সপ্তাহে মিষ্টি নিতে গিয়ে দেখে দোকানটা বন্ধ। পরের দিন ও এক। পাশের ফুলওয়ালী জমি টা নাকি disputed ছিল। যাহঃ বাবা ,এতো কাল ধরে দোকানটা ছিল। যকুরদাদার হাতে মিষ্টি খেলাম, বাবার হাতে খেলাম আর এই ছেলের হাথে এলো, আর এতদিনে জানা গেলো জমি টা disputed. আজকাল কি যা হয় বলা যাই না. মিষ্টির দোকানটা খালি গাঙ্গুলী বাবুর পছন্দের দোকান ছিল না, পাড়ার সবার প্রিয় দোকান। ওরম কাঁচাগোল্লা আর কোথাও খায়নি গাঙ্গুলী বাবু। গাঙ্গুলী বাবু র মেয়ের ও খুব পছন্দের দোকান ছিল। গতকাল মেয়েকে অহনে জানালে তার তো খুব মন খারাপ। এবার শীতের নলেন গুড় এর সন্দেশ খেতে সেই ২ মাইল হেঁটে 'সত্যনারায়ণ মিষ্টান্ন' যেতে হবে। মিষ্টি তো ভালো ছিলই , তার ওপর আবার ডোনাকের নামটা গাঙ্গুলী বাবুর বাবার নাম এ ছিল তাই একটু বেশি যেন কাছের লাগতো। কোথায় যে কিভাবে সম্পর্ক তৈরী হয়ে যাই বোঝা যাই না - তবে না মানুষের মন।
যাইহোক এই সব ভাবতে ভাবতে হটাৎ গাঙ্গুলী বাবুর মনে হলো পাশের 'ইস্টার্ন স্বীটস' এর কিছু কারসাজি নেই তো এই দোকানটা বন্ধ করার জন্যে। কয়েক ম্যাশ আগেই ব্যাটারা দোকান নতুন দোকান খুলেছিলো। মিষ্টি যে এতো অখাদ্য বানানো যাই আর তারপর সেটা কলকাতার বাজারে বিক্রি করার আস্পর্ধা ও দেখানো যাই সেটা দেখে গাঙ্গুলী বাবুর বেশ অবাক এই হতেন। বেশিদিন অবশ্য তাঁকে অবাক হতে হয়নি। এক ম্যাশ পরেই সেই মিষ্টির দোকান বন্ধ হয়ে গেলো। পাশের মিষ্টির দোকানে line আর সে মাছি মারে - এতো কিছু সহ্য করেও সে গোটা তিরিশ দিন দোকান খোলা রেখেছিলো - দম আছে বলে হবে। আজ বাজার থেকে ফেরার পথে তো দেখলো সে আবার দোকান খুলেছে। খুব মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করলেও গাঙ্গুলী বাবু ওর দোকানের মিষ্টি কিছুতেই খাবেন না - ওটা মিষ্টির অপমান। পাশের ময়রার উন্নতি আর সহ্য হলো না মনে হয়। নিশ্চই ইয়ারি কিছু লাগিয়েছে। হিংসে ই আমাদের বোরো শত্রু। তবেই না বাঙালি কে কাঁকড়ার জাতি বলা হয়।
এই সব ভাবতে ভাবতে গাঙ্গুলী বাবু টিভিটা চালালো। বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্ক এই খবরের কাগজ আর টিভি দিয়ে। করার সাথে তো কথা বলা ও মণ এই করোনা র জগতে। টিভি টেউ বা কি দেখবে। সেই এক খবর - কোথায় কত করোনা বাড়লো। বিরক্ত লাগছে এক খবর শুনতে। এই সব খবরেও মনটা ও খারাপ হয়ে যায়। গতকাল তবু ও ২৬ এ জানুয়ারী র প্যারেড আর ঝাঁকি দেখা গেছিলো। আজকে আবার সেই। কতদিন হয়ে গেলো একটু বেড়াতে যাওয়া হয়নি , বন্ধুদের সাথে দেখা হয়নি , একটু প্রাণ খুলে আড্ডা মারা যায়নি। গাঙ্গুলী বাবু র ছোটবেলার স্কুলের কিছু বন্ধুর সাথে দারুন যোগাযোগ। বছরে কম করেও তিন চারবার দেখা তো হয়েই যায়। তারপর তারা আবার Annual All Boys Trip এও যায়। সেই সময় গাঙ্গুলী বাবুর মনেই হয় না এতো কোটা বছর কেটে গেছে। বন্ধুদের সাথে trip টা Time - machine এর মতন কাজ করে - তিনি আবার স্কুল এ দেন এ ফিরে যান, মনটাও তাজা হয়ে ওঠে।
এই কোটা দিন গাঙ্গুলী গিন্নি বেশ নিশ্চিন্ত থাকে। বাড়িতে অসময়ে লোক আসবে না আর তাঁকে ঘন ঘন অতিথি আপ্পায়ন করতে হবে না। ভেবেই গাঙ্গুলী গিন্নির mood ভালো হয়ে যায়।
বন্ধুদের কথা ভাবতে ভাবতে গাঙলু বাবু ফোঁটা করেই ফেললেন। আজকাল এই Whats App এর দয়ায় বেশ গ্রুপ video কল করা যায় , আর টাকা ও লাগে না। ভাবা যাই ফোন করবো আর টাকা লাগবে না। সত্যি কত ই না উন্নতি করলো মানুষ। এই whats app টা গাঙ্গুলী বাবুর বেশ পছন্দের। দুধের স্বাদ ঘোলে হলেও কিছুতে তো অবস্বই মেটে। বন্ধুরা বেশ virtually আড্ডা দেওয়া যাচ্ছে। এদিক ওদিক কার গল্প হলো, এদিক ওদিকের খবরের আলোচনা হলো। ঠিক এই সময় আবার গাঙ্গুলী বাবুর আজকের খবরের কাগজ না পড়তে পাড়ার দুঃখ উঠে এলো। টাবলুর খুব করে নালিশ করলো বন্ধুদের কাছে। কাল আসুক হচ্ছে ওর। যেই না বলা অমনি ওপাশ থেকে ভৌমিক বলে উঠলো - ' কি রে গাঙ্গুলী গতকাল তো ২৬ এ জানুয়ারী ছিল, আজকে তো খোনোর কাগজ বন্ধ।' এটা গাঙ্গুলী কি করে ভুলে গেলো। Army তে ছিলেন। ১৫ এই অগাস্ট, ২৬ এ জানুয়ারী, ২ এ অক্টোবর যে প্রেস হলিডে সেটা তার ভুল হওয়ার কারণ এই না। গতকাল ২৬ এ জানুয়ারী র প্যারেড ও দেখলেন। ভেবেই তার মনটা খারাপ হয়ে গেলো, বললো - ' বুঝলি ভৌমিক এই করোনা র জন্যে বাড়িতে বসে বসেই বুড়ো হয়ে গেলাম।'