শনিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

জনপ্রিয় হওয়ার সহজ উপায়

গত বছর আমি একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম - রোগা  হওয়ার সহজ উপায়।  তাতেই অনুপ্রেণীত হয়ে এই "সহজ উপায়" সিরিজ এর পরবর্তী সংখ্যা - জনপ্রিয় হওয়ার সহজ উপায়। 

হঠাৎ জনপ্রিয় হওয়ার এতো সখ ? আমার একটা সমস্যা আছে - সহানুভূতিশীল মানুষ বলে social anxiety, আমার বৌ বলে অসভ্যতা। এবং এই social anxiety এর ঠেলায় বেশ কিছু বিপদে পড়তে হয়েছে আমাকে। গত শনিবার বাজার করতে গেছি ।  খুব মনোযোগ দিয়ে বাছাই করে কাঁচা লঙ্কা ঝোলায় ভরছি, হঠাৎ মুলো শাকের পাতার ফাঁক দিয়ে দেখি ফুলকপি বোঝাই শপিং cart নিয়ে রিনা দি আবির্ভাব।  রিনা দি মানুষ টা খুবই ভালো।  ভালো গান গায়, আবৃতি করে, দারুন বিরিয়ানি বানায় - ওই শেষ কারণ তার জন্য এখানের বাঙালি মন্ডলী তে বেশ জনপ্রিয়ও। কিন্তু আমার নাচ, গানের কোনো ট্যালেন্ট  নেই।  আর ইদানিং high cholesterol ধরা পড়ায় বিরিয়ানি খাওয়াও বন্ধ।  আর রিনা দি বোধয় গাড়ি / মোটরসাইকেল এর বিষয়ে খুব একটা উৎসাহী হবে না।  তাই রিনা দির সাথে conversation টপিক নেই।  আর আউট অফ syllabus টপিক এ আলোচনা করা প্রতিভা আমার নেই। তাই একটা awkward পরিস্থিতি এড়াতে কাঁচা লঙ্কার ঝোলা ফেলে আমি দৌড় লাগল নিরাপদ জায়গার সন্ধানে।  এক অভিজাত, সংস্কৃতিবান, রবি ঠাকুর ভক্ত, মধ্য বয়স্ক বাঙালি মহিলার পক্ষে Walmart এর Health & fitness section এ পদার্পন করার সম্ভবনা খুবই ক্ষীণ।  তাই আমি সেই দিকেই পা বাড়ালাম ।  Protein powder এর rack এর পিছনে মাথা গোজার স্থান পেলাম। এখন কিছুক্ষন দম বন্ধ করে লুকিয়ে থাকতে হবে।  দোকানের কর্মচারীদের সন্দেহ এড়াতে আমি একটা দুটো protein powder এর কৌটো নাড়াচাড়া করে দেখছি।  বিজ্ঞের মতন তাদের গায়ে সাঁটানো লেবেল গুলো পড়ছি আর গম্ভীর ভাবে মাথা নাড়ছি। Vanilla আর chocolate প্রোটিন powder এর গুণাবলী তুলনা করছি এমন সময় পেছন থেকে ডাক এলো - "Need help ?" - পিছন ফায়ার দেখি এক গাল হাসি নিয়ে রিনা দি আমার দিকে এগিয়ে আসছে। উত্তরের অপেখ্যা না করেই রিনা দি আমার  হাত থেকে কৌটো গুলো কেড়ে নিয়ে বললো - "অরে এগুলো একদম বাজে - আয়ে তোকে ভালো জিস তা দেখিয়ে দি" - আমি আমতা আমতা করে একটা ক্ষীণ প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলাম।  কিন্তু তাতে পাত্তা না দিয়ে রিনা দি বললো - "আমার ছেলে রোজ gym করে।  Muscle বিল্ড করার জন্য ও এইটা খায়" - বলে একটা বিরাট টিনের ডিব্বা আমার cart এ নামিয়ে দিলো। "এতে pure whey protein আছে. নো সুগার, নো কলেস্টেরল।  ৩০ গ্রাম প্রোটিন। দু দিনে দারা  সিং হয়ে জাবি। ". আমি অনেক কষ্টে একগাল হাসি এনে বললাম "ভাগ্গিশ তোমার সাথে দেখা হয়ে গেলো, নয়তো এতো ভালো জিনিসটার কথা আমি জানতেও পারতাম না"।  রিনা দি উৎসাহের সাথে বললো "Ofcourse, আমাদের বাড়ি ভীষণ health conscious, gym, yoga, Zumba এসব আমাদের চলতেই থাকে। দারা তোকে আমাদের লোকাল fitness freak watsapp গ্রুপ তাতে add করে দি।  ভালো টিপস পেয়ে জাবি। " এই পুরো কথোপকথন এ আমার একমাত্র যোগদান ছিল একটা বিনয়ের হাসি আর বাধ্য ছেলের মতন মাথা নাড়া। "তোর হয়ে গেছে না আরো কিছু নিবি ?" রিনা দি জিগেশ করলো।  পাছে এখন কাঁচা লঙ্কা বাঁচতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, সেই ভয়ে - প্রোটিন পাউডার এর তিন এর দিকে দেখিয়ে বললাম।"না না এইতো ব্যাস এটাই নেবার ছিল"  . বাকি বাজার চুলোয় যাক।  আপাতত পালতে পারলে বাঁচি।  আজ না হয় প্রোটিন এর ডাল আর ভাত খেয়ে নেবো।  Atleast cholesterol তা কন্ট্রোল এ থাকবে। তাছাড়া বেশি কাঁচা লঙ্কা খেলে নাকি কালো হয়ে যায়।  Watsapp এ পড়েছি।  কিন্তু আমার এই যুক্তিতে গিন্নি একটুও impressed হয় নি। পুরো ঘটনা সোনার পরে, সহানুভূতি তো দূর, ওপর থেকে আমাকে এক গুচ্ছ গালমন্দ করে দিলো। "কি হতো দুটো মিনিট দাঁড়িয়ে কথা বলে নিতে ? কত ভালোবেসে তোমাকে মটন বিরিয়ানি খাইয়েছিল " অসভ্যতার একটা লিমিট থাকা উচিত। এই অপমানের পর কি আর চুপ করে থাকা যায় ? স্থির করলাম আমি এই social anxiety কাটিয়ে উঠবই।  একবারের পুজোয় Mr. Popular এর খেতাব তা আমারি হবে। 

দুদিন ধরে প্রচুর রিসার্চ করে আমি একটা plan বানালাম।  প্ল্যান এর প্রথম ধাপ হলো নিজের মতামত জাহির করা।  আমি সাদামাটা, বিনয়ী, ভীতু বাঙালি। নিতান্তই বিপাকে না পড়লে public এ মুখ খুলি না। আর তর্ক বিতর্ক তো আমার চরিত্রেই নেই। বিতর্ক এড়াতে আমি drive through রেস্তোরাঁযা tip দি. এই রকম গান্ধী বাদী  লোককে এখন সুভাষ চন্দ্র হতে হবে ।  স্থির করলাম একটা সহজ কোনো বিষয়ে বেছে নি  যাতে একটা ব্রড অডিয়েন্স কে engage  করতে পারি।  এবছ যাচ্ছেতাই গরম পড়েছে - তাই নিয়ে একটা মতামত প্রকাশ করা যেতে পারে । কিন্তু মাধ্যম ? শ্রোতা পাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সোশ্যাল মিডিয়া। সোশ্যাল মিডিয়ার একটা বিরাট সুবিধে আছে।  কীবোর্ড এর আড়াল থেকে আমি যা ইচ্ছে লিখতে পারি।  যখন ইচ্ছে লিখতে পারি। যাকে ইচ্ছে লিখতে পারি। এই গরমে কি করে জলের সাশ্রয় করতে হবে তাই নিয়ে আমার মতামত লিখে পোস্ট করে দিলাম আমাদের স্থানীয় বাসিন্দারদের ফেইসবুক গ্রুপ এ।  আশা করছিলাম অনেক বাহবা আসবে, একটা meaningful discussion হবে। কিন্তু না, কেউ রেপ্লি করার আগেই আমার এক প্রতিবেশী, শিমা, চূড়ান্ত অপ্রাসঙ্গিক Gun violence এর স্ট্যাটিসটিক্স নিয়ে একটা মেসেজ করে বসলো।  কি স্বার্থপর মহিলা রে বাবা।  দুদিন পরে করলে কি তোর gun violence পালিয়ে যাচ্ছিলো।  আমি নন-violent বাঙালি।  বন্দুক সম্বন্ধে আমার কোনো জ্ঞান নেই।  ছোটবেলায় পুজোর সময় ক্যাপ-বন্দুক ফাটিয়েছি। ব্যাস ঐটুকুই । এখন এই সীমার মেসেজ এর রেপ্লি তো করতে হবে। ভালাম একটু পড়াশোনা করে একটা ফাটাফাটি রেপ্লি করবো।  বোধয় পড়াশোনা করতে একটু বেশি সময় নিয়ে ফেলেছিলাম।  ফিরে এসে দেখি আমাদের সীমার পোস্ট এ আগুন লেখে গেছে।  আর্গুমেন্ট, কাউন্টার আর্গুমেন্ট, ঝগড়া ঝাঁটি, কান্না কাটি - খালি হাথে পায়ে মারামারি টাই বাকি ছিল।  গোলমাল এমন তুঙ্গে উঠলো যে শেষ মেশ facebook গ্রুপ তাই প্রায় বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড় ।  মাঝখান থেকে আমার এতো কষ্টে লেখা জল সাশ্রয় এর মেসেজ তা মহাকালের গর্বে নিমজ্জিত হয়ে গেলো। কি বিশ্রী ব্যাপার। নাহ social মিডিয়া খুব ভয়ানক জায়গা।  free promotion এর বিনিময়ে প্রচুর free ইট-পাটকেল জোটে কপালে।  

Social media র দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে আমি নজর ঘোরালাম আমার অস্টিন এর বাঙালি মন্ডলীর দিকে। এবার স্থির করলাম একটা বেশ গরম চলতি টপিক এর ওপর আলোচনা করবো । প্রথমে ভাবলাম আলিয়া ভাট আর রানবিরের কাপুর এর বিয়ে কিছু বক্তব্য রাখি।  কিন্তু Austin এর বাঙালি রা বড্ডো intellectual. এসব বিষয় তাদের  stimulate করবে না।  তাই বলিউড masala বাদ।এটা ইলেকশন year, তাই Politics নিয়ে চারিদিকে বেশ শোরগোল। এই বাজারে একটা বেশ শক্ত পোক্ত মতামত থাকাটা responsible citizen এর লক্ষ্যন। কিন্তু আমি এই দেশে ভোট দি না। বর্তমান রাষ্ট্রপতির নাম মনে রাখলেই যথেষ্ট। তাই পলিটিক্স এর জ্ঞান আমার খুবই শিথিল।  স্থানীয় political activist সুমিত দাসগুপ্তের কিছু লেখা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে একটা জব্বর opinion পিএস প্রিপারে করলাম। পুজো ম্যাগাজিনে এ ছাপানোর জন্য জমা দিলাম ।  এক্কেবারে কয়েকশো লোকের সামনে পৌঁছে যাবে আমার জোরালো মতামত।  দুদিন পর ম্যাগাজিন কমিটির কর্ত্রী সুভা দির ফোন এলো।  বোধয় এরম একটা পাওয়ারফুল ওপিনিয়ন piece লেখার জন্য অভিনন্দন দিতে চাইছেন। "হ্যালো সুভা দি, কেমন আছো ?" - ভারী অমায়িক গলায় আমি জিগেশ করলাম।  কণ্ঠে একটা এত্ত বিশ্বাসের ছোঁয়া। "ভালো আছি বাবা, তুমি কেমন  আছো ?" - শুভদি জিগেশ করলো।  ব্যাস এইটাই সুযোগ - "আর বোলো না, এই দেশের রাজনৈতিক কাঠামো তা পুরো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।  Freedom caucus এর কান্ড টা দেখেছো ?". কথা শেষ করার করার আগেই সুভা দি বললো "হ্যা তোমার লেখাটা পড়লাম - ভালো লেখা কিন্তু বাবা আমরা তো apolitical অর্গানিজশন তাই এই লেখা তো ম্যাগাজিনে ছাপাতে পারবো না। তুমি বরং একটা হাসির কিছু লিখে দাও. কেমন ?". শুভ দি ফোন রেখে দিলেন। আমি এক নিরাশার দীর্ঘ্যশ্বাষ ছেড়ে বলে পড়লাম। আজগুবি হাসির লেখা লিখে আমি কিভাবে famous আর popular হবো ? দূর্গা পুজোর স্টেজ উঠে standup কমেডি করতে হবে।  শ্রোতার অভাবে বোধয় শেষ পর্যন্ত আমার জনপ্রিয় হবার রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। 

তবে একটা আশার আলো এখনো টিম টিম করে জ্বলছে। এই শনিবার আমাদের লেখা পড়া গ্রুপ এর মিটিং আছে।  সেখানে সবাই নিজেদের লেখা পরে শোনাবে। এইটাই আমার শেষ সুযোগ একটা আজগুবি  কিছু একটা লিখে নাম পাওয়ার। আমার মতে জনপ্রিয় হবার এইটাই সবচেয়ে সহজ উপায়। তাই, আপনারা কেউ যদি social anxiety তে ভুগছেন, বাড়ির লোকের অবমাননা সহ্য করছেন ? তাহলে আর দেরি করবেন না।  এখুনি আমাদের লেখা পড়া গ্রুপ এ যোগদান করুন আর জনপ্রিয় হবার রাস্তায় পা দিন।  আমাদের কোনো শাখা নেই.  


 

 


 

Acceptance

 দরজা খুলে দেখে চায়ের কাপটা যত্ন করে টেবিল এর ওপর রাখা।  কোস্টের টা ও নিজের জায়গায় আছে।  সামনে গিয়ে দেখলো কাপের নিচে শেষ টুকু চা এখনো পরে আছে।  আজকের Telegraph টাও পাশে ভাঁজ করে রাখা , স্পোর্টস এর পেজটাই সামনে আছে।  রুপা র বাড়িতে সবাই স্পোর্টস নিয়ে ভীষণ প্যাশনেট।  ও ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে বাবা, কাকা , পিসিরা সবাই স্পোর্টস নিয়ে খুব উৎসাহিত ।  ক্রিকেট আর ফুটবল হলে তো কোথায় নেই।  সেই সিউড়ি র বাড়ির সামনের ঘরে টিভি তে যখন ক্রিকেট ম্যাচ  গুলো হতো, সারা ঘর জুড়ে সবাই মিলে  বসে ঝাল মুড়ি খাওয়া আর ম্যাচ দেখা, সে কি আনন্দ।  ঘর ভর্তি কত লোক।  দুই কাকা ই ব্যাডমিন্টন খেলেছে স্টেট লেভেল এ।  বাবা ক্রিকেট ফুটবল দুটোই কলেজ লেভেল এ খেলতো। খুড়তোতো পিস্ততো ভাই বোনদের সাথে গরমের ছুটির সময়  সেই খালি রাত রাত সৌরভ দ্রাবিড় সচিন নিয়ে গল্প, হটাৎ একরাশ স্মৃতি ভেসে এলো। গত রোববার রুপা যখন এসেছিলো তখন ও সে এরমটাই দেখেছিলো, সেদিন অবশ্য এতো স্মৃতি ভেসে আসে নি। আগের রোববার এর থেকে এই রোববার টা তো  অনেকখানি আলাদা। আগের দিন কি চায়ের কাপে  এ শেষ এর চা টা ছিল ? রুপা ঠিক মনে করতে পারলো না।  ও তো সেদিন অটো খেয়াল এই করে নি।  

বসার ঘরে সাথেই দিননিং টেবিলটা।  আজকাল কার ফ্লাট গুলো যেমন হয় - Drawing cum dinning . দিনদিন টেবিল এর ওপরে একটা থালা এর ওপর আরেকটা থালা ঢাকা।  ওপরের থালা তা ওঠাতেই রুপা বুঝতে পারলো দুপুরের খাবার  টা  বাড়া আছে - ভাত, ফুলকপির তরকারি, সাগ।  পাশে আরো দুটো বাটি ঢাকা - একটাই মাছের ঝোল, আরেকটায় ডাল।  ডাল এ হলুদ পড়েছে কিনা বোঝাই  যাচ্ছে না।  মাছের ঝোল টা পুরো জল আর মাছ তা যেন তাকাচ্ছে।  সব কোটা রান্না খুব দায়সাড়া করে বানানো।  রুপা র মনে পরে গেলো মণিমা কি সুন্দর রান্না করতো।  এই বাড়িতেই মণিমা স্পেশাল চিল্লি চিকেন অরে ফ্রেইড রিসের কত স্মির্তি।  বড়কাকু সবসময় খুব রিচ রান্না খেতে ভালোবাসতো তাই দুপুরের খাবার এর থালা তা দেখে রুপা র একটু খারাপ এই লাগলো।  ভাবছিলো বড়কাকু এরম রান্না নিশ্চই ভালোবেসে খেত না।  ভাবতে ভাবতে রান্নাঘর এ গেলো।  মণিমা চলে যাওয়ার পর এই প্রথম রুপা এই বাড়ির রান্না ঘর এ ঢুকলো।   গ্যাস এর পাশে আরো কিছু বাতি ঢাকা ছিল।  খুলেই বুঝলো ফ্রিজ এ ঢোকাবার জন্যে রাখা আছে , তোলা হয়ে আর ওঠেনি।  রান্নাঘরটা কি সুন্দর পরিষ্কার করে গোছানো। মণিমা র রান্নাঘর কখনোই এতো পরিষ্কার থাকতো না।  চোদ্দ বছর হয়ে গেলো মণিমা চলে গেছে।  এর মধ্যে রুপা তো কতবার এই বাড়িতে এসেছে, কিন্তু আর কখনো রান্নাঘর এ ঢোকেই নি।  কেনই বা যাবে রান্নাঘর এ তো কারোর সাথে তো দেখা করার এই ছিল না ।  মালাটি এই রান্নাঘর থেকে খাবার, জল যা দরকার, নিয়ে আস্ত।  এতো বছর ঢুকে তাই কত অন্যরকম লাগছে।  এটা তো আর মণিমা র রান্নাঘর নোই তাই আলাদা তো হবেই।  রান্নাঘর এর পাশেই বাথরুম।  বাথরুম খুলে দেখলো ঠিক একইরকম।  সিনথল রের সাবান আর লিফেবুয়ায় এর হ্যান্ডওয়াশ - দুটো  যে জায়গায় থাকে সেখানেই আছে।  দরজার পিছলে বোরকাকু র তোয়ালে তা ও ঝোলানো।  রুপা দরজা তা বন্ধ করে দিলো।  বোরকাকুর ব্র্যান্ড লয়াল্টি তা একই থেকে গেলো।  বাথরুম এর পাশে সৃজা র রুম তা।  দু বছর আগে সৃজা র বিয়ে হয়।  এই বাড়িতেই কত হৈচৈ।  সৃজা র রুমটা ভর্তি ওর তত্ত্বে র থালা সাজানো ছিল।  গত বছর সৃজা লন্ডন মুভ করে যাই।  চৈ ম্যাশ আগে এসেছিলো তখন রুপা র সাথে দেখা হয়েছিল।  বিছানার চাদর তা টানটান করে পাতা , পাশে কম্পিউটার টেবিল এ কম্পিউটার তা ঢাকা দেওয়া , টেবিল এ হালকা ধুলো র ইটা লেয়ার।  দেখেই মনে হচ্ছে বেশ কয়েকদিন এই রুমটা ব্যবহার করা হয়নি।  

সৃজা র পাশের ঘরটা বোরকাকুর শোয়ার  ঘর ।  আগে এটাই মণিমা আর বোরকাকুর শোয়ার  ঘর ছিল।  ঘরটাতে ঢুকে রুপা র মনে হলো কতদিন যেন এই ঘরটাতে ও ঢোকে নি।  বিছানা তা পরিষ্কার করে পাতা আর তার ও পর বেশ কয়েকটা শার্ট  আর পাঞ্জাবি আইরন করে এনে রাখা ।  জামাকাপড় আয়রন বোরকাকু র চাই।  আজকে ফ্লাট এ আসার সময়  নিচের আইরন ওয়ালা র  সাথে রুপা র দেখা হলো।  রুপা কে দেখে সে আজকে আর হাসে নি। ঘরটার চোখ ফেরাতেই দেখতে পেলো বেডসিডি টেবিল এর পাশে মণিমা র একটা ছবি রাখা। রুপা ছবিটা হাতে তুলে নিলো।  রুপার মনে হলো ছবিটা যেন কথা বলছে। রুপা এই ছবিটা তো আগে কোনোদিন দেখেনি।  ছবিটার  মুখে যেন একটা মৃদু হাসি।  চোখ গুলো যেন কথা বলছে।  সারা বাড়িতে রুপা একা।  রুপা ছবিটা নিয়ে বিছানাটাই বসে পড়লো।  ছবিটার দিকে অনেক্ষন চেয়ে থাকলো।  তারপর হাউহাউ  করে কেঁদে উঠলো।  এতক্ষন ধরে যে প্রশ্নের উত্তর  হয়তো রুপা খুঁজছিলো ছবিটা যেন সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলো।  

আজ সকালে পুলিশ এর ফোনে  রুপার বাবা খবর পাই যে তার মেজো  ভাই আর নেই।  রাস্তায় পরে মারা গেছে, রাস্তার লোক পিপলিসে খবর দিয়েছে ।  রুপা সকাল থেকে মা, বাবা, ছোটকাকু, ছোটকাকিমা সবাইকে  সামলিয়ে , পুলিশের এর সব ফর্মালিটি করে বড়কাকু র বাড়ির চাবি নিয়ে একাই  এসেছিলো।  সারাদিন ধরে বাকি সবার মতন সব কাজের মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করে যাচ্ছিলো - কি করে হলো? কেন হলো? কাল এই কথা হলো , সব ই তো ঠিক ছিল। . .. ইত্যাদি ইত্যাদি।  মণিমা র ছবিটা হাতে নিয়ে ওর যেন সবটা স্পষ্ট হয়ে গেলো।  চোদ্দ বছর হয়ে গেলো মণিমা চলে গেছে।  সৃজা বোরো হলো, ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করলো, বিয়ে হলো আর এই ৬ ম্যাশ আগে সৃজা র একটা ছেলে হলো।  মণিমার হয়তো এবার বড়কাকু কে বেশি দরকার আমাদের চেয়ে।  চোদ্দ বছর তারা আলাদা আছে এবার তো একসাথে থাকবে।  বিছানায় বসে রুপা চারিদিকে চোখ ফেরালো - সবটা  একই আছে, -  মানুষগুলো আর নেই।  বড়কাকু মণিমা র বাসা টা  হটাৎ যেন খালি ইট পাথরের বাড়ি হয়ে গেলো।  

রবিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৩

"Mailbox" অভিযান

সকাল সকাল email  account তা খুলেই মেজাজ তা খিচড়ে গেলো।  না, নতুন করে কোনো বিকট email এর অবির্ভাব ঘটে নি। কেউ আমায় টাকা দিতে চাইছে না - কেউ নিতেও চাইছে না।  আমার গাড়ির extended warranty নিয়ে অজানা-অচেনা সুনাগরিক দের কোনো মাথা ব্যাথা নেই। রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার কোনো উপায়ের সংকেত ও চোখে পড়লো না।  সব একদম শান্ত, নিরিবিলি - ঠিক যেমনটি হওয়া উচিত। বিপদ তা হলো screen এর নিচে ডানদিকে একটা ছোট্ট বার্তা দেখে। "Your email storage is full. Please free up space to continue to send or receive emails". ভাবছেন এতে এতো চটে যাবার কি আছে ? অনেক কারণ আছে। বছর কুড়ি আগে যখন এই email account টা খুলেছিলাম, তখন email company  আশ্বাস দিয়েছিলো যে আমায় কোনোদিন email delete করতে হবে না।  সমস্ত স্মৃতি চিরকালের মতন কয়েদ হয়ে থাকবে এই ছোট্ট inbox টার মধ্যে। এমনকি প্রথম কয়েক বছর তো email delete করার কোনো উপায় ছিল না।  কি আত্মবিশ্বাস ! ফলে আমিও কোনোদিন পুরোনো email delete করার চেষ্টাও করি নি। বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন, কর্মক্ষেত্রের email, নিজেকে পাঠানো জরুরি document, কয়েকশো পুরোনো ছবি - আমার জীবনের শেষ দুই দশকের ইতিহাস সযত্নে আগলে রাখা আছে এই email account এ। তবে, ইদানিং কালে রাজ্যের ইমেইল মার্কেটিং এর জঞ্জালে ভোরে গেছে inbox. ক্রেডিট কার্ড, হোম লোন, কার লোন, কোটিপতি হবার উপায়, রোগ হবার উপায়, প্রেমে সাফল্যের উপায় - ক্রেতা, বিক্রেতা আর ঠকবাজদের কুরুক্ষেত্রে আমি জেরবার হয়ে গেছি । হাজার হাজার অবান্তর, অনর্থক, ওঁচা ইমেইল এ ভোরে গেছে inbox. এই সব আগাছা পরিষ্কার করা যে কি দুরহ কাজ সে আর বলে বোঝানো যাবে না।  কিন্তু অরে কোনো উপায় ও নেই।  তাই মনে সাহস নিয়ে, হাত গুটিয়ে নেবে পড়লাম "স্বচ্ছ mailbox" অভিযানে। 

শুরু করলাম অবান্তর ইমেইল গুলো দিয়ে।  কিন্তু প্রথম দুপাতা পেরোতেই বুঝতে পারলাম যে এই গতিতে এগোলে আমার সারা জীবন লেগে যাবে এই কার্য সিদ্ধি করতে।  ঠিক করলাম, পিছন থেকে শুরু করি। মানে সবচেয়ে পুরোনো ইমেইল গুলো থেকে ডিলিট করা শুরু করি।  এতো পুরোনো ইমেইল এর বোধয় অরে প্রয়োজন হবে না।  নিজের ওপর বেশ গর্ব বোধ করে সোজা চলে গেলাম একদম শেষের পাতায়।  এইবার ঘচাং-ফু করে সব ডিলিট করে দেব।  কিন্তু এখানেই শুরু হলো বিপদ। প্রথম ইমেইল তা ২০০৫ সালের জুন মাসে - বাল্য বন্ধু রাজীবের ইমেইল। 

"কংগ্রাটস ভাই, খাওয়াবি কবে ?" কিসের কংগ্রাটস ? এমন কি ভালো ঘটনা ঘটেছিলো সেদিন যে আমি ওকে খাওয়াবো ? তখন আমি কলেজ পড়ি।  বোধয় পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য অভনন্দন জানাচ্ছে। ডিলিট করতে গিয়েও করলাম না।  এই account এর প্রথম ইমেইল, এটা  থাক।  

পরের ইমেইল তা প্রদীপ্ত ব্যানার্জীর কাছ থেকে।  একটা এটাচমেন্ট এ একগুচ্ছ শপিং মল এর ছবি। সাবজেক্ট লাইন - "Dubai Documents". জাব্বাবা - এই লোক টা আবার কে ?একে তো চিনি না।  আর এরম একটা গম্ভীর subject লাইন দিয়ে ভুল ভাল দোকানের ছবি পাঠিয়েছে ? আমি আবার তাকে reply ও করেছি " Thank you sir ". ভারী চিন্তায় পরে গেলাম। ২০০৫ সালের জুলাই মাসে দুবাই এর শপিং মল এর ছবি দিয়ে আমি কি করতে চাইছিলাম ? এমনি তে আমি বেশ সাহসী প্রবিত্রীর মানুষ, কিন্তু এইসব দুবাই টুবাই ব্যাপার গুলো নিয়ে একটু অস্বস্তি হয়। কি জানি কিসে ফেঁসে যাবো ? চটপট  ডিলিট করে দিলাম। আর কোনো চিহ্ন নেই। 

পরের ইমেইল সেই অগাস্ট মাসে - সুব্রত মল্লিক এর থেকে। সুব্রত আমার কলেজের সহপাঠী ছিল। আমার ঠিক পরের রোল নম্বর। অনেক এসাইনমেন্ট আর প্রজেক্ট আমরা একসাথে করেছি। বেশ মেধাবী ছাত্র ছিল। কলেজের পরে আর সেরম যোগাযোগ ছিল না। কি জানি আজ-কাল কি করছে।  facebook আর linkedin থাকার দরুন জানতে পারলাম সুব্রত এখন বেঙ্গালুরু এ আছে।  এক বড়ো সফটওয়্যার কোম্পানিতে সিনিয়র ম্যানেজার।  ভালো লাগলো।  সুব্রতর ইমেইল তা খুললাম - "Implementation of NEMO on Linux", সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটি র একটা রিসার্চ পেপার।  একবার চোখ বুলিয়ে বুঝলাম যে আমি কিছুই বুঝলাম না। অথচ আমি বিজ্ঞের মতন  এর একটা লম্বা reply ও করেছি।  তাতে আবার গুরুগম্ভীর কঠিন কিসব শব্দ ও ব্যবহার করেছি। নিজেই আশ্চর্য হয়ে গেলাম - ২০০৫ সালে আমি এতো জ্ঞানী ছিলাম ? তাহলে এখন এরম অজ্ঞ কি করে হয়ে গেলাম ? শুনেছিলাম বয়সের সাথে সাথে মানুষের পান্ডিত্য বৃদ্ধি পায় - আমার ক্ষেত্রে তার উল্টো।  বুঝলাম মগজের ব্যাম করা বন্ধ হয়ে গেছে।  উৎকৃষ্ট মানের চিন্তা ভাবনা প্রাক্টিস করতে হবে।  তাই সুব্রতর ইমেইল তা ডিলিট করলাম না।  ওটা দিয়েই শুরু হবে আমার মগজাস্ত্রে শান দেওয়া। 

কিন্তু মগজে হাত দেওয়ার আগেই হৃদয়ের তারে টান পড়লো। পুরোনো কিছু প্রেম পত্র চোখে পড়লো। অবশ্য প্রেম পত্র বলাটা বোধয় ঠিক হবে না । কারণ এই পত্রে প্রেম কম - আদিখ্যেতা আর ন্যাকামো বেশি। "ঘুম থেকে উঠলে?", "ঘুমিয়ে পড়েছো?", "জেগে আছো?", "কি করছো?" , "কি খাচ্ছো ?" ইত্যাদি প্রশ্নোত্তর ছড়িয়ে আছে বেশ কয়েক পাতায়।  দুঃখের বিষয় টা হলো যে Amazon Alexa র এর সাথে আমি আজকাল এর থেকে উচ্চ মানের আলোচনা করেই থাকি।  তাই আশ্চর্য্য হবার কোনো কারণ নেই যখন এই প্রেমের প্রশ্ন বানের ইমেইল বর্ষণ একদিন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলো। "Select all" করে এই সমস্ত ইমেইল এক্কেবারে ডিলিট করে দিলাম। এইসব মুর্খামির উদাহরণ লুপ্ত থাকায় ভালো। 

ইমেইলের এর সময়রেখা ধরে চলতে চলতে এখন ২০০৮ সালে এসে পড়েছি। কলকাতা ছেড়ে সবে বেঙ্গালুরু এসেছি চাকরি সূত্রে। কিন্তু ইনবক্স এখনো তাজা পুরো বন্ধুদের ইমেইল এ। অকাজ এর ফরওয়ার্ড ইমেইল, আড্ডা, পুজোয় ঠাকুর দেখার প্ল্যান, একে ওপরের সাথে ঠাট্টা - এসব যেন লেগেই থাকতো দৈনন্দিন। Whatsapp / IP calling এর আগের যুগ।  সস্তায় যোগাযোগ রাখার এই একমাত্র উপায়। একটা একটা করে ইমেইল পড়ছি আর নিজের মনেই হেসে যাচ্ছি। সন্দীপ এর ভূতের ভয়, ইন্দ্রজিৎ এর বাংলায় ফেল, সৌমেন এর লাল জুতো, রাজীবের পুষ্ট শরীর - কিছুই বাদ যায় নি।  সে এক নির্ভেজাল সময় - বন্ধুদের deliberately offend করাতে কেউ offence নিতো না। এই ইমেইল গুলোর হাত ধরে আমি যেন আবার সেই পুরানো দিনেই ফিরে গেছি।  

ধীরে ধীরে কলকাতার বন্ধুদের সাথে ইমেইল আদান-প্রদান কমে এলো। দিনে ৩-৪ তে থেকে মাসে ২ টো তে এসে থেকেছে। সবাই যে যার নিজের জীবন আর কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল নিশ্চয়। অথচ আমার ইনবক্স কিন্তু তখনও ভোরে চলেছে। বেঙ্গালুরু এ নতুন বন্ধুদের আবির্ভাব। আমার সহকর্মী  Mandeep ও Ganga . জীবন যুদ্ধের সেই অধ্যায় আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। Mandeep পাঞ্জাব এর ছেলে।  পড়ুয়া, সাধা-সিধা, এক্কেবারে শান্ত শিষ্ট ল্যাজবিশিষ্ট ভদ্রলোক যাকে বলে। আর Ganga ঠিক তার উল্টো - ডানপিটে, সাহসী মারাঠি মেয়ে । আমাদের এই ৩ মূর্তির সমস্ত কুখ্যাতি বিশদ বিবরণ ছড়িয়ে আছে ইনবক্স এ। Mandeep এখন দিল্লী তে।  বছরে একদুবার ফোনে কথা হয়  । আর গঙ্গা ? তার সাথে শেষ কথা হয়েছিল ২০২১ জুলাই মাসে। সেই নভেম্বর এ Ganga আমাদের সবাই কে বিদায় জানায়।  ব্রেস্ট ক্যান্সার। তার শেষ ইমেইল টার জবাব দেওয়া হয়নি আমার। 

পুরোনো স্মৃতি মাখানো  ইমেইল গুলো পড়তে পড়তে মনটা ভারী হয়ে গেলো। চোখের দৃষ্টি বোধয় একটু ঝাপসা হয়ে এসেছে। পুরোনো email পিছন থেকে ডিলিট করার পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে backfire করেছে। শেষ ৩ ঘন্টায় আমি মাত্র ১৫২ টা  ইমেইল ডিলিট করতে পেরেছি।  আমায় করতে হবে কয়েক লখ্য। মাঝখান থেকে মন মেজাজ আরো খারাপ করে পুরো দিনটাই মাটি হবার জোগাড় । এই ভাবে হবে না। ৫ বছর আগের যত ইমেইল এসেছে সেগুলো সব সিলেক্ট করলাম। সে লখ্য লখ্য email। বেশ কয়েকবার ডিলিট বাটন এর ওপর মাউস তা নিয়ে গেলাম, আবার ফিরিয়ে আনলাম।  দ্বিধা আর দ্বন্দে ভরা এক সংঘর্ষ চলছে মনের ভিতর। কিছু অমূল্য স্মৃতি হারিয়ে যাবার আশংকা।  তখনি একটা আধুনিক ইংরিজি গানের কথা মনে পড়লো - "Nostalgia is one hell of a drug". গানের কথা গুলো মনে করিয়ে দেয় অতীতকে আটকে ধরে রাখার পরিণাম।  স্মৃতির পিছুটান জীবনে এগিয়ে যাবার রাস্তায় বাঁধা আনে। 

সত্যি তো দিব্বি ফুফুর মেজাজ এ ইমেইল ডিলিট করতে বসেছিলাম এখন মুখ গোমড়া করে, দার্শনিক হয়ে প্রবন্ধ লিখছি । নিকুচি করেছে। এক নিস্বাসে ডিলিট বাটন তা ক্লিক করে ফেললাম।  কয়েক লক্ষ্য ইমেইল - একটু বোধয় সময় লাগে কার্য সিদ্ধি হতে. চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি একটার পর একটা পাতার সংখ্যা কমে আসছে। প্রথম কয়েক সেকেন্ড একটা আতঙ্ক যেন চেপে ধরলো আমাকে - কিন্তু আশ্চর্য্য ভাবে যত পাতার সংখ্যা কমতে থাকলো তত যেন মনটাও  হালকা হতে থাকলো।  মিনিট দুয়েকের মধ্যে সব পরিষ্কার। মন আর inbox দুটুই। খালি রয়ে গেছে Ganga র করা শেষ ইমেইল টা। Reply লিখলাম - "ভালো থাকিস বন্ধু। এবার  দেখা হলে কিন্তু আর veg খাবো না". Reply টা পাঠালাম আর তার সাথেই গঙ্গার শেষ ইমেইল টাও  ডিলিট করে দিলাম। 

এবার নতুন স্মৃতি বানানোর পালা। 


শনিবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৩

নায়ক

মাসখানেক আগে পাড়ায়  এক নবাগত পরিবারের সাথে আলাপ হলো।  এরাও বাঙালি । ভাবলাম বেশ ভালো আড্ডা জমবে।  আড্ডার সূত্রে কথা উঠলো প্রিয় সিনেমার কথা।  জিগেশ করতে আমি বেশ উত্তেজিত হয়েই বললাম -   রজনীকান্ত এর Shivaji the Boss. বলেই বুঝলাম একটা কেলেঙ্কারি হয়ে গেছে। একটা অস্বতির স্তব্ধতা।  বৌ চোখ রাঙাচ্ছে আমার দিকে। বুঝলাম cultured বাঙালি আমার সিনেমার taste টা ঠিক হজম করতে পারছে না। টপিক চেঞ্জ হয়ে গেলো - প্রিয় খাবার। ফোঁস করে বলে ফেললাম "ঘুগনি" । বৌয়ের চোখে সমর্থনের ছাপ । আমাদের নতুন বন্ধুরাও স্বস্থির শাঁস ছাড়লো। কিন্তু সত্যি কথা বলতে ঘুগনি আমার মোটেও ভালো লাগে না। আমার favorite খাবার গুঁড়ো দুধ। Full  fat . কিন্তু সেটা পাবলিক এ share করলে social outcast হয়ে যেতে হয়। তাই একথা গোপন থাকাই ভালো। যাই হোক, এযাত্রা ফারা কাটলো। কিন্তু মনটা কিরাম যেন খচ খচ করতে থাকলো। মানে ওই সিনেমার পছন্দ অপছন্দ এর ব্যাপার টা।   

Action movie আমার বেশ পছন্দ । হিন্দি, বাংলা, হলিউড - সিনেমায় villain চাই আর তাকে জব্দ করার জন্য  hero . ব্যাস এটাই যথেষ্ট।  Romance, emotion, storyline, Item song - এইসব optional. Infact, action সিনেমা ভাষা - জাতির ভেদাভেদের ও উর্ধে - আমার প্রিয় ছবির তালিকায় দক্ষিণ  ভারতের কিছু নিদারুন দৃষ্টান্ত আছে - রজনীকান্ত এর Shivaji the Boss, নাগার্জুনা র Don No ১, মহেশ বাবুর Businessman. তামিল ও তেলেগু ভাষার এই ছবিগুলি আমি রোজ breakfast lunch আর dinner এর সাথে দেখতে পারি। Judge করছেন তো ? আমি uncultured, সাহিত্য রসিক বাঙালির নামে কলঙ্ক ? মৃণাল সত্যজিৎ বুদ্ধেদেব এর নাম ডোবাচ্ছি ? এই popular opinion এর বিরুদ্ধে গিয়ে আজ আমি একটা অনন্য দৃষ্টিকোণ পেশ করবো।   ধরে বসুন। 

ছবির নাম shivaji the boss. নায়ক দক্ষিণের সুপারস্টার রজনীকান্ত।  রাজনী আর তার সাগরেদ কে কয়েকশো গুন্ডা ঘিরে ফেলেছে।  পালাবার পথ নেই।  রাজনীর সাগরেদ ভয়ে কাতর।  রাজনী ঠোঁটের কোনায় হালকা হাসি লাগিয়ে আশ্বাস দিলো - "Munna, jhoond mein to sooar aata hain. Sher akela hi kaafi hain" চরম dialogue. হল ফেটে পড়েছে হাততালি তে। এক দিকে সিটি র আওয়াজ, অন্য দিকে কাসর ঘন্টা।  হ্যা, সিনেমা হল এ কাসর ঘন্টা।  শুনেছেন কখনো ? উত্তেজনা আর আবেগে আমার চোখে জল। তারপর যা হলো সে আর লিখে বোঝাতে পারবো না।  এইটুকুই বলে  রাখি রাজনী একই একশো।  পারলে ছবি টা  দেখবেন। কিন্তু এখানে fight সিন টা important না।  Important হলো রবী ঠাকুর। বুঝলেন না ? "যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে" ? জীবনে আমাদের অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়।  কখনো যদি এরম পরিথিতিতে নিজেকে একলা মনে হয়, তো কুচ পরোয়া নাহি। আপনি sher - akela hi kaafi hain . বুঝলেন ? হালকা ভাবে নেবেন না। 

আমরা সবাই ব্যক্তিগত নীতি বিচার নিয়ে এতটাই মশগুল যে অন্যের দৃষ্টিকোণের প্রতি আমাদের কোনো আগ্রহ নেই। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, ধর্মবিশ্বাস  সবেতেই আমাদের এতটাই দৃঢ় মতামত যে তাতে কোনো দ্বিমত আমরা সহ্য করতে পারি না। মতভেদ হলেই সেটা হিংস্রতায় পরিণত হয়। অথচ এই মনোমালিন্যের মাঝে আমরা বৃহৎ উদ্দেশ্য তাই ভুলে যাই। সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়।  "Aapka sapna mujhe pasand nahi, aur mera sapna apko pasand nahi. Isiliye jo duniya ke liye sapna dekhta hain woh sapna hi reh jaata hain" -  No ১ business man ছবির এই dialogue টা যেন গালে থাপ্পড় মেরে এই কঠিন সত্যটাই তুলে ধরে । তাই modi vs mamata তর্কে না গিয়ে চিন্তা করুন দেশের আর দোষের উন্নতি কিসে হবে। 

কিন্তু গোলা বারুদে ভরা action movie খালি হল কাঁপানো dialogue এর জোরে বেঁচে থাকে না। এইধরণের ছবি কিছু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে আসে।  অধ্যবএই সায়, বিশ্বাস, সহনশীলতা, বীরত্ব, ন্যায় বিচার।  এই গুণাবলী আজও  প্রাসঙ্গিক - হারিয়ে যায় নি। মন্দের উপর ভালোর জয়, এই বিশ্বাস দর্শকের মনের কোনায় কোথাও একটু আসার আলো জ্বালায়।  আর আজ এই  আশার আলোর খুব প্রয়োজন। যুদ্ধ, দুর্নীতি, অতিমারী, সন্ত্রাসবাদ, দূষণ, নিপীড়ন - এই কালো ছায়া ভেদ করবে কে ? বন্দুক ধারী আততায়ী যখন স্কুলের বাচ্ছাদের ওপর নিশানা নিয়েছে, তখন কে বাঁচাবে তাদের ? কল-কারখানার বিষাক্ত বর্জ পদার্থ কে পরিষ্কার করবে ? রাজনৈতিক নেতার দুর্নীতির বিনাশ কে করবে ? এক superhero ! ছোটবেলায় মা বলতো - এগুলো সিনেমায় দেখায়, সত্যি সত্যি Superhero হয় না। ঠিক ই তো , দরজা ভেঙে স্কুল এ ঢুকে Salman Khan কচি শিশু গুলোর প্রাণ বাঁচাতে পারবে না. জলের মধ্যে থেকে ক্যাপ্টেন Planet উঠে এসে বিষাক্ত chemical এর কারখানা ধ্বংস করবে না, অসৎ নেতার গালে থাপ্পড় মেরে Ajay Devgan বলবে না  "Aali re aali ... aata tujhi baari aali" । মন খারাপ হয় আর তখনি Spider Man ছবির একটা dialogue মনে পরে যায় - "I believe there's a hero in all of us that keeps us honest. Gives us strength, makes us noble". তাই তো, ২০১৭ সালে Houston  এ যখন প্রবল বন্যা হলো তখন তো captain  planet র দেখা পাওয়া যায় নি। সারা দেশের থেকে সাধারই মানুষ একত্রিত হয়েছিল ভিটেহীন houston বাসীদের পাশে।  Blood Testing  company Theranos যখন মিথ্যাচার এর মাধ্যমে কোটি কোটি dollar এর জালিয়াতি করছে তখন এক সাধারণ সাংবাদিক তার পর্দা ফাঁস করেছিল। ব্যাটম্যান এর প্রয়োজন হয় নি ।  Missouri  তে রেল দুর্ঘটনায় কয়েকশো মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিলো একদল কিশোর, রাজনীকান্তঃ নয় ।  ভারতবর্ষের বিশাল ওহ আর আমার personal favourite -  Dorothy Vaughan, Mary Jackson, and Katherine Gobels Johnson - ১৯৬০ এর দশকে এই তিন african american মহিলা হাজারো সামাজিক বৈষম্য আর প্রতিকূলতার মুখেও আমেরিকা কে মহাকাশ এ পৌঁছে দিলো। Hidden Figures ছবিটা দেখবেন। ভালো লাগবে। এরম আরো কত উদাহরণ আছে যে লিখতে বসলে উপন্যাস হয়ে যাবে।  এরাই তো সত্যিকারের নায়ক। আর এদের কাহিনী থেকেই অনুপ্রেরণা নিয়ে তৈরী হয় আমার প্রিয় action film গুলো।  ঐজন্যই এগুলি আমার এতো প্রিয়।