শনিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

জনপ্রিয় হওয়ার সহজ উপায়

গত বছর আমি একটা প্রবন্ধ লিখেছিলাম - রোগা  হওয়ার সহজ উপায়।  তাতেই অনুপ্রেণীত হয়ে এই "সহজ উপায়" সিরিজ এর পরবর্তী সংখ্যা - জনপ্রিয় হওয়ার সহজ উপায়। 

হঠাৎ জনপ্রিয় হওয়ার এতো সখ ? আমার একটা সমস্যা আছে - সহানুভূতিশীল মানুষ বলে social anxiety, আমার বৌ বলে অসভ্যতা। এবং এই social anxiety এর ঠেলায় বেশ কিছু বিপদে পড়তে হয়েছে আমাকে। গত শনিবার বাজার করতে গেছি ।  খুব মনোযোগ দিয়ে বাছাই করে কাঁচা লঙ্কা ঝোলায় ভরছি, হঠাৎ মুলো শাকের পাতার ফাঁক দিয়ে দেখি ফুলকপি বোঝাই শপিং cart নিয়ে রিনা দি আবির্ভাব।  রিনা দি মানুষ টা খুবই ভালো।  ভালো গান গায়, আবৃতি করে, দারুন বিরিয়ানি বানায় - ওই শেষ কারণ তার জন্য এখানের বাঙালি মন্ডলী তে বেশ জনপ্রিয়ও। কিন্তু আমার নাচ, গানের কোনো ট্যালেন্ট  নেই।  আর ইদানিং high cholesterol ধরা পড়ায় বিরিয়ানি খাওয়াও বন্ধ।  আর রিনা দি বোধয় গাড়ি / মোটরসাইকেল এর বিষয়ে খুব একটা উৎসাহী হবে না।  তাই রিনা দির সাথে conversation টপিক নেই।  আর আউট অফ syllabus টপিক এ আলোচনা করা প্রতিভা আমার নেই। তাই একটা awkward পরিস্থিতি এড়াতে কাঁচা লঙ্কার ঝোলা ফেলে আমি দৌড় লাগল নিরাপদ জায়গার সন্ধানে।  এক অভিজাত, সংস্কৃতিবান, রবি ঠাকুর ভক্ত, মধ্য বয়স্ক বাঙালি মহিলার পক্ষে Walmart এর Health & fitness section এ পদার্পন করার সম্ভবনা খুবই ক্ষীণ।  তাই আমি সেই দিকেই পা বাড়ালাম ।  Protein powder এর rack এর পিছনে মাথা গোজার স্থান পেলাম। এখন কিছুক্ষন দম বন্ধ করে লুকিয়ে থাকতে হবে।  দোকানের কর্মচারীদের সন্দেহ এড়াতে আমি একটা দুটো protein powder এর কৌটো নাড়াচাড়া করে দেখছি।  বিজ্ঞের মতন তাদের গায়ে সাঁটানো লেবেল গুলো পড়ছি আর গম্ভীর ভাবে মাথা নাড়ছি। Vanilla আর chocolate প্রোটিন powder এর গুণাবলী তুলনা করছি এমন সময় পেছন থেকে ডাক এলো - "Need help ?" - পিছন ফায়ার দেখি এক গাল হাসি নিয়ে রিনা দি আমার দিকে এগিয়ে আসছে। উত্তরের অপেখ্যা না করেই রিনা দি আমার  হাত থেকে কৌটো গুলো কেড়ে নিয়ে বললো - "অরে এগুলো একদম বাজে - আয়ে তোকে ভালো জিস তা দেখিয়ে দি" - আমি আমতা আমতা করে একটা ক্ষীণ প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলাম।  কিন্তু তাতে পাত্তা না দিয়ে রিনা দি বললো - "আমার ছেলে রোজ gym করে।  Muscle বিল্ড করার জন্য ও এইটা খায়" - বলে একটা বিরাট টিনের ডিব্বা আমার cart এ নামিয়ে দিলো। "এতে pure whey protein আছে. নো সুগার, নো কলেস্টেরল।  ৩০ গ্রাম প্রোটিন। দু দিনে দারা  সিং হয়ে জাবি। ". আমি অনেক কষ্টে একগাল হাসি এনে বললাম "ভাগ্গিশ তোমার সাথে দেখা হয়ে গেলো, নয়তো এতো ভালো জিনিসটার কথা আমি জানতেও পারতাম না"।  রিনা দি উৎসাহের সাথে বললো "Ofcourse, আমাদের বাড়ি ভীষণ health conscious, gym, yoga, Zumba এসব আমাদের চলতেই থাকে। দারা তোকে আমাদের লোকাল fitness freak watsapp গ্রুপ তাতে add করে দি।  ভালো টিপস পেয়ে জাবি। " এই পুরো কথোপকথন এ আমার একমাত্র যোগদান ছিল একটা বিনয়ের হাসি আর বাধ্য ছেলের মতন মাথা নাড়া। "তোর হয়ে গেছে না আরো কিছু নিবি ?" রিনা দি জিগেশ করলো।  পাছে এখন কাঁচা লঙ্কা বাঁচতে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, সেই ভয়ে - প্রোটিন পাউডার এর তিন এর দিকে দেখিয়ে বললাম।"না না এইতো ব্যাস এটাই নেবার ছিল"  . বাকি বাজার চুলোয় যাক।  আপাতত পালতে পারলে বাঁচি।  আজ না হয় প্রোটিন এর ডাল আর ভাত খেয়ে নেবো।  Atleast cholesterol তা কন্ট্রোল এ থাকবে। তাছাড়া বেশি কাঁচা লঙ্কা খেলে নাকি কালো হয়ে যায়।  Watsapp এ পড়েছি।  কিন্তু আমার এই যুক্তিতে গিন্নি একটুও impressed হয় নি। পুরো ঘটনা সোনার পরে, সহানুভূতি তো দূর, ওপর থেকে আমাকে এক গুচ্ছ গালমন্দ করে দিলো। "কি হতো দুটো মিনিট দাঁড়িয়ে কথা বলে নিতে ? কত ভালোবেসে তোমাকে মটন বিরিয়ানি খাইয়েছিল " অসভ্যতার একটা লিমিট থাকা উচিত। এই অপমানের পর কি আর চুপ করে থাকা যায় ? স্থির করলাম আমি এই social anxiety কাটিয়ে উঠবই।  একবারের পুজোয় Mr. Popular এর খেতাব তা আমারি হবে। 

দুদিন ধরে প্রচুর রিসার্চ করে আমি একটা plan বানালাম।  প্ল্যান এর প্রথম ধাপ হলো নিজের মতামত জাহির করা।  আমি সাদামাটা, বিনয়ী, ভীতু বাঙালি। নিতান্তই বিপাকে না পড়লে public এ মুখ খুলি না। আর তর্ক বিতর্ক তো আমার চরিত্রেই নেই। বিতর্ক এড়াতে আমি drive through রেস্তোরাঁযা tip দি. এই রকম গান্ধী বাদী  লোককে এখন সুভাষ চন্দ্র হতে হবে ।  স্থির করলাম একটা সহজ কোনো বিষয়ে বেছে নি  যাতে একটা ব্রড অডিয়েন্স কে engage  করতে পারি।  এবছ যাচ্ছেতাই গরম পড়েছে - তাই নিয়ে একটা মতামত প্রকাশ করা যেতে পারে । কিন্তু মাধ্যম ? শ্রোতা পাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সোশ্যাল মিডিয়া। সোশ্যাল মিডিয়ার একটা বিরাট সুবিধে আছে।  কীবোর্ড এর আড়াল থেকে আমি যা ইচ্ছে লিখতে পারি।  যখন ইচ্ছে লিখতে পারি। যাকে ইচ্ছে লিখতে পারি। এই গরমে কি করে জলের সাশ্রয় করতে হবে তাই নিয়ে আমার মতামত লিখে পোস্ট করে দিলাম আমাদের স্থানীয় বাসিন্দারদের ফেইসবুক গ্রুপ এ।  আশা করছিলাম অনেক বাহবা আসবে, একটা meaningful discussion হবে। কিন্তু না, কেউ রেপ্লি করার আগেই আমার এক প্রতিবেশী, শিমা, চূড়ান্ত অপ্রাসঙ্গিক Gun violence এর স্ট্যাটিসটিক্স নিয়ে একটা মেসেজ করে বসলো।  কি স্বার্থপর মহিলা রে বাবা।  দুদিন পরে করলে কি তোর gun violence পালিয়ে যাচ্ছিলো।  আমি নন-violent বাঙালি।  বন্দুক সম্বন্ধে আমার কোনো জ্ঞান নেই।  ছোটবেলায় পুজোর সময় ক্যাপ-বন্দুক ফাটিয়েছি। ব্যাস ঐটুকুই । এখন এই সীমার মেসেজ এর রেপ্লি তো করতে হবে। ভালাম একটু পড়াশোনা করে একটা ফাটাফাটি রেপ্লি করবো।  বোধয় পড়াশোনা করতে একটু বেশি সময় নিয়ে ফেলেছিলাম।  ফিরে এসে দেখি আমাদের সীমার পোস্ট এ আগুন লেখে গেছে।  আর্গুমেন্ট, কাউন্টার আর্গুমেন্ট, ঝগড়া ঝাঁটি, কান্না কাটি - খালি হাথে পায়ে মারামারি টাই বাকি ছিল।  গোলমাল এমন তুঙ্গে উঠলো যে শেষ মেশ facebook গ্রুপ তাই প্রায় বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড় ।  মাঝখান থেকে আমার এতো কষ্টে লেখা জল সাশ্রয় এর মেসেজ তা মহাকালের গর্বে নিমজ্জিত হয়ে গেলো। কি বিশ্রী ব্যাপার। নাহ social মিডিয়া খুব ভয়ানক জায়গা।  free promotion এর বিনিময়ে প্রচুর free ইট-পাটকেল জোটে কপালে।  

Social media র দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে আমি নজর ঘোরালাম আমার অস্টিন এর বাঙালি মন্ডলীর দিকে। এবার স্থির করলাম একটা বেশ গরম চলতি টপিক এর ওপর আলোচনা করবো । প্রথমে ভাবলাম আলিয়া ভাট আর রানবিরের কাপুর এর বিয়ে কিছু বক্তব্য রাখি।  কিন্তু Austin এর বাঙালি রা বড্ডো intellectual. এসব বিষয় তাদের  stimulate করবে না।  তাই বলিউড masala বাদ।এটা ইলেকশন year, তাই Politics নিয়ে চারিদিকে বেশ শোরগোল। এই বাজারে একটা বেশ শক্ত পোক্ত মতামত থাকাটা responsible citizen এর লক্ষ্যন। কিন্তু আমি এই দেশে ভোট দি না। বর্তমান রাষ্ট্রপতির নাম মনে রাখলেই যথেষ্ট। তাই পলিটিক্স এর জ্ঞান আমার খুবই শিথিল।  স্থানীয় political activist সুমিত দাসগুপ্তের কিছু লেখা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে একটা জব্বর opinion পিএস প্রিপারে করলাম। পুজো ম্যাগাজিনে এ ছাপানোর জন্য জমা দিলাম ।  এক্কেবারে কয়েকশো লোকের সামনে পৌঁছে যাবে আমার জোরালো মতামত।  দুদিন পর ম্যাগাজিন কমিটির কর্ত্রী সুভা দির ফোন এলো।  বোধয় এরম একটা পাওয়ারফুল ওপিনিয়ন piece লেখার জন্য অভিনন্দন দিতে চাইছেন। "হ্যালো সুভা দি, কেমন আছো ?" - ভারী অমায়িক গলায় আমি জিগেশ করলাম।  কণ্ঠে একটা এত্ত বিশ্বাসের ছোঁয়া। "ভালো আছি বাবা, তুমি কেমন  আছো ?" - শুভদি জিগেশ করলো।  ব্যাস এইটাই সুযোগ - "আর বোলো না, এই দেশের রাজনৈতিক কাঠামো তা পুরো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।  Freedom caucus এর কান্ড টা দেখেছো ?". কথা শেষ করার করার আগেই সুভা দি বললো "হ্যা তোমার লেখাটা পড়লাম - ভালো লেখা কিন্তু বাবা আমরা তো apolitical অর্গানিজশন তাই এই লেখা তো ম্যাগাজিনে ছাপাতে পারবো না। তুমি বরং একটা হাসির কিছু লিখে দাও. কেমন ?". শুভ দি ফোন রেখে দিলেন। আমি এক নিরাশার দীর্ঘ্যশ্বাষ ছেড়ে বলে পড়লাম। আজগুবি হাসির লেখা লিখে আমি কিভাবে famous আর popular হবো ? দূর্গা পুজোর স্টেজ উঠে standup কমেডি করতে হবে।  শ্রোতার অভাবে বোধয় শেষ পর্যন্ত আমার জনপ্রিয় হবার রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। 

তবে একটা আশার আলো এখনো টিম টিম করে জ্বলছে। এই শনিবার আমাদের লেখা পড়া গ্রুপ এর মিটিং আছে।  সেখানে সবাই নিজেদের লেখা পরে শোনাবে। এইটাই আমার শেষ সুযোগ একটা আজগুবি  কিছু একটা লিখে নাম পাওয়ার। আমার মতে জনপ্রিয় হবার এইটাই সবচেয়ে সহজ উপায়। তাই, আপনারা কেউ যদি social anxiety তে ভুগছেন, বাড়ির লোকের অবমাননা সহ্য করছেন ? তাহলে আর দেরি করবেন না।  এখুনি আমাদের লেখা পড়া গ্রুপ এ যোগদান করুন আর জনপ্রিয় হবার রাস্তায় পা দিন।  আমাদের কোনো শাখা নেই.  


 

 


 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন