বুধবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২২

মুনা আলি

 মামার বাড়ি আমার পুরুলিয়া জেলার ছোট্ট একটি গ্রামে।  গ্রামটির নাম নাকি ছিল রুক্কিনি। কখন সেটা যুক্তাক্ষরের জটিলতা কাটিয়ে রুকনি হয়ে গেছিলো মা সেটা ঠিক বলতে পারেনা।  স্টেশন এ এখন 'রুকনি' লেখা থাকে। 

বিয়ের পর মা রুকনি থেকে ভাগলপুর আসে।  ভাগলপুর, বিহারের  এক বেশ নামকরা শহর বললে ভুল হবে না।  অনেক নামি দামি স্কুল, নামকরা কলেজ, বড়  দোকান-বাজার সব আছে। আমার ঠাকুরদা ভাগলপুরে কর্মরত ছিলেন।  তাই, মায়ের শশুর বাড়ি হলো ভাগলপুর। 

মা মাঝে মাঝেই বলে থাকে যে আমার ছোটকাকা মাকে ইয়ার্কি করে বলত, "বৌদি, তোমার গ্রামের নাম তো India র map ও নেই। ". ইয়ার্কি হলেও, মা মনে হয় একটু দুঃখ পেতো ।  মায়ের নিজের জায়গা ওটা - মায়ের গ্রাম।

আমার মনে আছে, ছোটবেলায় আমরা খুব একটা মামার বাড়ি যেতে চাইতাম না। আমাদের কোনো সাথী ছিল না মামার বাড়িতে।  মা সবার বড় ।  আর মামা মাসিদের তখনো কারো বিয়ে  হয় নি। এদিকে ঠাকুরদার এখানে পিসতুতু  দাদা-বোনেরা মিলে  বেশ এক জব্বর আসর।  ছোটবেলায় যখন আমরা দিল্লি থেকে রাজধানীতে আসতাম ,আসানসোলে বা ধানবাদ এ নামতাম মনে হয় । তারপর ওখান থেকে ট্রেন বদল। বদল ট্রেনটি ছিল 'কয়লার গাড়ি' নামে পরিচিত। কয়লার গাড়ি কেন ঠিক জানি না। ট্রেন এ অনেক বস্তা বস্তা কয়লা উঠতো আর ট্রেন টা  চলতো steam engine এ।   ওই কয়লার গাড়িতে করে যখন রুকনি নামতাম তখন আমাদের কয়লার গোফ হয়ে যেত।  মাথা ভর্তি কয়লার গুঁড়ো থাকতো। 

এবার আসি মজার জায়গায়- যেটা আমার সবচেয়ে প্রিয়। যেই স্টেশন এ নামতাম, স্টেশন এ চায়ের দোকানের লোক টা দৌড়ে এসে মা বাবাকে প্রণাম করতো। আর আমাদের ঝপ করে কোলে নিয়ে নিতো। দুই বোন কোনো এক মামার কোলে। স্টেশন এ suitcase গুলো রেখে আমরা এবার হাটা  শুরু করতাম, দাদুর বাড়ির দিকে।  স্টেশন আর গ্রামের বসতির মধ্যে ধানের খেত।  খেতের আল দিয়ে হাটতে আমার আর বোনের কি মজা। মা কতবার পেছন থেকে ডাক দিতো "পড়ে যাবি , আস্তে যা" কিন্তু কে কার কথা শোনে।  বাবা অবশ্য আমাদের কিছু বলতো না। মাকে বলতো, "পড়ে  গেলে লাগবে, তখন নিজেরাই বুঝবে।"

যখন আল দিয়ে হেটে হেটে যেতাম, গ্রামের অনেক লোকের সাথে রাস্তায় দেখা হতো।  খেতে কাজ করা চাষীরাও আমাদের অবাক হয়ে দেখতো।  অচেনা শহুরে দুটো বাচ্চা ।  যেই মাকে দেখতো, বলতো "মুনা আলি। " সবাই এক কথা বলতো।  ঠিক মনে হতো গোটা গ্রাম যেন মুনার অপেক্ষায় ছিল। গ্রামতুতো মামারা আমাদের দেখে  বলতো , "ও ভাগ্নি বটে যে". দিদা-দাদুরা বলতো "মুনার বিটিগুলো বটে না ?" আমি মায়ের মতন দেখতে।  তাই আমায় বলতো "এককিবারে মুনার পানা মুখ ". বাবাকে বলতো "জামাই এলে ? এখন থাইকছ তো ?" বাবা গোটা গ্রামের জামাই ছিল। 'মুনা আলি' কথাটা আমার ছোট্ট মনে গভীর ভালোবাসার এক দাগ কাটতো। 

স্টেশন থেকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছতে কত নেমতন্ন চলে আসতো।  স্টেশন এ যে suitcase রেখে আসা যাই সেটা একমাত্র আমার মামারবাড়িতে সম্ভব ছিল।  আমরা বাড়ি পৌঁছোবার  আগে দিদা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতো। কোনো সাইকেল সওয়ারী ততক্ষনে 'মুনার মাকে ' মুনা র আসার খবর দিয়ে দিয়েছে।  আমাদের দেখেই দিদা 'দিদিভাই' বলে ছুটে আসতো। মামারবাড়িতে তখন আমরাই সবচেয়ে ছোট , তাই রাজকন্যের খাতির পেতাম বললে ভুল হবে না।  গ্রামের ভেতরে পাকা রাস্তা ছিল না।  বৃষ্টিতে কাদা রাস্তায় জুতোগুলো কাদায় পুরো স্নান করে যেত।  সেই জুতো নিয়ে বাড়ি পৌঁছেই সারা উঠোন কাদা কাদা করতাম।  

'বৌ' , বাউরি পাড়ার নতুন বউ, মামারবাড়িতে কাজ করতো।  সবাই তাকে 'বৌ' বলতো , আমিও 'বৌ' বলতাম। এখনো তাই বলি।  অনেকদিন পর জানলাম ওর নাম 'বৌ' না . ও গ্রামে বৌ হয়ে এসেছিলো বলে সবাই ওকে 'বৌ' ডাকে। উঠোন কাদা করে যখন মায়ের কাছে বোকা খেতাম, তখন  বৌ বলতো - 'কি হবেক তো, আমি কইরে দিবো সাফ। ' মামারবাড়িতে বোকা ঝকা চলে না সেটা আমরা অনেক আগেই টের পেয়ে গেছিলাম। স্টেশন এ রাখা Suitcase গুলো ইতিমধ্যে কিছু গ্রামতুতো মামারা ঠিক পৌঁছে দিতো। এই রকমেই হতো আমাদের মামারবাড়িতে আগমন। 

 তারপর, কিছুদিনের মধ্যেই আসে পাশে আমাদের বন্ধু হয়ে যেত।  সবচেয়ে মজার ছিল সবাই আমাদের মামা বা মাসি ছিল।  দিদি -দাদা বয়সী ছেলে মেয়েরাও নাকি আমাদের মামা মাসি।  দাদু গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে পড়তেন।  তাই, আমাদের গ্রাম ভর্তি খুদে খুদে মামা -মাসি।  

বন্ধু হবার সাথে সাথে শুরু হতো আরেক মজা, মানভূমের ভাষার খেলা। একবার এক খুদে মাসি আমাদের বলে গেলো  - ' দুপুর দুটা নাগাদ গ্রিল টো দিয়ে টুকুর টুকুর ভালবি। ' আমি আর বোন দিল্লিবাসী কিছুতেই 'টুকুর টুকুর ভালবি ' মানে বুঝতে পারছি না. অনেক ভেবে চিনতে শেষে দিদাকে গেলাম জিজ্ঞেস করতে।  দিদা তো হেঁসে কুল পায় না।  'ভালবি ' মানে যে 'দেখবি' এটা আমাদের বোঝা কিছুতেই সম্ভব ছিল না।  আরেকদিন, বোন গাছ থেকে পরে যাওয়াতে আমাদের এক খেলার সাথী মামা, মা কে নালিশ করে বললো 'রিপাটোর বড় বেরাম' 'বেরাম' কথাটা কখনো শুনিনি।  'বেরাম' মানে নাকি বেড়ে পাকামো।  এইরকম অনেক শব্দ আমরা শিখতাম - মানভূমের ভাষা।  ওই ভাষাতে একটা অদ্ভুত আন্তরিকতা, ভালোবাসার ছোঁয়া অনুভব করতাম।  আজও  করি। হয়তো মামামারবাড়ি ভাষা বলে মনে হয়। নতুন শেখা কথাগুলো বেশিরভাগটাই শহুরে হাওয়াই আবার ভুলে যেতাম।  এই শেখা-ভোলার মাঝে প্রতি বছর গরমের ছুটি আসতো।  আর, প্রতি গরমের ছুটিতে মামারবাড়ির গ্রাম মায়ের জন্যে অপেক্ষা করে থাকতো।  স্টেশন এ মা নামতেই সবাই খুশি হয়ে বলে উঠতো 'মুনা আলি' 

শনিবার, ১৬ জুলাই, ২০২২

ঠাকুমা ও লোলিতা

   শনিবারের সকাল - 

'টাকা না দেওয়াই পাটনায় গৃহবধূকে  অভিযোগ - পাটনায় সীতাকুন্ড এলাকায় টাকার দাবিতে গৃহবধূকে সানস্রোধ করে খুনের অভিযোগ উঠলো স্বামী ও  সদস্যদের বিরুদ্ধে' - লোলিতা গড়গড় করে   খবরের কাগজ পড়ছে , সামনে লোলিতার মা আর ঠাকুমা  সকালের চা টা  নিয়ে বসলো। " কি সব আজে বাজে খবর,  ভালো খবর হয় না রে লোলিতা ?" - ঠাকুমা  জিজ্ঞেস করলো।  "বাজে খবর আবার কি ঠাকুমা? খবর মানেই তো খবর ই, নিশ্চই ঘটেছে।   এই জন্যে আমি বলি বিয়ে টিয়ে আমি করবো না।  এই সব পন - টন আমার  এক্কেবারেই সহ্য হয় না।  'ধুর তোর বিয়েতে আমরা পন দিতে যাবো কেন ? এখনকার দিন এ আর পন দেওয়া নেওয়া হয় না।  " ঠাকুমা র  গলায় বেশ একটা বিশ্বাস।  বেঙ্গল এ পণপ্রথা সেইভাবে কোনোদিনই ছিল না।  তোর দাদু র বাবা, মানে আমার  শশুড়মশাই  ও কোনো পন দাবি করেন নি জানিস।  আমার বাবা র যা ইচ্ছে হয়েছিল দিয়েছিলো।  তবে বাবা যে কম দিয়েছিলো তা কিন্তু না।  পন দাবি করে নি তো কি হয়েছে, আমাকে কিন্তু আমার বাড়ির থেকে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে পাঠিয়েছিল - ১৩ ভরি শোনা, অর্ডার দিয়ে বাড়িতে বানানো  সেগুন  কাঠের পালঙ্ক , বসার চেয়ার , সাজার টেবিল - কি  যেন বলিস তোরা - Dressing table ,  Gramophone record  - সব দিয়েছিলো।  আমার শাশুড়ি, মানে তোর বাবা র ঠাকুমা রে , কি খুশি - বললে "সাক্ষাৎ লক্ষী  এলো ঘরে" . খুব ধুম ধাম করে আমার বাবা আমার বিয়ে দিয়েছিলো জানিস।  

তাই নাকি ঠাকুমা? আর মা কে নানু কি দিয়েছিলো? তোর  মায়ের বাড়ির  থেকেও আমরা কিচ্ছু দাবি  করি নি।  তোর দাদু আর বাবা এই পুনপ্রথার  এক্কেবারে বিরুদ্ধে।  তবে তোর মা কেউ তোর নানু বেশ সাজিয়ে পাঠিয়েছিল।  এই শুনে ললিতার মা এর মুখে এক গাল হাসি, গর্বে মুখ জ্বলজ্বল করে উঠেছে।  চা এর কাপ তা নামিয়ে রেখে লোলিতা র মা এবার এবার হিসেবে দিতে শুরু করলো - ১০ ভরি শোনা, জোরোয়ার একটা সেট , সেগুনের খাট ইত্যাদি ইত্যাদি।  ঠাকুমা বললো ' শোন্ লোলিতা এই পণপ্রথা জড়িত এরম বাজে খবর বিহার, ইউ পি টেই পাবি।  আমাদের দিকে এইসব অনেক দিন আগেই উঠে গেছে। বুঝলি ? " 

উঠে গেছে তো বুঝলাম ঠাকুমা , কিন্তু তও তো দেখছি তোমরা দুজনেই বেশ গর্বের সাথে হিসেবে দিলে তোমাদের বাবা রা তোমাদের বিয়েতে কেরাম তোমাদের সাজিয়ে গুছিয়ে শশুরবাড়ি পাঠিয়েছে।  এবার যদি আমি এই সব জিনিস না নিতে চাই , বাবা দিতে চাইলেও না , তাহলে কি আমি শশুড়বাড়ির লক্ষী হবো ? 

মা ঠাকুমা দুজনেই চুপ।  

"The Dowry Prohibition Act enacted on July 1, 1961, in India prohibits the giving or receiving of a dowry. The law defines a dowry as property or valuable security given by either party to the marriage, or by the parents of either party, or by anyone else, in connection with the marriage."

রোববার সকাল - 

'সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ  - বাবা কে কোর্টে তুললো মেয়ে।  সম্পত্তি বিভাজন নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই অশান্তি চলছে হাওড়া জিলা র বালি এলাকার ঘোষ পরিবারে।  সুবীর ঘোষ ও ওনার স্ত্রী সব সম্পত্তি ছেলে সায়ন্তন ঘোষ এর নাম এ লিখে দেওয়ার মেয়ে সোনালী ঘোষ এর চরম আপত্তি। সোনালী ও তার স্বামী বালিতেই থাকে। সোনালী র স্বামী এক বোরো ইন্সুরেন্স কোম্পানি র ম্যানেজার।  সোনালী র বক্তব্য যে গত দু বছর আলোচনা র পরেও তার বাবা ও মা নিজেদের সিদ্ধান্ত থেকে নড়েনি আর এই সমস্যার কোনো মীমাংসা করা যায়নি , তাই সে বাধ্য হয়েছে  আইনের সাহায্য নিতে। " লোলিতা রোজকার মতন নিজের মনে আবার গড় গড় করে খবরের কাগজ পরে চলেছে।  ঠাকুমা ও মা সকালের চা নিয়ে সামনে বসে।  

'এ আবার কেমন কথা ? মেয়ে বাবাকে কোর্ট এ তুললো , তও বাবা র সম্পত্তি পাওয়ার জন্যে।  ' ঠাকুমা শুরু করলো।  'হ্যাঁ ঠাকুমা  আইন অনুযায়  - বাবার সম্পত্তি তে  যে মেয়ের সমান অধিকার। সোনালী ঘোষ ন্যায্য দাবি করছে। ' লোলিতা বেশ উত্তেজনার সাথে বললো।  ' যাই বোলো বাপু, বাপের জন্মে শুনি নি মেয়ে রা সম্পত্তি দাবি করে।  তও বুঝতাম যদি অবিবাহিত বা বিধবা মেয়ে। দিব্বি ভালো বাড়িতে বিয়ে হয়ে মেয়ে। কোথায় শান্তিতে নিজের সংসার করবে না এখন বাবা র সম্পত্তি র জন্যে মামলা করছে।  

জানিস, তোর দাদুর বাবা , মানে তোর বাবার ঠাকুরদা, আমার শশুরমশাইয়ের র বিশাল জমিদারি ছিল।  বিশাল বাড়ি, অনেক জমি জায়গা, আমাদের কত ধান হতো , পুকুরে মাছ। .. তুই তো আমাদের রামচন্দ্রপুরে এর বাড়িতে গেছিস তাই  না? তোর মা ওনাকে দেখেছে।  তোর মা র যখন বিয়ে হয়ে আসেন উনি বেঁচে ছিলেন।  যেমন জমিদারি চেহারা সেরম দাপট। যাইহোক, ওনার ৫ ছেলে আর এক  মেয়ে ছিল।  তোর বাবার এক মাত্র পিসি, আমার এক মাত্র ননদ।  ননদের বেশ ভালো বাড়িতে বিয়ে হয়েছিল। স্বামী র পরিবারের বিশাল মসলা র ব্যবসা।  জানিস, ওদের বাড়িতে গেলে কি সুন্দর মসলার সুগন্ধ আসতো। প্রান্ত চনমনে হয়ে উঠতো।  কিন্তু ব্যবসা সে তো ওপর নিচ চলতেই থাকে। হটাৎ সেই সময় পর পর তিন বছর বর্ষায়  খুব বৃষ্টি হলো।  তাতে ব্যবসায়ী অনেক ক্ষতি হলো।  অতিরিক্ত আদ্রতার জন্যে অনেক মসলা ভাড়ারেই নষ্ট হলো।  এদিক ওদিকের ধার দেনা - সব মিলিয়ে আমার নন্দাই আর ব্যবসা টাকে ফিরে  দাঁড় করাতে পারলেন না।  আমার শশুরমশাই কিছু সাহায্য করেছিলেন , কিন্তু তাতে সেরম লাভ কিছু হলো না।  অগত্যা ব্যবসা বন্ধ করতে হলো।  যাইহোক, সে অনেক পুরোনো কথা।  যা বলছিলাম, আমার ননদের পরিবার সেই সময় সচ্ছল না থাকলেও সম্পত্তি ভাগের সময় যখন আমার শশুরমশাই মনিদি, মানে তোর বাবার পিসিকে ভাগ দিতে চাইলো সে কিছুতেই নিলো না।  ভাইদের সম্পত্তি তে কোনো দাবি করলো না।  খুব উঁচু মাপের মানুষ ছিলেন আমার ননদ।  কত ভালো সম্পর্ক ছিল আমাদের সাথে।  আমাদের সময় বাবা এই সব মেয়েদের সম্পত্তি দাবি নিয়ে কোনো ঝামেলা ছিল না।  এরম অদ্ভুত আইন ও ছিল না।  

কিন্তু ঠাকুমা এই যে তুমি বোলো আজকাল ছেলে - মেয়ে সব সমান। তো এখানে সমান কি করে হলো।  ছেলে র জেরোম বাবা মেয়ে র ও তো বাবা।  ছেলে যদি বাবা র সম্পত্তি পাই তো মেয়ে কেন বঞ্চিত থাকে? সমান কি করে হলো তাহলে? এই নতুন আইন তো সমান করার চেষ্টা করছে। সেটাতে তোমার আপত্তি কেন? ললিতার যুক্তিবাদী মনের প্রশ্ন। 

'কি যে বলিস ? সমান মানে কি সম্পত্তি নিয়ে  ভাগাভাগি? এই যে তোদের বাবা তোকে আর ভাইকে সমান ভাবে পড়াশুনো করেছে, এরপর কলেজ পাঠাবে, তারপর দুজনেই চাকরি করবি - এইগুলো কত পাওয়া বলতো ? এইটাই তো সমান। আমাদের সময় আমরা কোথায় স্কুল এ গেলাম। ১৮ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে গেলো , বেশ তারপর সংসার। সম্পত্তি কি সব হলো? ' 

'তুমি যেগুলো বললে সেগুলো তো basic needs এ পরে  ঠাকুমা।  যাই হোক তোমাকে আর এই নিয়ে বোঝাবার সময় নেই আমার' লোলিতা বেশ রেগেই বললো।  

ললিতার মা এবার বলে উঠলো ' এই দেখ না ২ ম্যাশ আগে আমি যে মামারবাড়ি গেছিলাম , তখন তো আমি আর তোর মাসি আমাদের ভাগের সম্পত্তি লিখে দিলাম তোর মামাদের। আমার যথেষ্ট আছে , আমি কেন ভাইদের সম্পত্তি নেবো? সমাজ বলে তো একটা জিনিস আছে বুঝলি লোলিতা ? লোক এ কি বলবে আমি যদি এখন বাবা র সম্পত্তি দাবি করি।  সবই কি আইন মেনে হয় ? ' 

সব শুনে লোলিতা প্রশ্ন করলো - ' তাহলে যা বুঝলাম তোমরা বলছো আইন না মেনে সমাজের প্রাচীন প্রথাগুলো বজায় রাখতে ?' মা, আইনত নানুর  সম্পত্তি খালি তোমার ভাইদের সম্পত্তি কি করে হলো ? ইটা তুমি ভাবচই  বা কেন ? তোমার সমান অধিকার আছে নানুর সম্পত্তি র ওপর।  তাছাড়া বড়মামা আর ছোটমামা র ও তো অনেক আছে তো োর কেন তোমার প্রাপ্য সম্পত্তি তে ভাগ বসলো? 

ঠাকুমা, নিজের কম  বাবার পিসি যখন সম্পত্তি র ভাগ নিলো না তখন তোমাদের কারুর মনে হলো না তাকে ভাগ দেওয়ার কথা।  ওনাকে ভাগ না দিয়ে তোমরা তো ভুল করেছো।  তখন কোন সমাজ পিসিঠাকুমার সংসার এর কথা ভাবলো ? পিসিঠাকুমা তো না হয় উঁচু মাপের মানুষ ছিলেন বললে, কিন্তু  দেখেছো তোমাদের চিন্তাধারা কতটা regressive - দাড়াও রিগ্রেসিভ এর বাংলা বলি - 'পশ্চাদ্গামী,  প্রত্যাবর্তী, পশ্চাদমুখী/  বুঝলে ? জাজহীন আইন ছিল না তখন সেটার সুবিধে নেওয়া হতো আর এখন আইন আছে তো সমাজ এর নাম করে সেটা পাস্ কাটিয়ে যাচ্ছ।  

"The Hindu Succession (Amendment) Act, 2005 (39 of 2005) was enacted to remove gender discriminatory provisions in the Hindu Succession Act, 1956. Under the amendment, the daughter of a coparcener shall by birth become a coparcener in her own right in the same manner as the son. "





শ্রী চরণে কমলেষু

 "খোকা, ও খোকা - যা পোস্ট অফিস থেকে ১০ তা পোস্টকার্ড নিয়ে আয়ে। ওং  বিজয়ের প্রণাম জানাবি।"  মা খোকাকে বললো।  খোকার বাবা তখনকার দিনে P & T (পোস্টাল এন্ড টেলিগ্রাম) ডিপার্টমেন্ট এ কর্মরত ছিলেন।  আর ওদের পোস্ট অফিস কম্পউন্ডে একটা  কোয়ার্টার এ বসবাস ছিল।  দেশের মামার বাড়িতে দূর্গা পুজো তে  প্রতিবছর খোকারা সবাই যেত ।  দশমীর পরের দিন একাদশীতে  খোকার বাবাকে  কর্মরত জায়গায় ফিরতে হতো।  সেইজন্যে পরের দিন কোয়ার্টার এ আসার  পরেই পোস্ট কার্ড আনিয়ে  ওং বিজয়ার  গুরুজনদের প্রণাম জানানো অতি অবশ্যই করতে হতো।

খোকা পাঁচ ভাইবোনদের মধ্যে বড়ো  সন্তান। ও তখন ক্লাস ৫ (V ) এ পরে। সেই জন্য ওর মা ওকে দিয়েই ওং  বিযয়ার প্রণাম পত্র লেখাতে চায়। এটা  ছিল খোকার চিঠি লেখার প্রথম বছর। পরের বছর থেকে এটাই প্রতি বছর করতে হতো। 

খোকার মা তখনকার দিনে কোনো স্কুল এ যায় নি।   জমিদার বংশে জন্ম হবার জন্য কোনো স্কুল এ ভর্তি  করা হয় নি। কিন্তু বাংলা ভাষায় র জ্ঞান বেশ ভালোই ছিল । মা খোকাকে বললো।  আর খোকা লিখে গেলো। "লেখো -   শ্রী চরণে কমলেষু , জ্যাঠা মশাই ও জেঠি মা, আপনারা আমাদের ওং  বিজয়ের ভক্তি পূর্ণ প্রণাম গ্রহণ করবেন।  দাদা ও দিদিদের  ভক্তিপূর্ণ প্রণাম জানাবেন। আমরা ভালো আছি। এবার মল্লিকপুরে ভালো ভাবে দূর্গা পুজা হলো। এবারে দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফ এ যা - " আশা করি আপনারা ভালো আছেন।  শরীরের প্রতি যত্নবান হবেন।  এখানে আপনারা এলে আমরা খুশি হবো।  বাবা ও মা ভালো আছেন। আপনার কথা মতো আমরা ভালো ভাবে পড়াশোনা করছি।  ইতি বিনীত খোকন।"

এই ভাবে মা খোকাকে দিয়ে একাধারে খোকার কাকা কাকিমা মাসিমা মেসোমশাই ও অন্যানদের বিজয়ের প্রণাম জানাতো। 

খোকার মনে খুব আনন্দ হতো।  চিঠি লেখা ও এরই মাধ্যমে ওনাদের কাছে-আসা অনুভব করতো  . তারই মধ্যে এক আত্মিক টান থাকতো। সে মনে মনে এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসার আনন্দে বিভোর থাকতো। খোকা ভাবতো ওর গুরুজনরাও তার মতন ওর চিঠি পেয়ে আনন্দ পেতো। এই বিভিন্ন চিন্তা ধারা ওর মনে খেলা করতো। যখন সেই গুরুজন রা  উত্তরে আশীর্বাদস্বরূপ চিঠি পাঠাতো, তখন খোকার মা বলতেন - "নে  পড়ে শোনা"  . খোকা পড়তে পড়তে অনুভব করতো তার গুরুজন রা যেন তার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ জানাচ্ছে চিঠির মাধ্যমে  । সেই অনুভবসকল ছিল ঐশ্বরীয় - যা অনুভব করা যায়, কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এটা  মনের ও আত্মার উপলব্ধি- যার ভাষা নেই।

এখন সেই খোকা ৭৩ বছরের বৃদ্ধ - তার সব  গুরুজনেরা  তাকে ছেড়ে চিরতরের জন্য চলে গেছেন । তারা আর কখনো ফিরবে না। কিন্তু এখন যেন সেই বৃদ্ধ খোকা প্রতি দশমীর দিন তার মায়ের কথা শুনতে পায় - "খোকা, যা পোস্ট অফিস থেকে ১০ তা পোস্টকার্ড নিয়ে আয়। লেখ,  শ্রী চরণে কমলেষু "

- শান্তি কুমার ব্যানার্জী 

 


সোমবার, ৭ মার্চ, ২০২২

বিচিত্রানুষ্ঠান

সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতিভা আমার খুবই শিথিল। তাই জ্ঞানত ওইদিকে বিশেষ পা মাড়াই না। কিন্তু কিছু ফন্দিবাজ মহিলার পাল্লায় পরে ইদানিং নিজের ঊষর মস্তিষ্কে সার জল দিতে বাধ্য হয়েছি। আমার মা, আমার ছোটদিদা, আমার স্ত্রী এবং সবার প্রিয় শুভা দি - এই চার কন্যা মিলে আমাকে ভালোই কোনঠাসা করে ফেলেছে। অগত্যা মনের ভিতর থেকে কুড়িতে কাচিয়ে মাঝে মধ্যে একটা দুটো আজগুবি প্রবন্ধর জন্ম দি। আর তাতেই হলো বিপদ। বাজারে গুজব ছড়িয়ে গেলো আমি নাকি এক উঠতি প্রতিভাশালী লেখক । সাহিত্য রচনার সময় আমি কোষ্টকাঠিন্যের রুগীদের প্রতি সহানুভূতি বোধ করি। এই কথা জনগণকে জানিয়ে দিতে চাই। কিন্তু আজকের সমস্যা সাহিত্য রচনা নিয়ে নয় - সাহিত্য রচনার spillover effect নিয়ে। বছরে দু-তিনবার আমাদের "লেখা-পরা" literary group এর জন্য কিছু লিখতে হয়। সে আমি মোটামুটি ব্যবস্থা করে ফেলেছিলাম। কিন্তু বিপদ হলো যখন জনতা আমাকে "উঠতি" লেখক থেকে "Established artist" এ promote করে দিলো। লিখতে যখন পারি তখন নাচ, গান, বাজনা, নাটক এইগুলোতেও নিশ্চয় আমি পারদর্শী। যে রাঁধে, সে চুলও বাঁধে - এই প্রবাদ এখানে খাঁটে না। সে কথা আর কি করে বোঝাই। একেই বলে "spillover effect".

নিশ্চিন্ত মনে পুজো বার্ষিকী পত্রিকার কাজ করছি। মানে অন্যের লেখা copy paste করছি। এর মাঝে শ্রীপর্ণা দির phone এলো। শ্রীপর্ণা দি আমাদের cultural কমিটির সদস্য।  "এই ঋত্বিক, তুমি পুজোয় নাটক করবে ?" শ্রীপর্ণা দি জিগেশ করলো। আমি আর নাটক ? জীবনে শেষ বার অভিনয় করেছিলাম উচ্চ মাধ্যমিক এর  chemistry পরীক্ষার আগে। পেট ব্যাথায় কাতর রোগীর অভিনয়। সত্যজিৎ রায় বেঁচে থাকলে গর্ব বোধ করতেন। কিন্তু এই কালজয়ী অভিনয়ে কোনো হাততালি পরে নি। পরেছিলো খালি এক জব্বর কানমলা । আমাদের দেশে Method actor এর কোনো কদর নাই। তাই শ্রীপর্ণা দি কে বলে দিলাম আমার দ্বারা হবে না। তুমি অন্য লোক খুঁজে নাও। কিন্তু শ্রীপর্ণা দি খুবই চালাক । মোক্ষম অস্ত্র টি লুকিয়ে রেখেছিলো। "তোমার সাথে জয়ীতাও করবে। ওর সাথে কথা হয়ে গেছে ". ব্যাস শক্তিশেল। জয়ীতা আমার স্ত্রী।  আর তিনি যখন সম্মতি দিয়েছেন, তখন আমার মতামতের কোনো প্রয়োজন নেই।  আমি একটু মিউ মিউ করে বলার চেষ্টা করলাম যে পুজো পত্রিকার এতো কাজ, rehearsal এর সময় কিভাবে দেব। তাতে শ্রীপর্ণা দি assurance দিলো যে একটা দুটো rehearsal দিলেই আমাদের হয়ে যাবে। ছোট পাঠ। অগত্যা রাজি হলাম। পরের রবিবার rehearsal . ফন্দিবাজ মহিলার তালিকায় শ্রীপর্ণা দির নাম যোগ হলো। তাঁরা আবার আমায় বাজি মাত করেছে।

Rehearsal শুরু হলো। প্রথম দিন গিয়েই বুঝলাম ফাঁকি মারার কোনো জায়গা নেই। এই নাটক হলো যাকে বলে multi starrer . Austin এর নাটক scene এর এক এক তারকারা পাঠ করছে। তার ওপর স্নিগ্ধ দির মতন তাবড় পরিচালক।  আমার তো শিরে সংক্রান্তি। নিজেকে বোঝালাম - ঘাবড়াবার কিছু নেই। আমি এর আগেও নাটক করেছি। class ৮ এ পাড়ার নাটকে এ গাছের role করেছিলাম। একথা শুনে যারা আড়ালে মুখ টিপে হাসছেন তাদের জানা উচিত যে গাছের পাঠ করা চাট্টিখানি কথা নয়। খালি costume পরে চুপ চাপ স্টেজের কোনায় দাঁড়িয়ে থাকলে হবে ? একদমই না। মশার কামড় খেয়ে, বাথরুম চেপে, বিনা প্রতিবাদে মৃদু তালে পাতা-ডালপালা নাড়িয়ে যেতে হয়। যতই নাক কান চুলকাক না কেন - মাটি আর দাঁত কামড়ে স্টেজ আলো করে থাকতে হয়। এক্কেবারে বটগাছ। এ এক শিল্প। একদম "Natural" Acting .

যাই হোক। এই ভাবে confidence এর থলিটা ঠেসে ঠুসে ভরে নিয়ে আমি rehearsal এ নেমে পড়লাম। বাদল সরকারের হাসির নাটক নাটক। নাম বিচিত্রানুষ্ঠান। সপ্তাহে দুদিন করে rehearsal । তবে rehearsal এর চেয়ে খাওয়া দাওয়া টাই বেশি আকর্ষণীয় ছিল আমার কাছে। প্রথম দিকে snacks দিয়ে শুরু হয়েছিল, তারপর ধীরে ধীরে মাংস ভাত, Chinese, বিরিয়ানি ইত্যাদি তে পদোন্নতি হয়েছিল। শেষে এমন অবস্থা, যে নাটকের costume এর থেকে পরের rehearsal এর menu নিয়ে লোকের বেশি আগ্রহ। নেহাত স্নিগ্ধা দি বাঁধ সাধলো।  নয়তো আর একটু হলেই নাট্য রস, খাদ্য রসিকতায় পরিণত হয়ে যেত।

দেখতে দেখতে দু -মাস কেটে গেলো। প্রচুর Rehearsal এর পর অবশেষে মনে একটু বল পেয়েছি। আমার পাঠ খুব বড়ো নয়, ওই ৪-৫ লাইন খালি। কিন্তু তাও আমি কোনো ঝুঁকি নিতে চাই নি। সুযোগ পেলেই অনুশীলন করে নিয়েছি। ঘরে, বাইরে, অফিস এর ফাঁকে, নির্জন parking lot এ, এমনকি HEB এর checkout লাইন এ - যেখানে সুযোগ পেয়েছি, লাইন গুলো একটু করে আউড়ে নিয়েছি। Unsuspecting জনতার বিভ্রান্তির জন্য আমি দুঃখিত। কিন্তু মহান অভিনেতারা সবরকম পরিস্থিতির জন্য তৈরী থাকে। যুগান্তকারী অভিনয় এমনি এমনি হয় না। মনে বেশ আত্মবিশ্বাসের  একটা ফুফুরে ভাব। এ যাত্রা ফাঁড়াটা বোধয় কেটে যাবে। এই কথা শুনে, আমার ভাগ্য, হাত-পা ছড়িয়ে, পেটে খিল দিয়ে, হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছিলো ।

নাটকের দিন সকাল থেকেই গন্ডগোল শুরু। Central Texas Bengali Association এর বাজেট কম থাকায় আমাদের ড্রেস রিহার্সাল করার সুযোগ হয় নি। তাই সকাল থেকে সবাই whatsapp এ নিজেদের costume ও mak-up এর ডিটেল share করছিলো। এখানেই হলো প্রথম বিপদ। দেখি সবাই নিজের নিজের পরচুলা পরা ছবি পাঠাচ্ছে। কিন্তু আমার তো পরচুলা নেই। আমায় তো কেউ বলে নি পরচুলার কথা। পরে জানতে পেরেছিলাম নাটকে পরচুলা টা নাকি standard requirement. Character কে গুরুত্ব দেয় । আমার মতন অ্যামেচার সে কথা জানতো না। কিন্তু এখন আর ভেবে লাভ নেই। এই short notice এ পরচুলা জোগাড় করা যাবে না । অথচ বাকিদের থেকে আমারি পরচুলার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। ব্যাপারটা হচ্ছে যে আমার dual role. মানে আমি দুটো চরিত্র অভিনয় করছি। এক হলো light technician চুনি বাবু আর অন্য টি হলো এক intellectual দর্শক। এদের চেহারা আলাদা, ব্যক্তিত্ব আলাদা, আদব - কায়দা সবই আলাদা। বহু অনুশীলন করে এই দুই চরিত্রের ব্যক্তিত্ব আর আদব -কায়দার ভিন্নতা আমি তুলে ধরতে শিখেছি। কিন্তু চেহারার অমিলের ব্যাপারটা আমি বেমালুম ভুলে গেছি । মনে থাকলে, একটা পরচুলা বা নকল দাড়ি নিশ্চয় জোগাড় করে রাখতাম। এক চরিত্র দাড়িওয়ালা , অন্য জনের মাথায় ঝাঁকড়া চুল। কিন্তু এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে light technician চুনি বাবু আর intellectual দর্শক আসলে একই লোক কিন্তু ভিন্ন ব্যক্তিত্ব। হাসির নাটক পরিণত হয়েছে hollywood thriller এ। ঠিক করলাম অন্য রকমের জামাকাপড় পরে ব্যাপারটা ম্যানেজ দেবার চেষ্টা করবো। একেই বোধয় বলে স্টেজএ মেরে দেওয়া। কিন্তু আমার পোড়া কপালে তাও জুটলো না ।

সাড়ে দশটায় Performing Arts Center এ পৌছালাম। এখানেই এক প্রকান্ড auditorium এর স্টেজ ভাড়া নেওয়া হয়েছে। আমাদের নাটক lunch এর পর । হাথে সময় আছে আর একবার একটা মিনি rehearsal দেওয়ার। Auditorium এর দরজার সামনে অনির্বান দা দাঁড়িয়ে আছে। অনির্বান দা আমাদের association এর president আর আমাদের নাটকের এক প্রধান চরিত্রে অভিনয় ও করছে। "অনির্বান দা, সব ready ? বাকিরা কি ?" - আমি জিজ্ঞেস করলাম। অনির্বান দা আমার দিকে না তাকিয়ে, ভাঙা গলায় বললো "Hall হলো না" . "মানে ? Hall এর কি holo না ?" এবার একটু বিরক্ত হয়েই অনির্বান দা বললো "উফঃ , hall পাওয়া যাবে না। আমাদের নাটক Brushy Creek পার্ক এ হবে। সবাই সেখানেই যাচ্ছে। ". আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। আমি তাবড় অভিনেতা নই ঠিকই , কিন্তু আমার কিছু basic standard আছে। কোথায় গিয়ে এখন মাঠে ঘটে অভিনয় করতে হবে ? এটা একটা উৎকৃষ্ট মানের নাটক - পাড়ার যাত্রা নয়। বিরক্তি আর হতাশা নিয়ে আমি Brushy Creek পার্ক এর দিকে রওনা হলাম।

পার্ক এ পৌঁছে দেখি নাটকের দলের সবাই সেখানে উপস্থিত। পরিচালক স্নিগ্ধা দির পরিচালনায় সায়ন দা বাঁশ আর কাঠের তক্তা দিয়ে স্টেজএর কাঠামো বানাচ্ছে। সর্মিতা দি আর শ্রীপর্ণা দি আগাছা সরিয়ে স্টেজের মাঝখান টা পরিষ্কার করছে। জয়ন্ত দা আর সুব্রত দা দর্শকের চেয়ার পাতছে । সৌমেন দা prop arrange করছে। আর দীপন দা তাকে তদারকি করছে । সবাই কে একসাথে এই প্রতিকূল পরিস্থিতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে দেখে মনে বল এলো। Broadway লাগবে না - এই ফাঁকা ময়দান এই আমরা কালজয়ী অভিনয় করে দেখিয়ে দেব।

সকলের মিলিত প্রচেষ্টায় অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের makeshift স্টেজ তৈরী। দর্শকের চেয়ার মোটামুটি সবই ভর্তি - housefull বলা যেতে পারে । আমার পাঠ সেই একদম শেষ দৃশ্যে। তাই ঠিক করলাম প্রথম দুটো দৃশ্য দর্শকের মাঝখানে বসেই দেখবো। বেশ একটা audience perspective পাওয়া যাবে । দর্শকের মাঝে নাটক দেখতে বেশ মজাই লাগছিলো। এতবার rehearsal করেও যেন পুরোনো হয় না। এতটাই মশগুল হয়ে গেছি যে খেয়ালি করি নি কখন শেষ দৃশ্য শুরু হয়ে গেছে। হঠাৎ টনক নড়লো। এই জাহ - আমার part টা কি miss হয়ে গেলো ? পাশের লোক কে জিজ্ঞেস করলাম - "আচ্ছা দাদা, এই চুনি বাবু কি এসেছিলেন ?" ভদ্রলোক ভুরু কুঁচকে একটু ভেবে জিজ্ঞেস করলেন "চুনি বাবু, চুনি বাবু, ও বেনারস এর চুনি বাবু ?". "আরে ধুর মশাই, light technician চুনি বাবু" - আমি বিরক্ত হয়ে বললাম। বুঝলাম চুনি বাবুর ডাক বোধয় এখনো পরে নি। তড়িঘড়ি করে দর্শকের মাঝখান থেকে বেরিয়ে স্টেজের পিছনে গিয়ে উপস্থিত হলাম। যেকোনো সময় এবার আমার ডাক পর্বে।

চুনি বাবুর কথোপকথন সুধীন বাবু চরিত্রের সাথে। সুধীন বাবুর ভূমিকায় দীপন দা। দীপন দা খুব বড়ো মাপের অভিনেতা আর তার থেকেও বড়ো  মাপের খাদ্যরসিক। আশাকরি পেট ভরে lunch করে এসেছে।  Cue পেয়ে আমি স্টেজ এ ঢুকে পড়েছি। বহু অনুশীলন করা opening লাইন তা এক্কেবারে বচ্চনের মতন করে deliver করলাম। হাততালি আশা করি নি কিন্তু এইরম নিস্তব্ধতাও আশা করি নি। পাশে তাকিয়ে দেখি পরের লাইন বলার জন্য সুধীন বাবু ওরফে দীপন দা স্টেজ  এ অনুপস্থিত। পরিস্থিত তা এইরম দাঁড়িয়েছে, চুনি বাবু স্টেজ এ উঠে সুধীন বাবুর অনুপুস্থিতে, ওনাকেই উদ্দেশ্য করে এক মোক্ষম সংলাপ ঝেড়েছে । এবার পরের ডায়ালগ pickup করার লোক নেই। কিন্তু দীপন দা গেলো কই ? এইদিকে জনতা বিভ্রান্ত। তারা কিছুই বুঝতে পারছে না কি হচ্ছে। কিন্তু আমার হলো আরো বড় বিপদ। The show must go on - অতয়েব স্নিগ্ধা দি আড়াল থেকে তাগাদা দিলো - "Dialogue বোলো" . আচ্ছা মুশকিল - আমার ডায়ালগ তো হয়ে গেছে ? কার ডায়ালগ বলবো ? ঐদিকে এইবার জনতা উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। মাঝ দৃশ্যে নাটক আটকে গেছে। তাদের ধৈর্যের সীমার হারিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ ঠাস করে গালে সজোরে কি একটা লাগলো। নিচে তাকিয়ে দেখি একখান খাস্তা কচুরি। খাস্তা কচুরি খুব ভালো জিনিস যতক্ষণ না আপনার নাটকের দর্শক সেটাকে অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করছে । আক্রমণ টা শুধু খাস্তা কচুরিতেই  আটকে থাকে নি। সিঙ্গারা, আলুর চপ, রস টেপা রসগোল্লা - হাতের কাছে যা পাওয়া গেছে জনতা তার সদ্ব্যবহার করেছে। আর এই হিংস্র জনতার ভিড়েই চোখে পড়লো দীপন দা। সিঙ্গারার ঝুড়ি কোলে নিয়ে বসে আছে ।  নিজে তো খাচ্ছেই আবার দর্শকদের অস্ত্র হিসাবে সাপ্লাই করছে। Association এ র ফুড কমিটিতে feedback দিতে হবে । নাটক চলাকালীন যেন খাবার বিতরণ না করা হয় । আমরা হিংস্রতা আর বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে ।

গোলমাল যখন একদম তুঙ্গে, হঠাৎ দেখি একটা Amazon এর গাড়ি ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসছে।আমি প্রচন্ড বিরক্ত হলাম। একে এতো গন্ডগোল এর মধ্যে কে Amazon ডেলিভারি অর্ডার করেছে ? কোনো আক্কেল জ্ঞান নেই। বলি এতদিন ধরে বাড়িতে থেকেও Amazon এ শপিং শেষ হয় নি ? নাটকের ময়দানেও ডেলিভারি চাই ? কি ডেলিভারি চাই ? চেয়ার, শতরঞ্চি, ছাতা ? আর Amazon ও পারে বটে। লোকের বাড়িতে আর অফিস এ ডেলিভারি দিয়ে কুল পাচ্ছে না। এখন চলে এসেছে আমার দৃশ্যের মাঝে ডেলিভারি করতে। ভাবতে ভাবতে দেখি van থেকে নীল vest পরে Amazon এর ড্রাইভার নেবে এলো। কিন্তু তার হাথে কোনো প্যাকেজ নেই। সে সোজা স্টেজের দিকেই আসছে। এ ? এই লোকটা আমাদের নাটক দেখবে ? দীপনদার ওপর খুব রাগ হচ্ছে।  একটা international audience এর সামনে অভিনয় করার সুযোগ তা হাতছাড়া হয়ে গেলো। কিন্তু Amazon এর চালক দর্শক এর জায়গায় না থেমে সোজা স্টেজ এ উঠে এলো। "Who is Ritwik?" সে জিগেশ করলো। আমাদের নাটকের দলের সদস্যরা নিরদিদিধায় আমার দিকে দেখিয়ে দিলো। আমাদের দলের নাম তা বিভীষণ ড্রামা কোম্পানি করে দেওয়া উচিত। আমি তো ভয়ে পাথর। আমার কি দোষ দীপন দা পলাতক  ? আমার ডায়ালগ তো আমি ঠিকই বলেছি। এর জন্য স্টেজে ওঠে পিটানোর কোনো প্রয়োজন নেই। লোকটা আমার সামনে এসে দাঁড়ালো আর স্পষ্ট বাংলায় বললো "আপনি গত সপ্তাহে Amazon থেকে কিছু order করেননি। Headoffice থেকে আমাকে পাঠিয়েছে চেক করতে আপনি ঠিক আছেন কিনা ?" এতক্ষনে আমি ক্ষিপ্ত জনতার উন্মাদনার কথা ভুলে গেছি। আমি গত সপ্তাহে Amazon থেকে কিছু অর্ডার করি নি ? সেটা কি করে সম্ভব ? আমার কি শরীর খারাপ ? নাটক নিয়ে কি বেশি stress হয়ে গেলো ? আমার মাথা ঘুরপাক খেতে শুরু করলো। সবকিছু কিরাম ঝাপসা হয়ে গেলো ? চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেলো।।

ঘুম ভাঙলো অ্যালার্ম এর আওয়াজে । জামা ভিজে গেছে ঘামে। কি সাংঘাতিক দুঃস্বপ্ন। ফোন তা চার্জার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে Amazon এর app তা খুললাম। ঝড়ের গতিতে একটা পরচুলা অর্ডার করে ফেললাম । আজ বিকেলের মধ্যেই ডেলিভারি।  পছন্দ না হলে free return . স্বস্তির নিশ্বাস নিলাম। ঠোঁটের কোন এক তৃপ্তির হাসি। যাই উঠি - রিহার্সাল এ যেতে হবে।