শনিবার, ১৬ জুলাই, ২০২২

শ্রী চরণে কমলেষু

 "খোকা, ও খোকা - যা পোস্ট অফিস থেকে ১০ তা পোস্টকার্ড নিয়ে আয়ে। ওং  বিজয়ের প্রণাম জানাবি।"  মা খোকাকে বললো।  খোকার বাবা তখনকার দিনে P & T (পোস্টাল এন্ড টেলিগ্রাম) ডিপার্টমেন্ট এ কর্মরত ছিলেন।  আর ওদের পোস্ট অফিস কম্পউন্ডে একটা  কোয়ার্টার এ বসবাস ছিল।  দেশের মামার বাড়িতে দূর্গা পুজো তে  প্রতিবছর খোকারা সবাই যেত ।  দশমীর পরের দিন একাদশীতে  খোকার বাবাকে  কর্মরত জায়গায় ফিরতে হতো।  সেইজন্যে পরের দিন কোয়ার্টার এ আসার  পরেই পোস্ট কার্ড আনিয়ে  ওং বিজয়ার  গুরুজনদের প্রণাম জানানো অতি অবশ্যই করতে হতো।

খোকা পাঁচ ভাইবোনদের মধ্যে বড়ো  সন্তান। ও তখন ক্লাস ৫ (V ) এ পরে। সেই জন্য ওর মা ওকে দিয়েই ওং  বিযয়ার প্রণাম পত্র লেখাতে চায়। এটা  ছিল খোকার চিঠি লেখার প্রথম বছর। পরের বছর থেকে এটাই প্রতি বছর করতে হতো। 

খোকার মা তখনকার দিনে কোনো স্কুল এ যায় নি।   জমিদার বংশে জন্ম হবার জন্য কোনো স্কুল এ ভর্তি  করা হয় নি। কিন্তু বাংলা ভাষায় র জ্ঞান বেশ ভালোই ছিল । মা খোকাকে বললো।  আর খোকা লিখে গেলো। "লেখো -   শ্রী চরণে কমলেষু , জ্যাঠা মশাই ও জেঠি মা, আপনারা আমাদের ওং  বিজয়ের ভক্তি পূর্ণ প্রণাম গ্রহণ করবেন।  দাদা ও দিদিদের  ভক্তিপূর্ণ প্রণাম জানাবেন। আমরা ভালো আছি। এবার মল্লিকপুরে ভালো ভাবে দূর্গা পুজা হলো। এবারে দ্বিতীয় প্যারাগ্রাফ এ যা - " আশা করি আপনারা ভালো আছেন।  শরীরের প্রতি যত্নবান হবেন।  এখানে আপনারা এলে আমরা খুশি হবো।  বাবা ও মা ভালো আছেন। আপনার কথা মতো আমরা ভালো ভাবে পড়াশোনা করছি।  ইতি বিনীত খোকন।"

এই ভাবে মা খোকাকে দিয়ে একাধারে খোকার কাকা কাকিমা মাসিমা মেসোমশাই ও অন্যানদের বিজয়ের প্রণাম জানাতো। 

খোকার মনে খুব আনন্দ হতো।  চিঠি লেখা ও এরই মাধ্যমে ওনাদের কাছে-আসা অনুভব করতো  . তারই মধ্যে এক আত্মিক টান থাকতো। সে মনে মনে এক অদ্ভুত শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ভালোবাসার আনন্দে বিভোর থাকতো। খোকা ভাবতো ওর গুরুজনরাও তার মতন ওর চিঠি পেয়ে আনন্দ পেতো। এই বিভিন্ন চিন্তা ধারা ওর মনে খেলা করতো। যখন সেই গুরুজন রা  উত্তরে আশীর্বাদস্বরূপ চিঠি পাঠাতো, তখন খোকার মা বলতেন - "নে  পড়ে শোনা"  . খোকা পড়তে পড়তে অনুভব করতো তার গুরুজন রা যেন তার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ জানাচ্ছে চিঠির মাধ্যমে  । সেই অনুভবসকল ছিল ঐশ্বরীয় - যা অনুভব করা যায়, কিন্তু ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। এটা  মনের ও আত্মার উপলব্ধি- যার ভাষা নেই।

এখন সেই খোকা ৭৩ বছরের বৃদ্ধ - তার সব  গুরুজনেরা  তাকে ছেড়ে চিরতরের জন্য চলে গেছেন । তারা আর কখনো ফিরবে না। কিন্তু এখন যেন সেই বৃদ্ধ খোকা প্রতি দশমীর দিন তার মায়ের কথা শুনতে পায় - "খোকা, যা পোস্ট অফিস থেকে ১০ তা পোস্টকার্ড নিয়ে আয়। লেখ,  শ্রী চরণে কমলেষু "

- শান্তি কুমার ব্যানার্জী 

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন