বুধবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২২

মুনা আলি

 মামার বাড়ি আমার পুরুলিয়া জেলার ছোট্ট একটি গ্রামে।  গ্রামটির নাম নাকি ছিল রুক্কিনি। কখন সেটা যুক্তাক্ষরের জটিলতা কাটিয়ে রুকনি হয়ে গেছিলো মা সেটা ঠিক বলতে পারেনা।  স্টেশন এ এখন 'রুকনি' লেখা থাকে। 

বিয়ের পর মা রুকনি থেকে ভাগলপুর আসে।  ভাগলপুর, বিহারের  এক বেশ নামকরা শহর বললে ভুল হবে না।  অনেক নামি দামি স্কুল, নামকরা কলেজ, বড়  দোকান-বাজার সব আছে। আমার ঠাকুরদা ভাগলপুরে কর্মরত ছিলেন।  তাই, মায়ের শশুর বাড়ি হলো ভাগলপুর। 

মা মাঝে মাঝেই বলে থাকে যে আমার ছোটকাকা মাকে ইয়ার্কি করে বলত, "বৌদি, তোমার গ্রামের নাম তো India র map ও নেই। ". ইয়ার্কি হলেও, মা মনে হয় একটু দুঃখ পেতো ।  মায়ের নিজের জায়গা ওটা - মায়ের গ্রাম।

আমার মনে আছে, ছোটবেলায় আমরা খুব একটা মামার বাড়ি যেতে চাইতাম না। আমাদের কোনো সাথী ছিল না মামার বাড়িতে।  মা সবার বড় ।  আর মামা মাসিদের তখনো কারো বিয়ে  হয় নি। এদিকে ঠাকুরদার এখানে পিসতুতু  দাদা-বোনেরা মিলে  বেশ এক জব্বর আসর।  ছোটবেলায় যখন আমরা দিল্লি থেকে রাজধানীতে আসতাম ,আসানসোলে বা ধানবাদ এ নামতাম মনে হয় । তারপর ওখান থেকে ট্রেন বদল। বদল ট্রেনটি ছিল 'কয়লার গাড়ি' নামে পরিচিত। কয়লার গাড়ি কেন ঠিক জানি না। ট্রেন এ অনেক বস্তা বস্তা কয়লা উঠতো আর ট্রেন টা  চলতো steam engine এ।   ওই কয়লার গাড়িতে করে যখন রুকনি নামতাম তখন আমাদের কয়লার গোফ হয়ে যেত।  মাথা ভর্তি কয়লার গুঁড়ো থাকতো। 

এবার আসি মজার জায়গায়- যেটা আমার সবচেয়ে প্রিয়। যেই স্টেশন এ নামতাম, স্টেশন এ চায়ের দোকানের লোক টা দৌড়ে এসে মা বাবাকে প্রণাম করতো। আর আমাদের ঝপ করে কোলে নিয়ে নিতো। দুই বোন কোনো এক মামার কোলে। স্টেশন এ suitcase গুলো রেখে আমরা এবার হাটা  শুরু করতাম, দাদুর বাড়ির দিকে।  স্টেশন আর গ্রামের বসতির মধ্যে ধানের খেত।  খেতের আল দিয়ে হাটতে আমার আর বোনের কি মজা। মা কতবার পেছন থেকে ডাক দিতো "পড়ে যাবি , আস্তে যা" কিন্তু কে কার কথা শোনে।  বাবা অবশ্য আমাদের কিছু বলতো না। মাকে বলতো, "পড়ে  গেলে লাগবে, তখন নিজেরাই বুঝবে।"

যখন আল দিয়ে হেটে হেটে যেতাম, গ্রামের অনেক লোকের সাথে রাস্তায় দেখা হতো।  খেতে কাজ করা চাষীরাও আমাদের অবাক হয়ে দেখতো।  অচেনা শহুরে দুটো বাচ্চা ।  যেই মাকে দেখতো, বলতো "মুনা আলি। " সবাই এক কথা বলতো।  ঠিক মনে হতো গোটা গ্রাম যেন মুনার অপেক্ষায় ছিল। গ্রামতুতো মামারা আমাদের দেখে  বলতো , "ও ভাগ্নি বটে যে". দিদা-দাদুরা বলতো "মুনার বিটিগুলো বটে না ?" আমি মায়ের মতন দেখতে।  তাই আমায় বলতো "এককিবারে মুনার পানা মুখ ". বাবাকে বলতো "জামাই এলে ? এখন থাইকছ তো ?" বাবা গোটা গ্রামের জামাই ছিল। 'মুনা আলি' কথাটা আমার ছোট্ট মনে গভীর ভালোবাসার এক দাগ কাটতো। 

স্টেশন থেকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছতে কত নেমতন্ন চলে আসতো।  স্টেশন এ যে suitcase রেখে আসা যাই সেটা একমাত্র আমার মামারবাড়িতে সম্ভব ছিল।  আমরা বাড়ি পৌঁছোবার  আগে দিদা দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতো। কোনো সাইকেল সওয়ারী ততক্ষনে 'মুনার মাকে ' মুনা র আসার খবর দিয়ে দিয়েছে।  আমাদের দেখেই দিদা 'দিদিভাই' বলে ছুটে আসতো। মামারবাড়িতে তখন আমরাই সবচেয়ে ছোট , তাই রাজকন্যের খাতির পেতাম বললে ভুল হবে না।  গ্রামের ভেতরে পাকা রাস্তা ছিল না।  বৃষ্টিতে কাদা রাস্তায় জুতোগুলো কাদায় পুরো স্নান করে যেত।  সেই জুতো নিয়ে বাড়ি পৌঁছেই সারা উঠোন কাদা কাদা করতাম।  

'বৌ' , বাউরি পাড়ার নতুন বউ, মামারবাড়িতে কাজ করতো।  সবাই তাকে 'বৌ' বলতো , আমিও 'বৌ' বলতাম। এখনো তাই বলি।  অনেকদিন পর জানলাম ওর নাম 'বৌ' না . ও গ্রামে বৌ হয়ে এসেছিলো বলে সবাই ওকে 'বৌ' ডাকে। উঠোন কাদা করে যখন মায়ের কাছে বোকা খেতাম, তখন  বৌ বলতো - 'কি হবেক তো, আমি কইরে দিবো সাফ। ' মামারবাড়িতে বোকা ঝকা চলে না সেটা আমরা অনেক আগেই টের পেয়ে গেছিলাম। স্টেশন এ রাখা Suitcase গুলো ইতিমধ্যে কিছু গ্রামতুতো মামারা ঠিক পৌঁছে দিতো। এই রকমেই হতো আমাদের মামারবাড়িতে আগমন। 

 তারপর, কিছুদিনের মধ্যেই আসে পাশে আমাদের বন্ধু হয়ে যেত।  সবচেয়ে মজার ছিল সবাই আমাদের মামা বা মাসি ছিল।  দিদি -দাদা বয়সী ছেলে মেয়েরাও নাকি আমাদের মামা মাসি।  দাদু গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে পড়তেন।  তাই, আমাদের গ্রাম ভর্তি খুদে খুদে মামা -মাসি।  

বন্ধু হবার সাথে সাথে শুরু হতো আরেক মজা, মানভূমের ভাষার খেলা। একবার এক খুদে মাসি আমাদের বলে গেলো  - ' দুপুর দুটা নাগাদ গ্রিল টো দিয়ে টুকুর টুকুর ভালবি। ' আমি আর বোন দিল্লিবাসী কিছুতেই 'টুকুর টুকুর ভালবি ' মানে বুঝতে পারছি না. অনেক ভেবে চিনতে শেষে দিদাকে গেলাম জিজ্ঞেস করতে।  দিদা তো হেঁসে কুল পায় না।  'ভালবি ' মানে যে 'দেখবি' এটা আমাদের বোঝা কিছুতেই সম্ভব ছিল না।  আরেকদিন, বোন গাছ থেকে পরে যাওয়াতে আমাদের এক খেলার সাথী মামা, মা কে নালিশ করে বললো 'রিপাটোর বড় বেরাম' 'বেরাম' কথাটা কখনো শুনিনি।  'বেরাম' মানে নাকি বেড়ে পাকামো।  এইরকম অনেক শব্দ আমরা শিখতাম - মানভূমের ভাষা।  ওই ভাষাতে একটা অদ্ভুত আন্তরিকতা, ভালোবাসার ছোঁয়া অনুভব করতাম।  আজও  করি। হয়তো মামামারবাড়ি ভাষা বলে মনে হয়। নতুন শেখা কথাগুলো বেশিরভাগটাই শহুরে হাওয়াই আবার ভুলে যেতাম।  এই শেখা-ভোলার মাঝে প্রতি বছর গরমের ছুটি আসতো।  আর, প্রতি গরমের ছুটিতে মামারবাড়ির গ্রাম মায়ের জন্যে অপেক্ষা করে থাকতো।  স্টেশন এ মা নামতেই সবাই খুশি হয়ে বলে উঠতো 'মুনা আলি'