মঙ্গলবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১

ইচ্ছেডানা

 

২০২০ র একটি বিকেল
অরুনিমা TV তে 'Bewitched' TV series টা দেখছিলো। এই pandemic এর সময় TV series  দেখার একটা নতুন নেশা হয়েছে তার। 'Bewitched' টা ওর ভীষণ প্রিয় একটা series. চারিদিকে এতো মন ভারী করা news এ, এরম মন হালকা করা series দেখতে বেশ ভালো লাগে। 

যারা 'Bewitched' series তার কথা জানেন না, তাদের কে বলি, 'Bewitched' ষাটের দশকের একটি American sitcom. গল্পের মুলে একটি witch, মানে বাংলায় ডাইনি। একটি ডাইনি একজন সাধারণ মানুষ কে বিয়ে করে সাধারণ গৃহবধূ হয়ে থাকার কাহিনী 'Bewitched'. এই গল্পে সেই সুন্দরী ডাইনির মায়ের ও একটি সুন্দর ভূমিকা আছে।  উনিও ডাইনি, কিন্তু ভীষণ গর্বিত এক ডাইনি যে সাধারণ মানুষকে বেশ নিচু চোখে দেখেন । উনি ষাটের দশকের সাধারণ দৈনন্দিন ঐতিহ্য গুলো কে বেশ কটাক্ষই করেন। ডাইনি আর সাধারণ মানুষের জগতের বেশ মজার কিছু গল্প নিয়ে তৈরী এই sitcom টি.

৯০ এর দশকের এই sitcom ভারতের TV তে দেখানো শুরু হলো। অরুণিমার তখন class ৯। সেই কত বছর আগের  series এখন Netflix এর দয়ায় আবার দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। 

Magic ব্যাপার ta অরুনিমার বেশ পছন্দের।  Bewitched টা তাই খুব শিগগিরই প্রিয় হয়ে উঠেছিল তার। Class ৯, সামনে board exam, অরুনিমার মাঝে মাঝেই তখন witch  হবার ইচ্ছে হতো। কি সুন্দর (ঝাড়ু নিয়ে) এদিক ওদিক যাওয়া যায়, আর সবথেকে সুবিধা, -পরীক্ষায় না পড়েই নম্বর পাওয়া।  তখন তার সবসময় মনে হতো, “ইস, যদি একটি ঝাড়ুতে সওয়ার হয়ে witch হতে পারতাম রে। 

ভাবতে ভাবতে অরুণিমার ১৯৯৮ র এক দুপুরের কথা মনে পড়ে গেলো  - অরুনিমা school  থেকে এসে ভাত খেতে বসে, মাকে বলেই ফেললো তার witch, মানে ডাইনি  হওয়ার ইচ্ছে। মেয়ের ডাইনি হওয়ার ইচ্ছে শুনে, পারুল তো অবাক। তবে ডাইনি হয়ে না পড়ে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যাপারটা বেশ মজার লাগলো তার। হঠাৎ এই ডাইনির প্রসঙ্গ ওঠায় পারুলের তার ছোটবেলার  একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো। পারুল  সেদিন অরুনিমাকে একটি সত্যিকারের ডাইনির গল্প শোনালো। 

৫০ দশকের মালদার এক গ্রামের গল্প। পারুল মালদার এক ছোট্ট গ্রামে বড় হয়ে উঠেছে। তখন পারুলের বয়স পাঁচ কি ছয়। একদিন পারুল তার মায়ের সাথে কলতলায় জল আনতে গিয়ে এক অচেনা মহিলা কে দেখতে পায়। এই মহিলাকে সে আগে কোনোদিন দেখেনি। মহিলাকে দেখে পারুলের একটু অন্যরকম লেগেছিলো।  একটু বললে ভুল হবে, বেশ অনেক খানি।  সেই মহিলা পারুলের গ্রামের আর অন্য জেঠিমা কাকিমা দের মতন করে শাড়ি পরে নি। তার সাজটাও অন্যরকম ছিল।  সেটাই পারুলের সবার আগে চোখে পড়েছিল। পারুলের তার শাড়িটা বেশ ভালো লেগেছিলো।  কি সুন্দর ছবিতে দেখা জাপানি হাত পাখার মতন সামনে ভাঁজ-ভাঁজ করা।  মাথায় ঘোমটা ছিল না বলে মুখখানা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিলো। কপালে সিঁদুরের টিপের জায়গায় ঘন কালো চুল কপালে পড়ছিলো আর চুলের ফাঁকে এক চিলতে সিঁদুর উঁকি মারছিলো। গ্রামের  অন্য কাকিমাদের ও ঘোমটা ছাড়া কখনো দেখেনি। তাই এই মহিলাকে তার সত্যি একেবারে অন্যরকম লেগেছিলো। 

মহিলা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল  আর পারুলের মা জল ভরছিল । পারুল সেই মহিলার দিকেই তাকিয়ে ছিল। সে খেয়াল করেছিল যে তার মা সে মহিলার সাথে কোনো কথা বলে নি। এমনিতে কিন্তু মা কল তলায় দাঁড়িয়ে অন্যদের সাথে বেশ কথা বলে। কিন্তু সেদিন কেন বললো না, পারুলের ছোট্ট মাথায় সে কথা  সেদিন ঢোকে নি। কিছুক্ষন পর মহিলা পারুল কে ওর নাম ও class জিজ্ঞেস  করেছিল। পারুল মায়ের দিকে তাকিয়ে চুপ করে ছিল। সেদিন সে ওই মহিলা কে তার নাম ও বলেনি ও কোন class  এ পড়ে তাও বলে নি। কি করেই বা বলবে ? পারুল তো তখন school  এ যাওয়া শুরুই করে নি। আর এর আগে গ্রামে ওকে স্কুল এ যাওয়ার কথা কেউ জিজ্ঞেস করে নি। ওর বাকি বন্ধুরাও কেউ school এ যেত না।  রান্না বাটি খেলেই বেশ দিন কাটছিলো তাদের।  মা বাবাও কোনোদিন বলেনি school  এ যেতে। কিন্তু আজ যখন এই মহিলার প্রশ্নের উত্তর তার জানা ছিল না, তখন তার মনে হলো school এ যাবার কথা। পারুলের মনে হলো school হয়তো গেলে ও সেই নতুন কাকিমার সাথে কথা বলতে পারবে। 

সেদিন সন্ধে বেলা বাবা বাড়ি ফিরতেই পারুল school  এ যাবার বায়না ধরে বসলো। পরদিনই সে গ্রামের school এ ভর্তি হলো। school  এ খুব বেশি মেয়ে ছিল না, তাই পারুলের মেয়ে বন্ধু বলতে সেই দু'একজন। School এ ভর্তি হবার পরের দিনই সন্ধে বেলা আবার মায়ের সাথে কল তলায় গেলো।  অপেক্ষায় ছিল কখন সেই নতুন মহিলার সাথে দেখা হবে। এবার দেখা হলেই সে বলতে পারবে তার কোন class । সেদিন মহিলা আর এলো না। তারপর দুদিন চলে গেলো, কিন্তু সেই মহিলার সাথে পারুলের আর দেখা হলো না। 

সপ্তাহ খানেক বাদে পারুল মাকে সেই মহিলার কথা জিজ্ঞেস করলো।  মা তো প্রথমটায় বুঝতেই পারে নি।  যখন বুঝতে পারলো, মায়ের মুখ টা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছিলো।  মা পারুলের গায়ে কপালে হাত দিয়ে দেখলো জ্বর আছে কিনা, তারপর দুদিন school এও যেতে  দিলো না। বাড়িতে ওঝাও আনা হয়েছিল। পারুলের মা র  ভীষণ দুশ্চিন্তা ছিল যে পারুল ওই মহিলার কথা মনে রাখছে। মা সেদিন পারুল কে বলেছিলো, "পারুল, ওই মহিলার কথা মুখেও আনবি না।  ও এক ডাইনি। " পারুল ডাইনি মানে সেদিন বুঝতে পারেনি। কিন্তু এইটুকু বুঝতে পেরেছিলো যে সেই মহিলার কথা জানতে চাইলে পারুলের school এ যাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই তারপর থেকে সে আর  কোনোদিন সেই মহিলার কথা জিজ্ঞেস করে নি। তারপর অবশ্য পারুল আর কোনোদিন সেই মহিলাকে গ্রামে  দেখতেও পায়নি। 

কিছু বছর পর পারুল যখন স্কুল শেষ করে college যাবে তখন পারুলের জন্য পাত্র দেখা শুরু হয়ে গেছে। পারুলের সেই সময় বিয়ে করার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু ওর অন্য বন্ধুদের সবার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।  তার মানে ওর ও বিয়ের সময় হয়ে গেছে ।   তাছাড়া, কোনো মেয়ের যে বিয়ের ইচ্ছে নাও থাকতে পারে, সেই সময় পারুলের সেটা জানাই ছিল না। ও এমন কোনো মহিলাকে চিনতো না যে বিয়ে করে নি। তাই বিয়ে না করার ইচ্ছে টা সে কিশোর মনের অদ্ভুত এক খামখেয়ালি অনুভূতি ভেবে কোনোদিন কাউকে প্রকাশ ও করে নি। 

পারুলের মায়ের অবশ্য পারুলকে কলেজে পড়াবার কোনো ইচ্ছে ছিল না।  বাবা বলেছিলো যতদিন পাত্র না পাওয়া যায় , ততদিন পড়ুক।  তারপর পাত্র ঠিক হলে নাহয় ছেড়ে দেবে।  এই সুযোগে পারুল শহরে ওর কাকার বাড়িতে বিয়ের আগে ক'টা দিন কাটিয়ে আসতে পারবে। এই প্রস্তাবে মা রাজি হয়েছিল। পারুলের College  এ এডমিশন এর কথা চলছে। এমন সময় একদিন সে আবার ওই মহিলার কথা ওর মনে পড়লো।  মাকে সাহস করে জিজ্ঞেস করলো। পারুল বড় হয়েছে, এখন ওর বিয়ে হবে তাই মা তাকে সব খুলে বললো।    মায়ের  কথা গুলো পারুলের আজও মনে আছে। মা বলেছিলো সেই মহিলা ছিল গ্রামের ওপর এক কালো ছায়া - এক ডাইনি। সে বাড়িতে বৌ হয়ে আসার পর তার শ্বশুর শাশুড়ি দুজনেই এক বছরের মধ্যে মারা যায়। সে তার একমাত্র ননদ কে শশুর বাড়ির অমতে শহরে পড়তে যেতে সাহায্য করে।  সে নিজে গ্রামের গুরুজন দের আজ্ঞা অমান্য করে শহরে কলেজ এ পড়তে যাওয়া শুরু করে।  সে গ্রামের কোনো  নিয়ম মানতে চাইতো না।  মন্দিরের অন্দর-কক্ষে মেয়েদের যাওয়া মানা ছিল।  সেই মহিলা ওখানেও চলে গিয়েছিলো। এরকমও নাকি শোনা গেছিলো যে ওই  মহিলা কারো বাড়ি গেলে নাকি সেই বাড়িতে জ্বর-জ্বালা শুরু হতো। এতো সব শোনার পর গ্রামের গুরুজনরা তাকে গ্রাম ছাড়া করেছিল।  এত কিছুর হওয়ার পরেও, তার স্বামী কিন্তু তাকে ছাড়েনি। বৌয়ের সাথে সেও গ্রাম ছেড়ে চলে গেছিলো। তারপর তাদের খবর আর কেউ জানে না। মায়ের কাছে এইসব শোনার পর পারুলের মনে অনেক প্রশ্ন এসেছিলো, কিন্তু তার মনে হয়নি যে সে ওর  উত্তর গুলো  মায়ের কাছে পাবে। তাই আর কোনো প্রশ্ন করে নি। 

মাসখানেক পর পারুল কলেজে পড়া শুরু করলো।  তখন তার বিয়ে প্রায় ঠিক হয়ে গেছে। যতদিন বিয়ে না হয়, ততদিন কলেজে ক্লাস করবে এই ঠিক হলো। বিয়ের পর কলেজে যাবে কিনা সেটা শ্বশুর বাড়ির ইচ্ছের ওপর। কলেজ টা শেষ নাও হতে পারে, 

এটা ভেবে পারুল এর মনটা একটু খারাপ হয়েছিল, কিন্তু সেটাই তো ও হয়ে আসতে দেখছে। তাই কোনো প্রশ্ন বা প্রতিবাদ না করে, খুব খুশি হয়ে কাকার বাড়ি চলে গেলো। 

প্রথম দিন কলেজ যাবার সময় একটা অন্যরকম খুশি পারুল অনুভব করলো। তার অনেক দিনের কলেজ যাবার ইচ্ছা পুরো হওয়ার খুশি । কলেজ পৌঁছে দেখলো আবার সেই এক - ছাত্রীর সংখ্যা বেশ কম।  পারুল অবশ্য এটাতে অভ্যস্ত। এক এক করে ক্লাস চললো, শেষে ভূগোল। ভূগোলের professor ঢুকতেই সবাই বেশ চুপ করে গেলো।  পারুল মাথা ফেরাতেই দেখলো যে ইনি  অধ্যাপক নন - অধ্যাপিকা। এক মাথা চুলে এক চিলতে সিঁদুর পরা তাদের  ভূগোলের অধ্যাপিকা। পারুলের হঠাৎ সেই কলতলার মহিলার কথা মনে পড়ে গেলো। আজ আর সে কোনো প্রশ্ন মনে রেখে দিলো না। class শেষ হতেই ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস  করলো – ও জানতে পারলো তার মায়ের সেই ডাইনি, আজ পারুলের অধ্যাপিকা। 

গল্প শেষ হলো, অরুণিমার ভাত ও শেষ হলো।  পারুল অরুনিমা কে বললো "কি বুঝলি? নিজের ইচ্ছেটাই ডাইনির ঝাড়ু, বুঝলি? এইবার তুই তোর ঝাড়ু বানিয়ে ফেল আর witch  হয়ে ডানা মেলে আকাশে উড়ে বেড়া।" 

২০২০ র বিকেলে ফিরে এলো অরুনিমা। 
অরুনিমা আর সন্দীপের ৭ বছর হলো বিয়ে হয়েছে।  অরুনিমা পেশায় ডাক্তার।  বেশ নাম করা ডাক্তার বললে ভুল হবে না।  লোকে অরুনিমা কে  magician ই বলে। Magic টা তার সবসময় বেশ প্রিয় তাই  সেটা  সে ছাড়ে নি। ৭ বছর বিয়ে হয়ে গেলো এবার সবার একটাই প্রশ্ন - 'Good  news'  কবে। 

'Good news' টা অরুনিমার  অবশ্য  Good বলে মনে হয়না।  সত্যি বলতে, অরুনিমার মা হবার সেরকম ইচ্ছে  নেই । কিন্তু এরকম ইচ্ছা কি হওয়া উচিত ? অরুনিমাকে এটা  ভীষণ ভাবায়। তার মোটামোটি  সব বন্ধুরাই মা হয়ে সংসার করছে। সেটাই তো নাকি সংসারের নিয়ম।  তার মধ্যে আসে পাশে কাকিমাদের, মাসি পিসিদের প্রশ্ন বেড়েই চলেছে। সন্দীপের ও সেরকম ইচ্ছে নেই। তবে সন্দীপ কে বেশি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় না। Somehow এই প্রশ্ন গুলো অরুনিমাকেই face করতে হয়।  অরুনিমা তার এই ইচ্ছের কথা নিজের মাকে এক দুবার বলেওছে ।   কিন্তু পারুল সেটা অরুনিমার খামখেয়ালি মন ভেবে পাত্তা দেয় নি। 

গতবছর অরুনিমা accidentally pregnant হয়েছিল।  কিন্তু সেই news তা তার নিজের একটুও good বলে মনে হয় নি। বরং হঠাৎ মনে হয়েছিল সে যেন বেঁধে গেলো। অনেক স্বপ্ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এই সব ভেবে তার মোটেই মা হওয়ার ইচ্ছে হয় নি। তাই সে pregnancy তা নিয়ে এগোয় নি। মাকে এটা জানবার সাহস হয় নি।  Infact কেউ জানে না। অরুনিমা নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধুকেও  অনেক বার বলতে গিয়েও বলে নি। এটা বলাটা ভুল হবে যে অরুনিমা তার সেই decision তা নিয়ে পরে কখনো ভাবে নি, অনেকবার ভেবেছে , তবে তার কোনোদিন সেটা নিয়ে regret হয় নি।  একবার ও মনে হয় নি সে কোনো ভুল করেছে। 

তার ইচ্ছে হয় নি, তাই সে এগোয় নি। 

ঠিক যেমন সেই কলতলার মহিলার মন্দিরের অন্দর কক্ষে যেতে ইচ্ছে করেছিল, college যেতে ইচ্ছে করেছিল, অধ্যাপিকা হতে ইচ্ছে করেছিল ঠিক সেই রকম 'ইচ্ছে'। এই  সব ভাবতে ভাবতে অরুনিমার হঠাৎ মনে হলো সব যুগেই হয়তো ডাইনি জন্মায়। নিজের ইচ্ছে ঝাড়ুতে বেঁধে উড়ে বেড়ায়। এই যুগের ডাইনি হয়তো সে। যাক ছোটবেলার ডাইনি হবার স্বপ্ন টা তাহলে পূর্ণ হলো। এই ভেবে খুশি হয়ে ডানা মেলে Bewitched দেখতে লাগলো। 

রোগা হওয়ার সহজ উপায়


রোগা হওয়ার সহজ  উপায় 


এই লেখার শিরোনামটা প্রথম থেকেই বিতর্কে জড়িয়ে আছে। প্রথমে নাম দিয়েছিলাম "বাঙালির খাদ্য সংযম"। বাংলা সাহিত্যের তারকারা রা প্রবল প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বাঙালি, খাদ্য এবং সংযম এই তিন শব্দ একসাথে এক বাক্কে ব্যবহার করা যায় না। এটা ভুল ব্যাকরণ। মানে বাঙালি আর খাদ্য - এটা খুব ভালো যায় একসাথে। উদাহরণের প্রয়োজন নেই। বাঙালি আর সংযম  টাও বেশ যায় - especially শারীরিক শ্রমের সময়।  আর সংযম আর খাদ্য, এই দুটি আজকাল millennial  দের কাছে খুব জনপ্রিয় শব্দ জোর। কিন্তু বাংলা ভাষার ইতিহাসে আজ অবধি বাঙালি, খাদ্য ও সংযম - এই তিনটে শব্দ একসাথে ব্যবহার করে এমন আস্পর্ধা কারোর হয় নি। তাই বিতর্ক এড়াতে আমি লেখার নাম টা পাল্টে দিলাম । আশাকরি এতে বাংলার ভাষাবিদ ও খাদ্যরসিক সম্প্রদায় আমার ত্রূটি মার্জনা করবেন।

যাক, disclaimer দিয়ে মনটা হালকা লাগছে।  এবার ঢুকে পরি কাজের কথায়। বিষয় টা হলো স্বাস্থ কেন্দ্রিক। সার্বিক বাঙালি সম্প্রদায়ের সাস্থ কেন্দ্রিক। রোজকার অম্বল, সাপ্তাহিক পেট খারাপ আর বাৎসরিক high cholesterol - এগুলি আমাদের সাম্প্রদায়িক রোগ।  আমার মা বলেন - এগুলি রাজসিক রোগ। সমৃদ্ধির লক্ষন।  কিন্তু এতো সমৃদ্ধি কি আর মধ্যবিত্ত বাঙালির পেটে সয় ? তা চর্বিরূপে স্থাপন হয় পাকস্থলীর চার পাশে। এই জমা সমৃদ্ধি কিভাবে শরীরের গঠন কে প্রভাব করে, তা নিয়ে বেশি কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। Fat  shaming  খুব খারাপ ব্যাপার।

কিন্তু গর্বিত বাঙালি হিসাবে আমি এইটা মেনে নিতে পারি না। বাঙালির এই শারীরিক দুর্গতি আটকারাবর একটা উপায় বার করতেই হবে। না শরীর চর্চার কথা ভেবেও লাভ নেই।  বড় খাটনি। আমরা thought leader. শারীরিক শ্রম আমাদের সংবিধানে নেই। 

মূল উদ্দেশ্য - রোগা হওয়ার সহজ উপায়। যে যাই বলুক না কেন, রোগা হওয়ার সহজ উপায় এর উদাহরণ খুবই বিরল। মানে এই ধরুন অনেকেই আজকাল dieting করার চেষ্টা করছে।  খাদ্যের প্রকার ও পরিমান পাল্টে ফেলে স্বাস্থ্যের উন্নতি করার চেষ্টা। যেমন সকালে breakfast এ খালি ফলের রস, দুপুরে lunch এ এক বাটি ডাল, dinner  এ একটা শুকনো পাউরুটি আর রাতে শুতে যাবার আগে এক বিশেষ ভেষজ ওষুধের বড়ি । এই পথে চললে নাকি এক সপ্তাহের মধ্যেই আপনি John Abraham বা Bipasha Basu র সাথে পাল্লা দিতে পারবেন। বানিয়ে বলছি না -   আনন্দবাজারে আধ page জুড়ে এক প্রকান্ড বিজ্ঞাপন এ দেখলাম। মিথ্যে হতে পারে না। কিন্তু শুনতে যত সোজা মনে হয় আসলে তা নয়। মানে একবার ভাবুন - আপনি স্থির করেছেন যে নতুন বছরে গুচ্ছ ওজন আর কোমরের মাপ কমিয়ে এক্কেবারে শরীরের খোল নলচে বদলে ফেলবেন।  ভালো কথা।  সমস্যা শুরু হয় প্রথম রবিবার থেকে। রবিবারের সকালে বাঙালি সপরিবারে লুচি, কচুরি, আলুর দম, বোঁদে, জিলিপি ইত্যাদির সাহায্যে দিন শুরু করে।  এর মাঝে আপনি বেঁকে বসে বললেন খালি বেদানার রস খাবেন। এতে সমস্যা দুদিক থেকে।  লুচি ভাজার মাঝে বেদানার রস করতে বললে রাঁধুনির চোটে যাওয়া স্বাভাবিক। শুধু তাই না, পরিবারের সবাই আঙ্গুল চেটে কচুরি  আলুর দম খাচ্ছে আর তার মাঝে আপনি তৃপ্তির ভাব করে বেদানার রসে চুমুক দিচ্ছেন। দেখে গা জ্বলে যায়।  পারিবারিক অশান্তি শুরু হয় এখন থেকেই।  তাই তো বলছি যে এই সব dieting ফাইটিং খুব জটিল ব্যাপার। শারীরিক ও সামাজিক প্রভাব খুব গুরুতর।  

তাই সেই নিয়ে আলোচনা করা বৃথা।  আজ আমি রোগা হওয়ার কিছু সুবিধাজনক উপায় বাতলে দেব। যাতে পারিবারিক এবং মানসিক শান্তি বজায় থাকে। 

১. রূপ  - আপনি রোগা না মোটা সেটা গুরুতূপূর্ণ নয়।  গুরুত্ব হলো আপনাকে খাশা দেখাচ্ছে কিনা।  অনেক কসরৎ করে ছোটবেলার skinny jeans তা কোমরে আটিয়েছেন ।  আর তাতে আপনি একটা সাংঘাতিক জয় বোধও করতে পারেন।  কিন্তু  এতে লাভের লাভ কিছুই হয় না।  কোমরের চাপে হাসফাস, হাটতে চলতে অসুবিধা আর হঠাৎ করে বসতে গেলে দুর্ঘটনা।  এসবের প্রবল সম্ভাবনা।  রোগা দেখানোর জন্য নিজের শরীর কে এতো চাপ দেওয়া নিরর্থক। তার চেয়ে বেশ ঢোলা ঢালা আরামদায়ক পোশাকেই সুফল লাভ করবেন। কিন্তু প্রশ্ন তা হলো - এতে কি আপনি আদোও রোগা হলেন ? না, তা হবেন না।  কিন্তু হবার প্রয়োজন আছে কি ? দিব্বি তো ফতুয়া, বার্মুডা, পায়জামা, palazzo পরে নিশ্চিন্ত মেঘের মতন উড়ে বেড়াচ্ছেন। অসময়ে Wardrobe malfunction এর সম্ভাবনা নেই, সাজগোজের সময় কুস্তির প্রয়োজন নেই, মনে বেশ একটা ফুরফুরে আত্মবিশ্বাসের ভাব। কোমরের মাপ, ওজন, BMI এগুলো তখন খালি কিছু সংখ্যা। এক্কেবারে অপ্রাসঙ্গিক। চুলোয় যাক Skinny jeans । 

২. গুন্   - দম আটকে, পেট টাকে ভিতরে টেনে কিছুক্ষন রাখা যায়। ক্ষনিকের জন্য নিজেকে বেশ Ranbir Kapoor এর মতন লাগে।  এই সুযোগে দুটো ছবিও তুলে নিতে পারেন। কিন্তু যেই দম শেষ, সেই Ranbir ও শেষ। তাই উপায় তা sustainable নয়। অথচ social media তে  আপনার বাল্য বন্ধু দিব্বি supermodel সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। । আপনার মনে পরে যায় ক্লাস ৯ এ সে অংকে কোনমতে পাশ করেছিল।  তাও আপনার থেকে টুকে। অথচ আজ তার জনপ্রিয়তা আকাশ ছোঁয়া। ১০০ day  challenge, vegan challenge আরো কত সব জটিল hastag এর মধ্যে দিয়ে তার প্রায় শত সহস্র চ্যালা।  আপনাকে কেউ পোছে না।  ঘোর অবিচার। আমার সাথেও এরম হয়।  এখন তাই আমার role model গোপাল ভাঁড় । নাদুস নুদুস চেহারা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রধান উপদেষ্টা। ভাঁড় বাবুকে দরবারে বসে দম আটকে থাকতে হয় নি কখনো। বরং ওনার কৌশল নীতি শোনার জন্য স্বয়ং মহারাজ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে থাকতেন। সবার ফোকাস গোপালের মগজে - ভুঁড়ি তে নয়। তাই আর আয়নার সামনে  ভুঁড়ি ঢাকার চেষ্টা করবেন না। বত্রিশ পাটি বার করে  ১৭ র ঘরের নামতা টা  মনে মনে আউড়ে নেবেন।  শরীরের মেদ মগজাস্ত্রে পরিণত হবে ।  আপনি ১৭ র নামতা জানেন, রণবীর কাপুর জানে না।  রোগা  হবার আর কোনো প্রয়োজন নেই। 

৩. আচরণ  - ঠিক যখন হাত গুটিয়ে বিরিয়ানি তে কব্জি ডোবাতে যাবেন, অমনি পাশ থেকে কেউ বলে উঠবে - "একটু salad তা pass  করবেন ? আমি carb তা cut down করছি " ঘাস-পাতায় চান করেও এদের শান্তি নেই। এরপরেই শুরু হবে ভিন্ন প্রকারের ডায়েট এর গুনচর্চা। এখানেই শেষ নয়।  Exercise routine, gym membership এইসব ভয়ঙ্কর বিষয়ে আলোচনা চলতে থাকে। আপনি কোনায় বসে চুপচাপ বিরিয়ানি সাঁটাচ্ছেন আর মনে মনে প্রার্থনা করছেন কেউ যেন আপনার দিকে নজর না করে।  কিন্তু আপনার পোড়া কপাল।  আলু তে কামড় দিয়েছেন কি একজন জিগেশ করেই ফেললো - "হ্যা রে, তা তোর এবছরের health goals কি ?" কোনোমতে আলু টা গিলে, বিষম আটকে আপনি মৃদু স্বরে বললেন, "একটু হাটাহাটি করবো ভাবছি" - একটা অস্বস্তিকর স্তব্ধতা - তারপর গল্প গুজব আবার শুরু হয়ে যায়।  আপনার ওপর আর focus নেই। বন্ধুদের হতাশ করে বেশ লজ্জা লাগছে। এই জন্য আপনার আর আজকাল socialize করতে  ভালো লাগে না। বড্ডো pressure. কিন্তু এই চাপ টা আপনি না নিলেই পারেন। কেউ জিগেশ করলে বলে দেবেন - "এবছর আমি ভালো থাকবো ঠিক করেছি" । ভালো খেয়ে, ভালো ঘুমিয়ে, ভালো বই পরে, ভালো করে ঘুরে, নিজেকে ভালোবেসে থাকবো । না, এতে আপনি রোগা হবেন না।  কিন্তু সামাজিক চাপের মেদ গুলো দিব্বি ঝরে যাবে।  ১০০ মিটার স্প্রিন্ট হয়তো দিতে পারবেন না, কিন্তু আপনার মনের গতি অপ্রতিরোধ্য। আর রোগা হয়ে কি করবেন ?  

এতক্ষনে নিশ্চয় বুঝতে পেরে গেছেন যে রোগা হবার সহজ উপায় আমার জানা নেই।  তার তার প্রয়োজন ও নেই। এই অবান্তর ভাট লিখে আপনার সময় নষ্ট করলাম। তার জন্য আমি দুঃখিত।  শরীর যত্ন নেওয়া খুব ভালো ব্যাপার - কিন্তু তার জন্য মানসিক কষ্ট পাওয়া একদমই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। শরীরের দিকে নজর দিতে গিয়ে মনের বিকাশ কে অগ্রাহ্য করবে না।  ইচ্ছে মতন খান, ইচ্ছে মতন সাজুন, ইচ্ছে মতন ঘুরুন, ইচ্ছে মতন শরীর চর্চা করুন । ত্যাগ আর ভোগ একসাথেই চালিয়ে যান । 

- ঋত্বিক সেন 

শনিবার, ২৬ জুন, ২০২১

Fathers Day


"হ্যালো বাবা, Happy Father's Day".

"হ্যা, তোরা ভালো থাকিস, এই নে মায়ের সাথে কথা বল" 

হয়ে গেলো fathers day wish. ৩০ সেকেন্ড এর কম সময়। মাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আজ plan কি ?" জবাব এলো "Plan  আবার কি ? এই তো office বেরোবে সবাই" . "আজ কোনো celebration  নেই, আজ তো fathers  day ?" আমি প্রশ্ন করলাম। মা হেসে বললো "কোনদিন তোর বাবা এইসব celebrate করলো ? বেশি বললে আবার রেগে যায়।  বলে সব নাকি আদিখ্যেতা।  তাই আমি আর ঘাটাই না। " এটা আমারও অভিযোগ। যেকোনো celebration এ বাবার যেন allergy. এই যেমন ছোট বেলায় একবার আমিও অংকে ১০০ / ১০০ পেয়েছিলাম। একবারই পেয়েছিলাম।  কিন্তু সেটা বড়ো কথা নয় ।  নাচতে নাচতে বাড়ি এসে সবাই কে নিজের জ্ঞান জাহির করে বেড়াচ্ছি, মা এসে গালে চুমু খেয়ে গেলো, দাদু মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করলো, আর বাবা ? বাবা গম্ভীর ভাবে বললো - "ভালো হয়েছে, পরের বার আরো ভালো করতে হবে" আরো ভালো ? আমি তো full marks পেয়েছি। এর চেয়ে বেশি ভালো কিভাবে করবো ? যুক্তি টা উড়িয়ে দিয়ে বাবা বললো "যদি everest জয় করবি ভাবিস, তাহলে চাঁদের দিকে লক্ষ রাখতে হবে।  তবে না everest এর ধারে কাছে পৌঁছাতে পারবি। অকাট্ট যুক্তি - পরের বার আমি ১০০ তে ২০০ পাওয়ার চেষ্টা করবো। 

বাবার এই বেরসিকতা তা শুধু পড়াশোনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকলে তাও বুঝতাম।  কিন্তু না। আমার বয়স তখন ১৬।  ১৪ই February Valentines Day. মনে বেশ কচি প্রেম  প্রেম ভাব।  প্ল্যান করলাম  সেজে গুঁজে লাল জামা পরে icecream খেতে বেরোয়। বাবার কাছে ১০ টাকা চাইলাম - Ice cream এর জন্য ।  File এর ভিতর থেকে মুখ না তুলেই বাবা জানিয়ে দিলো যে সামনে year ending, ব্যবসার অবস্থা ভালো নয়।  তাই  ice cream খাওয়া আর খাওয়ানো ১st April অবধি ঠেকিয়ে রাখতে হবে। অতয়েব  আমার Valentine's day টা April fool হয়ে গেলো। সেই দুখঃ আমি আজও ভুলতে পারিনি।

কিন্তু এসব শুনে ভদ্রলোককে  কিপ্টে ভাববেন না।  নিজের ভাসায় বাবা অত্যন্ত হিসেবি . অথচ এই হিসেবি মানুষ বাজার গেলে এক একটা কেলেঙ্কারি ঘটে। সস্তায় ফুলকপি পেলে আনন্দ হয় এরম অনেক লোক আমাদের চেনা ।  কিন্তু সেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে দোকানির সব ফুলকপি কিনে আনে, পুরো ২১ কিলো, এরম মানুষের সন্ধান পাওয়া কঠিন । মায়ের প্রবল প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে বাবা হিসাব করে দেখিয়ে দিলো যে প্রতি কিলো ২ টাকা ছাড় পাওয়াতে তিনি ৪২ টাকা লাভ করেছেন। তাছাড়া দোকানি নিজে van রিকশা করে সব ফুলকপি বাড়ি দিয়ে গেছে।  মানে free  delivery. শতাব্দীর সেরা সওদা।  Breakfast এ ফুলকপির পরোটা, lunch এ ফুলকপির ঝোল, বিকেলে চায়ের সাথে ফুলকপির চপ, dinner এ ফুলকপির সূপ, আর বাড়িতে অতিথি এলে ফুলকপির রোস্ট। আগামী ২ মাসের menu announce করে দিলো বাবা।  এর মধ্যে রান্নার মাসি বাবাকে আরো উস্কে দিয়ে বললো - "বড়দা, একটা গরু বা ছাগল ভাড়া নিয়ে আসেন ।  অতগুলো ফুলকপির পাতা আর ডাটা ফেলতে হবে না ।" বাবা সম্মতি জানাবার আগেই মা বলে উঠলো "থাক - তার প্রয়োজন নেই, আমি পাতার সাগ বানিয়ে দেব" . বুঝলাম দুমাস ফুলকপির সাথে সাথে পাতার সাগ খেতে হবে।  অন্তত বাড়িটা গোয়াল ঘর হওয়া থেকে রক্ষা পেলো। 

ভাগ্যক্রমে বাবার আর একটা গুন্ আমাদের এই ফুলকপি বিভ্রাট থেকে রক্ষা করলো।  বাবার মতন  জনহিতৈষী মানুষের নজির মেলা ভার। ভূত ভোজন অরে ভূত ভ্রমণ না করলে বাবার রাতে ঘুম হয়ে না। তাই ফুলকপি রপ্তানির পরের দিন থেকেই দানছত্র শুরু হয়ে গেলো। পাড়ার ময়রা, গাড়ির driver, ফ্লাট এর দারোয়ান, office এর কেরানি, দুঃসম্পর্কের কুটুম এমনকি বাজারের পাওনাদার - কাউকেই খালি হাতে ফিরে যেতে হয় নি । আসলে, বিনামূল্যে ফুলকপির প্রাপক হবার জন্য বাবার সাথে হৃদ্যতার প্রয়োজন নেই। হাসি মুখে "স্যার ভালো আছেন ?" বললেই ফস করে এক জোড়া ফুলকপি হাথে চলে আসবে। যেন ভূতের রাজার বড় । 

এতো জন কল্যাণ করেও বাবার কোনো গর্ব নেই। ভদ্রলোক অত্যন্ত down to earth. Office হোক বা বিয়েবাড়ি - বাবার পরনে তার প্রিয় নীল শার্ট আর ছাই রঙের প্যান্ট সঙ্গে sreeleather এর জুতো। পছন্দের বাহন - দুই দশক পুরোনো জীর্ণ এক মোটরসাইকেল। ওহ আর ঝোলা ব্যাগ তার কথা ভুলে গেলে চলবে না।  মা অনেক চেষ্টা করেও ভাড়া fashion sense এর কোনো উন্নতি করতে পারেনি।  জামা মানেই তাকে হতে হতে হবে ডার্ক কালার আর পকেট ওয়ালা। কালো পছন্দ না। তাই বাবার আলমারি তে খালি নীল, সবুজ আর খয়েরি রঙের জামাই পাওয়া যায়।  আর এই fashion disaster তা বাড়ির বাকিদের ওপরেও ছলকে পড়তো। কেন আমি প্রতি পুজোয় গামছা design এর জামা পরে ঠাকুর দেখতে বেরোতাম এখন সেটা বোঝা গেলো ? Courtesy হাতিবাগান। কিন্তু এসব তুচ্ছ প্রসাধনী ব্যাপারে বাবার কোনো উৎসাহ নেই। বাবা "Plain Living High thinking" নীতি তে দৃঢ় বিশ্বাসী। Plain living এর উদাহরণ তো আমরা পেয়েই গেছি। কিন্তু এই high thinking ব্যাপারটাতেই যত গোলমাল । একবার সবাই মিলে গরমের ছুটিতে মাসির বাড়ি বেড়াতে গিয়েছি। ঘরে ঢুকেই মাস্তুতো বোন কে বাবা প্রশ্ন করে ফেললো - ১৩ ঘরের নামতা তা বল দেখি।  বাবার মতে মুখে মুখে অংক করা হলো মগজের exercise . High thinking এ first step. কিন্তু এই mental gymnastic আমার মাস্তুতো বোনের একটু পছন্দ নয়।  সে কটমট করে আমার দিকে চেয়ে রইলো। যেন আমি পরিকল্পনা করে ওকে বিপাকে ফেলেছি।  ভাগ্গিশ ঠিক সময় মা এসে সবাইকে বকাবকি করে চান করতে পাঠিয়ে দিলো। আর একটু দেরি হলেই বাবা  algebra য়  ঢুকে পড়তো।  তারপর আর গরমের ছুটি  salvage করা যেত না। 

শুধু অংকে আটকে থাকলে তও হতো - রেজাল্ট এর season এ আমার বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ হয়ে যেত ।  কারণ - লোকের সাথে দেখা হলেই বাবা invariably জিগেশ করতো তাদের ছেলেমেয়েদের রেজাল্ট কেমন হলো। especially অংক আর সাইন্স এ। তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই।  আপত্তি তা হলো তাদের নম্বর জানার পর বাবা খুব গর্ব করে আমার নম্বর গুলো প্রচার করে ফেলতো। সমস্যা হলো আমার নম্বর গুলো তো আর গর্ব করে বলার মতন ছিল না।  তাই সেগুলো যখন পাবলিক knowledge হয়ে যায় তখন আমার social distance করা ছাড়া আর উপায় থাকতো না। কিন্তু সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হলো বাবা আমার class টাও  গুলিয়ে ফেলতো। মানে, আমি ক্লাস ৯ এ পড়ি।  বাবা গিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিলো আমি ক্লাস ১০ এ পড়ি।  ভালো না ? এক ক্লাস বাড়িয়ে বলেছে।  এক বছর পর যখন আমার সত্যি ক্লাস ১০ হবে তখন লোকে ভাববে আমি ফেল করেছি ? ইটা বাবাকে কিছুতেই বোঝাতে পারতাম না।  যদি মনে না রাখতে পারো, কিছু বোলো না।  ভুল ভাল information দিয়ে আমাকে বিপদে ফেলার কি মানে ? কিন্তু কে আর আমার কথা শোনে।  একবার স্কুল এ বাবা গিয়েছিলো ক্লাস টিচার এর সাথে দেখা করতে।  টিচার জিগেশ করলো আপনার ছেলের নাম কি ? বাবা কিছুক্ষন ভেবে বললো "গাব্বু" - ওটা আমার ডাক নাম।  আর এখন বাবার কল্যানে South Point School এর faculty ডিপার্টমেন্ট এ একটা নতুন running joke শুরু হলো।  কি করে যে আমি এতো গুলো বছর ওই স্কুল এ কাটালাম আমিই জানি খালি।  

বাবার এইসব কাণ্ডে ছোটবেলায় খুব রাগ হতো।  অনেকবার মায়ের কাছে অভিযোগ করেছি। মা বলতো - মন খারাপ করিস না, বাবা এরকমই।  বোরো হলে বুঝবি।  ঠিকই বলতো মা -  এখন বুঝি বাবার এই principle গুলো তখন যতই বেমানান লাগতো, এখন ততটাই মানাতে পারি নিজের সাথে। বাবা শিখিয়েছে কঠোর পরিশ্রমের মূল্য, পরোপকারিতা , ভেদাভেদ হীন মনুষত্ব আর সবচেয়ে বড়ো - মানসিক উদারতা। বাবার চিন্তা ধারার সাথে আমি আমি হয়তো সবসময় একমত নোই - কিন্তু বাবার দেওয়া তালিম গুলো আমি অগ্রাহ্য করতে পারি না। Happy Fathers Day বাবা।  আমার প্রণাম নিও। Oh আমার বয়স এখন ৩৭ - কেউ জিগেশ করলে বাড়িয়ে বা কমিয়ে বলতে পারো - আমার একটুও খারাপ লাগবে না.    
























শনিবার, ১৩ মার্চ, ২০২১

কলকাতায় এক সকাল

 

গাঙ্গুলিবাবু সকাল থেকে খবরের কাগজের অপেক্ষায় বসে।  টা বাজতে চললো এখনো টাবলুটার পাত্তা নেই।  এতো বেলা করলে তো খবরটা বাঁশী হয়ে যায়।  কি আর হবে তখন খবর পড়ে। সকাল সকাল মেজাজটা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। 

বারান্দায় হালকা রোদ এসেছে, টবের গাছগুলো বেশ চনমন করছে।  শীতকালের ফুলের গাছগুলো কি রঙিন।  আজকাল আকাশের রঙটাও বেশ নীল নীল লাগে।সেটা মনে হয় কোরোনার এই দয়া। করোনা কিছু কিছু ভালো অবদান আছে।  গাঙ্গুলিবাবুর মনে পড়ে না কত বছর আগে নীল আকাশ দেখেছে।  নীল তো দূরের কথা, বারান্দা থেকে আকাশ দেখার সৌভাগ্য বা আজকাল কতজনের হয় এই কলকাতা শহরে। নেহাত ওনার  সামনে প্রাইমারি  স্কুল এর মাঠ তাই ভাগ্গি , নাহলে  কবে প্রোমোটারের হাতে চলে যেত।  

রান্নাঘর থেকে খুটখাট শব্দ এসেই চলেছে।  গিন্নি সারাদিন যে রান্নাঘরে কি করে, কে জানে। সেই তো Lunch এ ডাল , ভাত, পোস্ট আর মাছ  কিছু বললেও মুশকিল - ইদানীঙ মেজাজটা ও তুঙ্গে থাকে।  গাঙ্গুলী বাবুর মনে হয় সকালের চা তা একটু দুজনে মাইল বসে খাবে।  সে আর হয়না। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরেও গাঙ্গুলী বাবুর routine এ বিশেষ পরিবর্তন আসেনি।  উনি সাত সকালেই ঘুম থেকে উঠে Morning walk তা সেরে ফেলেন।  কলকাতার বাঙালিরা বেলা অব্দি ঘুমোতে ভালোবাসে, তাই গাঙ্গুলী বাবু নিরিবিলিতে সাত সকালে একটু বাইরের হাওয়া খেয়ে আসেন। সকালের বাজারের প্রথম খদ্দের দেড় মধ্যে গাঙ্গুলী বাবু ধরা বাঁধা।  বৈণির দর কষাকষির সুবিধে তও পেয়ে যান।  অবসর নেওয়ার পর সাধারণত তিনি সকাল থেকে তিন বার বাজার যেতেন। শেষ বার যখন বাজার উঠে যাওয়ার সময়, তখন বেশ দর দাম করা যেত। আনন্দবাজারে প্রকাশিত দিনের সবজির দামের চেক্যে যদি কমে ভালো জিনিস আন্তে পারতেন তাহলে বেশ খোশ মেজাজে থাকতেন।  নিজেকে ওনার বেশ সম্পন্ন বলে বলে মনে হতো। আজকাল তো করোনা র দোয়ায় বাজার খালি একবার যাওয়া।  কিন্তু সকালের বৈণি তা বেশ কাজের।  সেই কোনো না কোনো উপায় বেরিয়ে যাই আর মানুষ নিজের দৈনিন্দিন জীবন চালিয়ে যায়। 

বাজার থেকে ফিরে তো আজকাল ধোয়া ধুয়ি ও অনেক বেড়ে গেছে। বাড়ি ফিরেই গাঙ্গুলী বাবু আলু পেয়াঁজের সাথে নিজের স্নান টাও  সেরে ফেলেন। স্নান আর পুজো সেরে সকালের জলখাবার এর  সাথে খবরের কাগজ নিয়ে বসেন।  তা আর আজকে হলো কি টাবলু তা সব মাটি করে দিলো।  কতবার ওকে বলা হয়েছে খবরের কাগজ দিতে দেরি না করতে।  কিন্তু কে কার কথা শোনে। রোজ এই দেরি করে, তবে জলখাবারের আগে চলে আসে. আজকে তো তও হলো না।  যাগ্গে কাগজ টা আসলে না হয় আরো এক কাপ চা খাওয়া যাবে।  

আজকের জলখাবার তা মন্দ ছিল না - পরোটা আর আলুর তরকারি।  সঙ্গে মিষ্টি হলেই ভালো বলা যেত।  মিষ্টি ভাবতেই জানুলজি বাবুর পাড়ার ' গোপাল স্বীটস 'এর কথা মনে পড়লো। গত সপ্তাহে মিষ্টি নিতে গিয়ে দেখে দোকানটা বন্ধ।  পরের দিন ও এক।  পাশের ফুলওয়ালী জমি টা নাকি disputed ছিল। যাহঃ বাবা ,এতো কাল ধরে দোকানটা ছিল।  যকুরদাদার হাতে মিষ্টি খেলাম, বাবার হাতে খেলাম আর এই ছেলের হাথে এলো, আর এতদিনে  জানা গেলো জমি টা disputed. আজকাল কি যা হয় বলা যাই না. মিষ্টির দোকানটা খালি গাঙ্গুলী বাবুর পছন্দের দোকান ছিল না, পাড়ার সবার প্রিয় দোকান।  ওরম কাঁচাগোল্লা আর কোথাও খায়নি গাঙ্গুলী বাবু।  গাঙ্গুলী  বাবু র মেয়ের ও খুব পছন্দের দোকান ছিল।  গতকাল মেয়েকে অহনে জানালে তার তো খুব মন খারাপ।  এবার শীতের নলেন গুড় এর সন্দেশ খেতে সেই ২ মাইল হেঁটে 'সত্যনারায়ণ মিষ্টান্ন' যেতে হবে।  মিষ্টি তো ভালো ছিলই , তার ওপর আবার ডোনাকের নামটা গাঙ্গুলী বাবুর বাবার নাম এ ছিল তাই একটু বেশি যেন কাছের লাগতো।  কোথায় যে কিভাবে সম্পর্ক তৈরী হয়ে যাই বোঝা যাই না - তবে না মানুষের মন।  

যাইহোক এই সব ভাবতে ভাবতে হটাৎ গাঙ্গুলী বাবুর মনে হলো পাশের 'ইস্টার্ন স্বীটস' এর কিছু কারসাজি নেই তো এই দোকানটা বন্ধ করার জন্যে। কয়েক ম্যাশ আগেই ব্যাটারা দোকান নতুন দোকান খুলেছিলো। মিষ্টি যে এতো অখাদ্য বানানো যাই আর তারপর সেটা কলকাতার বাজারে বিক্রি করার আস্পর্ধা ও দেখানো যাই সেটা দেখে গাঙ্গুলী বাবুর বেশ অবাক এই হতেন।  বেশিদিন অবশ্য তাঁকে অবাক হতে হয়নি।  এক ম্যাশ পরেই সেই মিষ্টির দোকান বন্ধ হয়ে গেলো। পাশের মিষ্টির দোকানে line আর সে মাছি মারে - এতো কিছু সহ্য করেও সে গোটা তিরিশ দিন দোকান খোলা রেখেছিলো - দম আছে বলে হবে।  আজ বাজার থেকে ফেরার পথে তো দেখলো সে আবার দোকান খুলেছে।  খুব মিষ্টি খেতে  ইচ্ছে করলেও গাঙ্গুলী বাবু ওর দোকানের মিষ্টি কিছুতেই খাবেন না - ওটা মিষ্টির অপমান।  পাশের ময়রার উন্নতি আর সহ্য হলো না মনে হয়।  নিশ্চই ইয়ারি কিছু লাগিয়েছে।  হিংসে ই আমাদের বোরো শত্রু।  তবেই না বাঙালি কে কাঁকড়ার জাতি বলা হয়।  

এই সব ভাবতে ভাবতে গাঙ্গুলী বাবু টিভিটা চালালো।  বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্ক এই খবরের কাগজ আর টিভি দিয়ে। করার সাথে তো কথা বলা ও মণ এই করোনা র জগতে।  টিভি টেউ বা কি দেখবে। সেই এক খবর - কোথায় কত করোনা বাড়লো।  বিরক্ত লাগছে এক খবর শুনতে।  এই সব খবরেও মনটা ও খারাপ হয়ে যায়।  গতকাল তবু ও ২৬ এ জানুয়ারী র প্যারেড আর ঝাঁকি দেখা গেছিলো।  আজকে আবার সেই।  কতদিন হয়ে গেলো একটু বেড়াতে যাওয়া হয়নি , বন্ধুদের সাথে দেখা হয়নি , একটু প্রাণ খুলে আড্ডা মারা যায়নি।  গাঙ্গুলী বাবু র ছোটবেলার স্কুলের কিছু বন্ধুর  সাথে দারুন যোগাযোগ।  বছরে কম করেও তিন চারবার দেখা তো হয়েই যায়।  তারপর তারা আবার Annual All Boys Trip এও  যায়।  সেই সময় গাঙ্গুলী বাবুর মনেই হয় না এতো কোটা বছর কেটে গেছে। বন্ধুদের সাথে trip টা Time - machine এর মতন কাজ করে - তিনি আবার স্কুল এ দেন এ ফিরে যান, মনটাও তাজা হয়ে ওঠে।  

এই কোটা দিন গাঙ্গুলী গিন্নি বেশ নিশ্চিন্ত থাকে। বাড়িতে অসময়ে লোক আসবে না আর তাঁকে ঘন ঘন অতিথি আপ্পায়ন করতে হবে না।  ভেবেই গাঙ্গুলী গিন্নির mood ভালো হয়ে যায়।  

বন্ধুদের কথা ভাবতে ভাবতে গাঙলু বাবু ফোঁটা করেই ফেললেন।  আজকাল এই Whats App এর দয়ায় বেশ গ্রুপ video কল করা যায় , আর টাকা ও লাগে না।  ভাবা যাই ফোন করবো আর টাকা লাগবে না।  সত্যি কত ই না উন্নতি করলো মানুষ।  এই whats app টা গাঙ্গুলী বাবুর বেশ পছন্দের।  দুধের স্বাদ ঘোলে হলেও কিছুতে তো অবস্বই মেটে।  বন্ধুরা বেশ virtually আড্ডা দেওয়া যাচ্ছে।  এদিক ওদিক কার গল্প হলো, এদিক ওদিকের খবরের আলোচনা হলো।  ঠিক এই সময় আবার গাঙ্গুলী বাবুর আজকের  খবরের কাগজ  না পড়তে পাড়ার দুঃখ উঠে এলো।  টাবলুর খুব করে নালিশ করলো বন্ধুদের কাছে। কাল আসুক হচ্ছে ওর।  যেই না বলা অমনি ওপাশ থেকে ভৌমিক বলে উঠলো - ' কি রে গাঙ্গুলী গতকাল তো ২৬ এ জানুয়ারী ছিল, আজকে তো খোনোর কাগজ বন্ধ।' এটা গাঙ্গুলী কি করে ভুলে গেলো। Army তে ছিলেন।  ১৫ এই অগাস্ট, ২৬ এ জানুয়ারী, ২ এ অক্টোবর যে প্রেস হলিডে সেটা তার ভুল হওয়ার কারণ এই না।  গতকাল ২৬ এ জানুয়ারী র প্যারেড ও দেখলেন।  ভেবেই তার মনটা খারাপ হয়ে গেলো, বললো - ' বুঝলি ভৌমিক এই করোনা র জন্যে বাড়িতে বসে বসেই বুড়ো হয়ে গেলাম।'