মঙ্গলবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১
ইচ্ছেডানা
রোগা হওয়ার সহজ উপায়
রোগা হওয়ার সহজ উপায়
এই লেখার শিরোনামটা প্রথম থেকেই বিতর্কে জড়িয়ে আছে। প্রথমে নাম দিয়েছিলাম "বাঙালির খাদ্য সংযম"। বাংলা সাহিত্যের তারকারা রা প্রবল প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বাঙালি, খাদ্য এবং সংযম এই তিন শব্দ একসাথে এক বাক্কে ব্যবহার করা যায় না। এটা ভুল ব্যাকরণ। মানে বাঙালি আর খাদ্য - এটা খুব ভালো যায় একসাথে। উদাহরণের প্রয়োজন নেই। বাঙালি আর সংযম টাও বেশ যায় - especially শারীরিক শ্রমের সময়। আর সংযম আর খাদ্য, এই দুটি আজকাল millennial দের কাছে খুব জনপ্রিয় শব্দ জোর। কিন্তু বাংলা ভাষার ইতিহাসে আজ অবধি বাঙালি, খাদ্য ও সংযম - এই তিনটে শব্দ একসাথে ব্যবহার করে এমন আস্পর্ধা কারোর হয় নি। তাই বিতর্ক এড়াতে আমি লেখার নাম টা পাল্টে দিলাম । আশাকরি এতে বাংলার ভাষাবিদ ও খাদ্যরসিক সম্প্রদায় আমার ত্রূটি মার্জনা করবেন।
যাক, disclaimer দিয়ে মনটা হালকা লাগছে। এবার ঢুকে পরি কাজের কথায়। বিষয় টা হলো স্বাস্থ কেন্দ্রিক। সার্বিক বাঙালি সম্প্রদায়ের সাস্থ কেন্দ্রিক। রোজকার অম্বল, সাপ্তাহিক পেট খারাপ আর বাৎসরিক high cholesterol - এগুলি আমাদের সাম্প্রদায়িক রোগ। আমার মা বলেন - এগুলি রাজসিক রোগ। সমৃদ্ধির লক্ষন। কিন্তু এতো সমৃদ্ধি কি আর মধ্যবিত্ত বাঙালির পেটে সয় ? তা চর্বিরূপে স্থাপন হয় পাকস্থলীর চার পাশে। এই জমা সমৃদ্ধি কিভাবে শরীরের গঠন কে প্রভাব করে, তা নিয়ে বেশি কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। Fat shaming খুব খারাপ ব্যাপার।
কিন্তু গর্বিত বাঙালি হিসাবে আমি এইটা মেনে নিতে পারি না। বাঙালির এই শারীরিক দুর্গতি আটকারাবর একটা উপায় বার করতেই হবে। না শরীর চর্চার কথা ভেবেও লাভ নেই। বড় খাটনি। আমরা thought leader. শারীরিক শ্রম আমাদের সংবিধানে নেই।
মূল উদ্দেশ্য - রোগা হওয়ার সহজ উপায়। যে যাই বলুক না কেন, রোগা হওয়ার সহজ উপায় এর উদাহরণ খুবই বিরল। মানে এই ধরুন অনেকেই আজকাল dieting করার চেষ্টা করছে। খাদ্যের প্রকার ও পরিমান পাল্টে ফেলে স্বাস্থ্যের উন্নতি করার চেষ্টা। যেমন সকালে breakfast এ খালি ফলের রস, দুপুরে lunch এ এক বাটি ডাল, dinner এ একটা শুকনো পাউরুটি আর রাতে শুতে যাবার আগে এক বিশেষ ভেষজ ওষুধের বড়ি । এই পথে চললে নাকি এক সপ্তাহের মধ্যেই আপনি John Abraham বা Bipasha Basu র সাথে পাল্লা দিতে পারবেন। বানিয়ে বলছি না - আনন্দবাজারে আধ page জুড়ে এক প্রকান্ড বিজ্ঞাপন এ দেখলাম। মিথ্যে হতে পারে না। কিন্তু শুনতে যত সোজা মনে হয় আসলে তা নয়। মানে একবার ভাবুন - আপনি স্থির করেছেন যে নতুন বছরে গুচ্ছ ওজন আর কোমরের মাপ কমিয়ে এক্কেবারে শরীরের খোল নলচে বদলে ফেলবেন। ভালো কথা। সমস্যা শুরু হয় প্রথম রবিবার থেকে। রবিবারের সকালে বাঙালি সপরিবারে লুচি, কচুরি, আলুর দম, বোঁদে, জিলিপি ইত্যাদির সাহায্যে দিন শুরু করে। এর মাঝে আপনি বেঁকে বসে বললেন খালি বেদানার রস খাবেন। এতে সমস্যা দুদিক থেকে। লুচি ভাজার মাঝে বেদানার রস করতে বললে রাঁধুনির চোটে যাওয়া স্বাভাবিক। শুধু তাই না, পরিবারের সবাই আঙ্গুল চেটে কচুরি আলুর দম খাচ্ছে আর তার মাঝে আপনি তৃপ্তির ভাব করে বেদানার রসে চুমুক দিচ্ছেন। দেখে গা জ্বলে যায়। পারিবারিক অশান্তি শুরু হয় এখন থেকেই। তাই তো বলছি যে এই সব dieting ফাইটিং খুব জটিল ব্যাপার। শারীরিক ও সামাজিক প্রভাব খুব গুরুতর।
শনিবার, ২৬ জুন, ২০২১
Fathers Day
"হ্যালো বাবা, Happy Father's Day".
"হ্যা, তোরা ভালো থাকিস, এই নে মায়ের সাথে কথা বল"
হয়ে গেলো fathers day wish. ৩০ সেকেন্ড এর কম সময়। মাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আজ plan কি ?" জবাব এলো "Plan আবার কি ? এই তো office বেরোবে সবাই" . "আজ কোনো celebration নেই, আজ তো fathers day ?" আমি প্রশ্ন করলাম। মা হেসে বললো "কোনদিন তোর বাবা এইসব celebrate করলো ? বেশি বললে আবার রেগে যায়। বলে সব নাকি আদিখ্যেতা। তাই আমি আর ঘাটাই না। " এটা আমারও অভিযোগ। যেকোনো celebration এ বাবার যেন allergy. এই যেমন ছোট বেলায় একবার আমিও অংকে ১০০ / ১০০ পেয়েছিলাম। একবারই পেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা বড়ো কথা নয় । নাচতে নাচতে বাড়ি এসে সবাই কে নিজের জ্ঞান জাহির করে বেড়াচ্ছি, মা এসে গালে চুমু খেয়ে গেলো, দাদু মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করলো, আর বাবা ? বাবা গম্ভীর ভাবে বললো - "ভালো হয়েছে, পরের বার আরো ভালো করতে হবে" আরো ভালো ? আমি তো full marks পেয়েছি। এর চেয়ে বেশি ভালো কিভাবে করবো ? যুক্তি টা উড়িয়ে দিয়ে বাবা বললো "যদি everest জয় করবি ভাবিস, তাহলে চাঁদের দিকে লক্ষ রাখতে হবে। তবে না everest এর ধারে কাছে পৌঁছাতে পারবি। অকাট্ট যুক্তি - পরের বার আমি ১০০ তে ২০০ পাওয়ার চেষ্টা করবো।
বাবার এই বেরসিকতা তা শুধু পড়াশোনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকলে তাও বুঝতাম। কিন্তু না। আমার বয়স তখন ১৬। ১৪ই February Valentines Day. মনে বেশ কচি প্রেম প্রেম ভাব। প্ল্যান করলাম সেজে গুঁজে লাল জামা পরে icecream খেতে বেরোয়। বাবার কাছে ১০ টাকা চাইলাম - Ice cream এর জন্য । File এর ভিতর থেকে মুখ না তুলেই বাবা জানিয়ে দিলো যে সামনে year ending, ব্যবসার অবস্থা ভালো নয়। তাই ice cream খাওয়া আর খাওয়ানো ১st April অবধি ঠেকিয়ে রাখতে হবে। অতয়েব আমার Valentine's day টা April fool হয়ে গেলো। সেই দুখঃ আমি আজও ভুলতে পারিনি।
কিন্তু এসব শুনে ভদ্রলোককে কিপ্টে ভাববেন না। নিজের ভাসায় বাবা অত্যন্ত হিসেবি . অথচ এই হিসেবি মানুষ বাজার গেলে এক একটা কেলেঙ্কারি ঘটে। সস্তায় ফুলকপি পেলে আনন্দ হয় এরম অনেক লোক আমাদের চেনা । কিন্তু সেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে দোকানির সব ফুলকপি কিনে আনে, পুরো ২১ কিলো, এরম মানুষের সন্ধান পাওয়া কঠিন । মায়ের প্রবল প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে বাবা হিসাব করে দেখিয়ে দিলো যে প্রতি কিলো ২ টাকা ছাড় পাওয়াতে তিনি ৪২ টাকা লাভ করেছেন। তাছাড়া দোকানি নিজে van রিকশা করে সব ফুলকপি বাড়ি দিয়ে গেছে। মানে free delivery. শতাব্দীর সেরা সওদা। Breakfast এ ফুলকপির পরোটা, lunch এ ফুলকপির ঝোল, বিকেলে চায়ের সাথে ফুলকপির চপ, dinner এ ফুলকপির সূপ, আর বাড়িতে অতিথি এলে ফুলকপির রোস্ট। আগামী ২ মাসের menu announce করে দিলো বাবা। এর মধ্যে রান্নার মাসি বাবাকে আরো উস্কে দিয়ে বললো - "বড়দা, একটা গরু বা ছাগল ভাড়া নিয়ে আসেন । অতগুলো ফুলকপির পাতা আর ডাটা ফেলতে হবে না ।" বাবা সম্মতি জানাবার আগেই মা বলে উঠলো "থাক - তার প্রয়োজন নেই, আমি পাতার সাগ বানিয়ে দেব" . বুঝলাম দুমাস ফুলকপির সাথে সাথে পাতার সাগ খেতে হবে। অন্তত বাড়িটা গোয়াল ঘর হওয়া থেকে রক্ষা পেলো।
ভাগ্যক্রমে বাবার আর একটা গুন্ আমাদের এই ফুলকপি বিভ্রাট থেকে রক্ষা করলো। বাবার মতন জনহিতৈষী মানুষের নজির মেলা ভার। ভূত ভোজন অরে ভূত ভ্রমণ না করলে বাবার রাতে ঘুম হয়ে না। তাই ফুলকপি রপ্তানির পরের দিন থেকেই দানছত্র শুরু হয়ে গেলো। পাড়ার ময়রা, গাড়ির driver, ফ্লাট এর দারোয়ান, office এর কেরানি, দুঃসম্পর্কের কুটুম এমনকি বাজারের পাওনাদার - কাউকেই খালি হাতে ফিরে যেতে হয় নি । আসলে, বিনামূল্যে ফুলকপির প্রাপক হবার জন্য বাবার সাথে হৃদ্যতার প্রয়োজন নেই। হাসি মুখে "স্যার ভালো আছেন ?" বললেই ফস করে এক জোড়া ফুলকপি হাথে চলে আসবে। যেন ভূতের রাজার বড় ।
এতো জন কল্যাণ করেও বাবার কোনো গর্ব নেই। ভদ্রলোক অত্যন্ত down to earth. Office হোক বা বিয়েবাড়ি - বাবার পরনে তার প্রিয় নীল শার্ট আর ছাই রঙের প্যান্ট সঙ্গে sreeleather এর জুতো। পছন্দের বাহন - দুই দশক পুরোনো জীর্ণ এক মোটরসাইকেল। ওহ আর ঝোলা ব্যাগ তার কথা ভুলে গেলে চলবে না। মা অনেক চেষ্টা করেও ভাড়া fashion sense এর কোনো উন্নতি করতে পারেনি। জামা মানেই তাকে হতে হতে হবে ডার্ক কালার আর পকেট ওয়ালা। কালো পছন্দ না। তাই বাবার আলমারি তে খালি নীল, সবুজ আর খয়েরি রঙের জামাই পাওয়া যায়। আর এই fashion disaster তা বাড়ির বাকিদের ওপরেও ছলকে পড়তো। কেন আমি প্রতি পুজোয় গামছা design এর জামা পরে ঠাকুর দেখতে বেরোতাম এখন সেটা বোঝা গেলো ? Courtesy হাতিবাগান। কিন্তু এসব তুচ্ছ প্রসাধনী ব্যাপারে বাবার কোনো উৎসাহ নেই। বাবা "Plain Living High thinking" নীতি তে দৃঢ় বিশ্বাসী। Plain living এর উদাহরণ তো আমরা পেয়েই গেছি। কিন্তু এই high thinking ব্যাপারটাতেই যত গোলমাল । একবার সবাই মিলে গরমের ছুটিতে মাসির বাড়ি বেড়াতে গিয়েছি। ঘরে ঢুকেই মাস্তুতো বোন কে বাবা প্রশ্ন করে ফেললো - ১৩ ঘরের নামতা তা বল দেখি। বাবার মতে মুখে মুখে অংক করা হলো মগজের exercise . High thinking এ first step. কিন্তু এই mental gymnastic আমার মাস্তুতো বোনের একটু পছন্দ নয়। সে কটমট করে আমার দিকে চেয়ে রইলো। যেন আমি পরিকল্পনা করে ওকে বিপাকে ফেলেছি। ভাগ্গিশ ঠিক সময় মা এসে সবাইকে বকাবকি করে চান করতে পাঠিয়ে দিলো। আর একটু দেরি হলেই বাবা algebra য় ঢুকে পড়তো। তারপর আর গরমের ছুটি salvage করা যেত না।
শুধু অংকে আটকে থাকলে তও হতো - রেজাল্ট এর season এ আমার বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ হয়ে যেত । কারণ - লোকের সাথে দেখা হলেই বাবা invariably জিগেশ করতো তাদের ছেলেমেয়েদের রেজাল্ট কেমন হলো। especially অংক আর সাইন্স এ। তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আপত্তি তা হলো তাদের নম্বর জানার পর বাবা খুব গর্ব করে আমার নম্বর গুলো প্রচার করে ফেলতো। সমস্যা হলো আমার নম্বর গুলো তো আর গর্ব করে বলার মতন ছিল না। তাই সেগুলো যখন পাবলিক knowledge হয়ে যায় তখন আমার social distance করা ছাড়া আর উপায় থাকতো না। কিন্তু সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হলো বাবা আমার class টাও গুলিয়ে ফেলতো। মানে, আমি ক্লাস ৯ এ পড়ি। বাবা গিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিলো আমি ক্লাস ১০ এ পড়ি। ভালো না ? এক ক্লাস বাড়িয়ে বলেছে। এক বছর পর যখন আমার সত্যি ক্লাস ১০ হবে তখন লোকে ভাববে আমি ফেল করেছি ? ইটা বাবাকে কিছুতেই বোঝাতে পারতাম না। যদি মনে না রাখতে পারো, কিছু বোলো না। ভুল ভাল information দিয়ে আমাকে বিপদে ফেলার কি মানে ? কিন্তু কে আর আমার কথা শোনে। একবার স্কুল এ বাবা গিয়েছিলো ক্লাস টিচার এর সাথে দেখা করতে। টিচার জিগেশ করলো আপনার ছেলের নাম কি ? বাবা কিছুক্ষন ভেবে বললো "গাব্বু" - ওটা আমার ডাক নাম। আর এখন বাবার কল্যানে South Point School এর faculty ডিপার্টমেন্ট এ একটা নতুন running joke শুরু হলো। কি করে যে আমি এতো গুলো বছর ওই স্কুল এ কাটালাম আমিই জানি খালি।
বাবার এইসব কাণ্ডে ছোটবেলায় খুব রাগ হতো। অনেকবার মায়ের কাছে অভিযোগ করেছি। মা বলতো - মন খারাপ করিস না, বাবা এরকমই। বোরো হলে বুঝবি। ঠিকই বলতো মা - এখন বুঝি বাবার এই principle গুলো তখন যতই বেমানান লাগতো, এখন ততটাই মানাতে পারি নিজের সাথে। বাবা শিখিয়েছে কঠোর পরিশ্রমের মূল্য, পরোপকারিতা , ভেদাভেদ হীন মনুষত্ব আর সবচেয়ে বড়ো - মানসিক উদারতা। বাবার চিন্তা ধারার সাথে আমি আমি হয়তো সবসময় একমত নোই - কিন্তু বাবার দেওয়া তালিম গুলো আমি অগ্রাহ্য করতে পারি না। Happy Fathers Day বাবা। আমার প্রণাম নিও। Oh আমার বয়স এখন ৩৭ - কেউ জিগেশ করলে বাড়িয়ে বা কমিয়ে বলতে পারো - আমার একটুও খারাপ লাগবে না.
শনিবার, ১৩ মার্চ, ২০২১
কলকাতায় এক সকাল
গাঙ্গুলিবাবু সকাল থেকে খবরের কাগজের অপেক্ষায় বসে। ৯ টা বাজতে চললো এখনো টাবলুটার পাত্তা নেই। এতো বেলা করলে তো খবরটা ও বাঁশী হয়ে যায়। কি আর হবে তখন খবর পড়ে। সকাল সকাল মেজাজটা ও খারাপ হয়ে যাচ্ছে।
বারান্দায় হালকা রোদ এসেছে, টবের গাছগুলো বেশ চনমন করছে। শীতকালের ফুলের গাছগুলো কি রঙিন। আজকাল আকাশের রঙটাও বেশ নীল নীল লাগে।সেটা মনে হয় কোরোনার এই দয়া। করোনা র কিছু কিছু ভালো অবদান ও আছে। গাঙ্গুলিবাবুর মনে পড়ে না কত বছর আগে নীল আকাশ দেখেছে। নীল তো দূরের কথা, বারান্দা থেকে আকাশ দেখার সৌভাগ্য ই বা আজকাল কতজনের হয় এই কলকাতা শহরে। নেহাত ওনার সামনে প্রাইমারি স্কুল এর মাঠ তাই ভাগ্গি , নাহলে কবে প্রোমোটারের হাতে চলে যেত।
রান্নাঘর থেকে খুটখাট শব্দ এসেই চলেছে। গিন্নি সারাদিন যে রান্নাঘরে কি করে, কে জানে। সেই তো Lunch এ ডাল , ভাত, পোস্ট আর মাছ কিছু বললেও মুশকিল - ইদানীঙ মেজাজটা ও তুঙ্গে থাকে। গাঙ্গুলী বাবুর মনে হয় সকালের চা তা একটু দুজনে মাইল বসে খাবে। সে আর হয়না। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরেও গাঙ্গুলী বাবুর routine এ বিশেষ পরিবর্তন আসেনি। উনি সাত সকালেই ঘুম থেকে উঠে Morning walk তা সেরে ফেলেন। কলকাতার বাঙালিরা বেলা অব্দি ঘুমোতে ভালোবাসে, তাই গাঙ্গুলী বাবু নিরিবিলিতে সাত সকালে একটু বাইরের হাওয়া খেয়ে আসেন। সকালের বাজারের প্রথম খদ্দের দেড় মধ্যে গাঙ্গুলী বাবু ধরা বাঁধা। বৈণির দর কষাকষির সুবিধে তও পেয়ে যান। অবসর নেওয়ার পর সাধারণত তিনি সকাল থেকে তিন বার বাজার যেতেন। শেষ বার যখন বাজার উঠে যাওয়ার সময়, তখন বেশ দর দাম করা যেত। আনন্দবাজারে প্রকাশিত দিনের সবজির দামের চেক্যে যদি কমে ভালো জিনিস আন্তে পারতেন তাহলে বেশ খোশ মেজাজে থাকতেন। নিজেকে ওনার বেশ সম্পন্ন বলে বলে মনে হতো। আজকাল তো করোনা র দোয়ায় বাজার খালি একবার যাওয়া। কিন্তু সকালের বৈণি তা বেশ কাজের। সেই কোনো না কোনো উপায় বেরিয়ে যাই আর মানুষ নিজের দৈনিন্দিন জীবন চালিয়ে যায়।
বাজার থেকে ফিরে তো আজকাল ধোয়া ধুয়ি ও অনেক বেড়ে গেছে। বাড়ি ফিরেই গাঙ্গুলী বাবু আলু পেয়াঁজের সাথে নিজের স্নান টাও সেরে ফেলেন। স্নান আর পুজো সেরে সকালের জলখাবার এর সাথে খবরের কাগজ নিয়ে বসেন। তা আর আজকে হলো কি টাবলু তা সব মাটি করে দিলো। কতবার ওকে বলা হয়েছে খবরের কাগজ দিতে দেরি না করতে। কিন্তু কে কার কথা শোনে। রোজ এই দেরি করে, তবে জলখাবারের আগে চলে আসে. আজকে তো তও হলো না। যাগ্গে কাগজ টা আসলে না হয় আরো এক কাপ চা খাওয়া যাবে।
আজকের জলখাবার তা মন্দ ছিল না - পরোটা আর আলুর তরকারি। সঙ্গে মিষ্টি হলেই ভালো বলা যেত। মিষ্টি ভাবতেই জানুলজি বাবুর পাড়ার ' গোপাল স্বীটস 'এর কথা মনে পড়লো। গত সপ্তাহে মিষ্টি নিতে গিয়ে দেখে দোকানটা বন্ধ। পরের দিন ও এক। পাশের ফুলওয়ালী জমি টা নাকি disputed ছিল। যাহঃ বাবা ,এতো কাল ধরে দোকানটা ছিল। যকুরদাদার হাতে মিষ্টি খেলাম, বাবার হাতে খেলাম আর এই ছেলের হাথে এলো, আর এতদিনে জানা গেলো জমি টা disputed. আজকাল কি যা হয় বলা যাই না. মিষ্টির দোকানটা খালি গাঙ্গুলী বাবুর পছন্দের দোকান ছিল না, পাড়ার সবার প্রিয় দোকান। ওরম কাঁচাগোল্লা আর কোথাও খায়নি গাঙ্গুলী বাবু। গাঙ্গুলী বাবু র মেয়ের ও খুব পছন্দের দোকান ছিল। গতকাল মেয়েকে অহনে জানালে তার তো খুব মন খারাপ। এবার শীতের নলেন গুড় এর সন্দেশ খেতে সেই ২ মাইল হেঁটে 'সত্যনারায়ণ মিষ্টান্ন' যেতে হবে। মিষ্টি তো ভালো ছিলই , তার ওপর আবার ডোনাকের নামটা গাঙ্গুলী বাবুর বাবার নাম এ ছিল তাই একটু বেশি যেন কাছের লাগতো। কোথায় যে কিভাবে সম্পর্ক তৈরী হয়ে যাই বোঝা যাই না - তবে না মানুষের মন।
যাইহোক এই সব ভাবতে ভাবতে হটাৎ গাঙ্গুলী বাবুর মনে হলো পাশের 'ইস্টার্ন স্বীটস' এর কিছু কারসাজি নেই তো এই দোকানটা বন্ধ করার জন্যে। কয়েক ম্যাশ আগেই ব্যাটারা দোকান নতুন দোকান খুলেছিলো। মিষ্টি যে এতো অখাদ্য বানানো যাই আর তারপর সেটা কলকাতার বাজারে বিক্রি করার আস্পর্ধা ও দেখানো যাই সেটা দেখে গাঙ্গুলী বাবুর বেশ অবাক এই হতেন। বেশিদিন অবশ্য তাঁকে অবাক হতে হয়নি। এক ম্যাশ পরেই সেই মিষ্টির দোকান বন্ধ হয়ে গেলো। পাশের মিষ্টির দোকানে line আর সে মাছি মারে - এতো কিছু সহ্য করেও সে গোটা তিরিশ দিন দোকান খোলা রেখেছিলো - দম আছে বলে হবে। আজ বাজার থেকে ফেরার পথে তো দেখলো সে আবার দোকান খুলেছে। খুব মিষ্টি খেতে ইচ্ছে করলেও গাঙ্গুলী বাবু ওর দোকানের মিষ্টি কিছুতেই খাবেন না - ওটা মিষ্টির অপমান। পাশের ময়রার উন্নতি আর সহ্য হলো না মনে হয়। নিশ্চই ইয়ারি কিছু লাগিয়েছে। হিংসে ই আমাদের বোরো শত্রু। তবেই না বাঙালি কে কাঁকড়ার জাতি বলা হয়।
এই সব ভাবতে ভাবতে গাঙ্গুলী বাবু টিভিটা চালালো। বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্ক এই খবরের কাগজ আর টিভি দিয়ে। করার সাথে তো কথা বলা ও মণ এই করোনা র জগতে। টিভি টেউ বা কি দেখবে। সেই এক খবর - কোথায় কত করোনা বাড়লো। বিরক্ত লাগছে এক খবর শুনতে। এই সব খবরেও মনটা ও খারাপ হয়ে যায়। গতকাল তবু ও ২৬ এ জানুয়ারী র প্যারেড আর ঝাঁকি দেখা গেছিলো। আজকে আবার সেই। কতদিন হয়ে গেলো একটু বেড়াতে যাওয়া হয়নি , বন্ধুদের সাথে দেখা হয়নি , একটু প্রাণ খুলে আড্ডা মারা যায়নি। গাঙ্গুলী বাবু র ছোটবেলার স্কুলের কিছু বন্ধুর সাথে দারুন যোগাযোগ। বছরে কম করেও তিন চারবার দেখা তো হয়েই যায়। তারপর তারা আবার Annual All Boys Trip এও যায়। সেই সময় গাঙ্গুলী বাবুর মনেই হয় না এতো কোটা বছর কেটে গেছে। বন্ধুদের সাথে trip টা Time - machine এর মতন কাজ করে - তিনি আবার স্কুল এ দেন এ ফিরে যান, মনটাও তাজা হয়ে ওঠে।
এই কোটা দিন গাঙ্গুলী গিন্নি বেশ নিশ্চিন্ত থাকে। বাড়িতে অসময়ে লোক আসবে না আর তাঁকে ঘন ঘন অতিথি আপ্পায়ন করতে হবে না। ভেবেই গাঙ্গুলী গিন্নির mood ভালো হয়ে যায়।
বন্ধুদের কথা ভাবতে ভাবতে গাঙলু বাবু ফোঁটা করেই ফেললেন। আজকাল এই Whats App এর দয়ায় বেশ গ্রুপ video কল করা যায় , আর টাকা ও লাগে না। ভাবা যাই ফোন করবো আর টাকা লাগবে না। সত্যি কত ই না উন্নতি করলো মানুষ। এই whats app টা গাঙ্গুলী বাবুর বেশ পছন্দের। দুধের স্বাদ ঘোলে হলেও কিছুতে তো অবস্বই মেটে। বন্ধুরা বেশ virtually আড্ডা দেওয়া যাচ্ছে। এদিক ওদিক কার গল্প হলো, এদিক ওদিকের খবরের আলোচনা হলো। ঠিক এই সময় আবার গাঙ্গুলী বাবুর আজকের খবরের কাগজ না পড়তে পাড়ার দুঃখ উঠে এলো। টাবলুর খুব করে নালিশ করলো বন্ধুদের কাছে। কাল আসুক হচ্ছে ওর। যেই না বলা অমনি ওপাশ থেকে ভৌমিক বলে উঠলো - ' কি রে গাঙ্গুলী গতকাল তো ২৬ এ জানুয়ারী ছিল, আজকে তো খোনোর কাগজ বন্ধ।' এটা গাঙ্গুলী কি করে ভুলে গেলো। Army তে ছিলেন। ১৫ এই অগাস্ট, ২৬ এ জানুয়ারী, ২ এ অক্টোবর যে প্রেস হলিডে সেটা তার ভুল হওয়ার কারণ এই না। গতকাল ২৬ এ জানুয়ারী র প্যারেড ও দেখলেন। ভেবেই তার মনটা খারাপ হয়ে গেলো, বললো - ' বুঝলি ভৌমিক এই করোনা র জন্যে বাড়িতে বসে বসেই বুড়ো হয়ে গেলাম।'