মঙ্গলবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১

রোগা হওয়ার সহজ উপায়


রোগা হওয়ার সহজ  উপায় 


এই লেখার শিরোনামটা প্রথম থেকেই বিতর্কে জড়িয়ে আছে। প্রথমে নাম দিয়েছিলাম "বাঙালির খাদ্য সংযম"। বাংলা সাহিত্যের তারকারা রা প্রবল প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বাঙালি, খাদ্য এবং সংযম এই তিন শব্দ একসাথে এক বাক্কে ব্যবহার করা যায় না। এটা ভুল ব্যাকরণ। মানে বাঙালি আর খাদ্য - এটা খুব ভালো যায় একসাথে। উদাহরণের প্রয়োজন নেই। বাঙালি আর সংযম  টাও বেশ যায় - especially শারীরিক শ্রমের সময়।  আর সংযম আর খাদ্য, এই দুটি আজকাল millennial  দের কাছে খুব জনপ্রিয় শব্দ জোর। কিন্তু বাংলা ভাষার ইতিহাসে আজ অবধি বাঙালি, খাদ্য ও সংযম - এই তিনটে শব্দ একসাথে ব্যবহার করে এমন আস্পর্ধা কারোর হয় নি। তাই বিতর্ক এড়াতে আমি লেখার নাম টা পাল্টে দিলাম । আশাকরি এতে বাংলার ভাষাবিদ ও খাদ্যরসিক সম্প্রদায় আমার ত্রূটি মার্জনা করবেন।

যাক, disclaimer দিয়ে মনটা হালকা লাগছে।  এবার ঢুকে পরি কাজের কথায়। বিষয় টা হলো স্বাস্থ কেন্দ্রিক। সার্বিক বাঙালি সম্প্রদায়ের সাস্থ কেন্দ্রিক। রোজকার অম্বল, সাপ্তাহিক পেট খারাপ আর বাৎসরিক high cholesterol - এগুলি আমাদের সাম্প্রদায়িক রোগ।  আমার মা বলেন - এগুলি রাজসিক রোগ। সমৃদ্ধির লক্ষন।  কিন্তু এতো সমৃদ্ধি কি আর মধ্যবিত্ত বাঙালির পেটে সয় ? তা চর্বিরূপে স্থাপন হয় পাকস্থলীর চার পাশে। এই জমা সমৃদ্ধি কিভাবে শরীরের গঠন কে প্রভাব করে, তা নিয়ে বেশি কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। Fat  shaming  খুব খারাপ ব্যাপার।

কিন্তু গর্বিত বাঙালি হিসাবে আমি এইটা মেনে নিতে পারি না। বাঙালির এই শারীরিক দুর্গতি আটকারাবর একটা উপায় বার করতেই হবে। না শরীর চর্চার কথা ভেবেও লাভ নেই।  বড় খাটনি। আমরা thought leader. শারীরিক শ্রম আমাদের সংবিধানে নেই। 

মূল উদ্দেশ্য - রোগা হওয়ার সহজ উপায়। যে যাই বলুক না কেন, রোগা হওয়ার সহজ উপায় এর উদাহরণ খুবই বিরল। মানে এই ধরুন অনেকেই আজকাল dieting করার চেষ্টা করছে।  খাদ্যের প্রকার ও পরিমান পাল্টে ফেলে স্বাস্থ্যের উন্নতি করার চেষ্টা। যেমন সকালে breakfast এ খালি ফলের রস, দুপুরে lunch এ এক বাটি ডাল, dinner  এ একটা শুকনো পাউরুটি আর রাতে শুতে যাবার আগে এক বিশেষ ভেষজ ওষুধের বড়ি । এই পথে চললে নাকি এক সপ্তাহের মধ্যেই আপনি John Abraham বা Bipasha Basu র সাথে পাল্লা দিতে পারবেন। বানিয়ে বলছি না -   আনন্দবাজারে আধ page জুড়ে এক প্রকান্ড বিজ্ঞাপন এ দেখলাম। মিথ্যে হতে পারে না। কিন্তু শুনতে যত সোজা মনে হয় আসলে তা নয়। মানে একবার ভাবুন - আপনি স্থির করেছেন যে নতুন বছরে গুচ্ছ ওজন আর কোমরের মাপ কমিয়ে এক্কেবারে শরীরের খোল নলচে বদলে ফেলবেন।  ভালো কথা।  সমস্যা শুরু হয় প্রথম রবিবার থেকে। রবিবারের সকালে বাঙালি সপরিবারে লুচি, কচুরি, আলুর দম, বোঁদে, জিলিপি ইত্যাদির সাহায্যে দিন শুরু করে।  এর মাঝে আপনি বেঁকে বসে বললেন খালি বেদানার রস খাবেন। এতে সমস্যা দুদিক থেকে।  লুচি ভাজার মাঝে বেদানার রস করতে বললে রাঁধুনির চোটে যাওয়া স্বাভাবিক। শুধু তাই না, পরিবারের সবাই আঙ্গুল চেটে কচুরি  আলুর দম খাচ্ছে আর তার মাঝে আপনি তৃপ্তির ভাব করে বেদানার রসে চুমুক দিচ্ছেন। দেখে গা জ্বলে যায়।  পারিবারিক অশান্তি শুরু হয় এখন থেকেই।  তাই তো বলছি যে এই সব dieting ফাইটিং খুব জটিল ব্যাপার। শারীরিক ও সামাজিক প্রভাব খুব গুরুতর।  

তাই সেই নিয়ে আলোচনা করা বৃথা।  আজ আমি রোগা হওয়ার কিছু সুবিধাজনক উপায় বাতলে দেব। যাতে পারিবারিক এবং মানসিক শান্তি বজায় থাকে। 

১. রূপ  - আপনি রোগা না মোটা সেটা গুরুতূপূর্ণ নয়।  গুরুত্ব হলো আপনাকে খাশা দেখাচ্ছে কিনা।  অনেক কসরৎ করে ছোটবেলার skinny jeans তা কোমরে আটিয়েছেন ।  আর তাতে আপনি একটা সাংঘাতিক জয় বোধও করতে পারেন।  কিন্তু  এতে লাভের লাভ কিছুই হয় না।  কোমরের চাপে হাসফাস, হাটতে চলতে অসুবিধা আর হঠাৎ করে বসতে গেলে দুর্ঘটনা।  এসবের প্রবল সম্ভাবনা।  রোগা দেখানোর জন্য নিজের শরীর কে এতো চাপ দেওয়া নিরর্থক। তার চেয়ে বেশ ঢোলা ঢালা আরামদায়ক পোশাকেই সুফল লাভ করবেন। কিন্তু প্রশ্ন তা হলো - এতে কি আপনি আদোও রোগা হলেন ? না, তা হবেন না।  কিন্তু হবার প্রয়োজন আছে কি ? দিব্বি তো ফতুয়া, বার্মুডা, পায়জামা, palazzo পরে নিশ্চিন্ত মেঘের মতন উড়ে বেড়াচ্ছেন। অসময়ে Wardrobe malfunction এর সম্ভাবনা নেই, সাজগোজের সময় কুস্তির প্রয়োজন নেই, মনে বেশ একটা ফুরফুরে আত্মবিশ্বাসের ভাব। কোমরের মাপ, ওজন, BMI এগুলো তখন খালি কিছু সংখ্যা। এক্কেবারে অপ্রাসঙ্গিক। চুলোয় যাক Skinny jeans । 

২. গুন্   - দম আটকে, পেট টাকে ভিতরে টেনে কিছুক্ষন রাখা যায়। ক্ষনিকের জন্য নিজেকে বেশ Ranbir Kapoor এর মতন লাগে।  এই সুযোগে দুটো ছবিও তুলে নিতে পারেন। কিন্তু যেই দম শেষ, সেই Ranbir ও শেষ। তাই উপায় তা sustainable নয়। অথচ social media তে  আপনার বাল্য বন্ধু দিব্বি supermodel সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। । আপনার মনে পরে যায় ক্লাস ৯ এ সে অংকে কোনমতে পাশ করেছিল।  তাও আপনার থেকে টুকে। অথচ আজ তার জনপ্রিয়তা আকাশ ছোঁয়া। ১০০ day  challenge, vegan challenge আরো কত সব জটিল hastag এর মধ্যে দিয়ে তার প্রায় শত সহস্র চ্যালা।  আপনাকে কেউ পোছে না।  ঘোর অবিচার। আমার সাথেও এরম হয়।  এখন তাই আমার role model গোপাল ভাঁড় । নাদুস নুদুস চেহারা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের প্রধান উপদেষ্টা। ভাঁড় বাবুকে দরবারে বসে দম আটকে থাকতে হয় নি কখনো। বরং ওনার কৌশল নীতি শোনার জন্য স্বয়ং মহারাজ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে থাকতেন। সবার ফোকাস গোপালের মগজে - ভুঁড়ি তে নয়। তাই আর আয়নার সামনে  ভুঁড়ি ঢাকার চেষ্টা করবেন না। বত্রিশ পাটি বার করে  ১৭ র ঘরের নামতা টা  মনে মনে আউড়ে নেবেন।  শরীরের মেদ মগজাস্ত্রে পরিণত হবে ।  আপনি ১৭ র নামতা জানেন, রণবীর কাপুর জানে না।  রোগা  হবার আর কোনো প্রয়োজন নেই। 

৩. আচরণ  - ঠিক যখন হাত গুটিয়ে বিরিয়ানি তে কব্জি ডোবাতে যাবেন, অমনি পাশ থেকে কেউ বলে উঠবে - "একটু salad তা pass  করবেন ? আমি carb তা cut down করছি " ঘাস-পাতায় চান করেও এদের শান্তি নেই। এরপরেই শুরু হবে ভিন্ন প্রকারের ডায়েট এর গুনচর্চা। এখানেই শেষ নয়।  Exercise routine, gym membership এইসব ভয়ঙ্কর বিষয়ে আলোচনা চলতে থাকে। আপনি কোনায় বসে চুপচাপ বিরিয়ানি সাঁটাচ্ছেন আর মনে মনে প্রার্থনা করছেন কেউ যেন আপনার দিকে নজর না করে।  কিন্তু আপনার পোড়া কপাল।  আলু তে কামড় দিয়েছেন কি একজন জিগেশ করেই ফেললো - "হ্যা রে, তা তোর এবছরের health goals কি ?" কোনোমতে আলু টা গিলে, বিষম আটকে আপনি মৃদু স্বরে বললেন, "একটু হাটাহাটি করবো ভাবছি" - একটা অস্বস্তিকর স্তব্ধতা - তারপর গল্প গুজব আবার শুরু হয়ে যায়।  আপনার ওপর আর focus নেই। বন্ধুদের হতাশ করে বেশ লজ্জা লাগছে। এই জন্য আপনার আর আজকাল socialize করতে  ভালো লাগে না। বড্ডো pressure. কিন্তু এই চাপ টা আপনি না নিলেই পারেন। কেউ জিগেশ করলে বলে দেবেন - "এবছর আমি ভালো থাকবো ঠিক করেছি" । ভালো খেয়ে, ভালো ঘুমিয়ে, ভালো বই পরে, ভালো করে ঘুরে, নিজেকে ভালোবেসে থাকবো । না, এতে আপনি রোগা হবেন না।  কিন্তু সামাজিক চাপের মেদ গুলো দিব্বি ঝরে যাবে।  ১০০ মিটার স্প্রিন্ট হয়তো দিতে পারবেন না, কিন্তু আপনার মনের গতি অপ্রতিরোধ্য। আর রোগা হয়ে কি করবেন ?  

এতক্ষনে নিশ্চয় বুঝতে পেরে গেছেন যে রোগা হবার সহজ উপায় আমার জানা নেই।  তার তার প্রয়োজন ও নেই। এই অবান্তর ভাট লিখে আপনার সময় নষ্ট করলাম। তার জন্য আমি দুঃখিত।  শরীর যত্ন নেওয়া খুব ভালো ব্যাপার - কিন্তু তার জন্য মানসিক কষ্ট পাওয়া একদমই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। শরীরের দিকে নজর দিতে গিয়ে মনের বিকাশ কে অগ্রাহ্য করবে না।  ইচ্ছে মতন খান, ইচ্ছে মতন সাজুন, ইচ্ছে মতন ঘুরুন, ইচ্ছে মতন শরীর চর্চা করুন । ত্যাগ আর ভোগ একসাথেই চালিয়ে যান । 

- ঋত্বিক সেন 

1 টি মন্তব্য:

  1. জয়িতা তোর লেখার মধ্য নতুন ভাবধারার আছে। সেটাই খুব ভাল লাগল। অদ্ভূত অথচ সুন্দর।

    উত্তরমুছুন