২০২০ র একটি বিকেল
অরুনিমা TV তে 'Bewitched' TV series টা দেখছিলো। এই pandemic এর সময় TV series দেখার একটা নতুন নেশা হয়েছে তার। 'Bewitched' টা ওর ভীষণ প্রিয় একটা series. চারিদিকে এতো মন ভারী করা news এ, এরম মন হালকা করা series দেখতে বেশ ভালো লাগে।
যারা 'Bewitched' series তার কথা জানেন না, তাদের কে বলি, 'Bewitched' ষাটের দশকের একটি American sitcom. গল্পের মুলে একটি witch, মানে বাংলায় ডাইনি। একটি ডাইনি একজন সাধারণ মানুষ কে বিয়ে করে সাধারণ গৃহবধূ হয়ে থাকার কাহিনী 'Bewitched'. এই গল্পে সেই সুন্দরী ডাইনির মায়ের ও একটি সুন্দর ভূমিকা আছে। উনিও ডাইনি, কিন্তু ভীষণ গর্বিত এক ডাইনি যে সাধারণ মানুষকে বেশ নিচু চোখে দেখেন । উনি ষাটের দশকের সাধারণ দৈনন্দিন ঐতিহ্য গুলো কে বেশ কটাক্ষই করেন। ডাইনি আর সাধারণ মানুষের জগতের বেশ মজার কিছু গল্প নিয়ে তৈরী এই sitcom টি.
৯০ এর দশকের এই sitcom ভারতের TV তে দেখানো শুরু হলো। অরুণিমার তখন class ৯। সেই কত বছর আগের series এখন Netflix এর দয়ায় আবার দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।
Magic ব্যাপার ta অরুনিমার বেশ পছন্দের। Bewitched টা তাই খুব শিগগিরই প্রিয় হয়ে উঠেছিল তার। Class ৯, সামনে board exam, অরুনিমার মাঝে মাঝেই তখন witch হবার ইচ্ছে হতো। কি সুন্দর (ঝাড়ু নিয়ে) এদিক ওদিক যাওয়া যায়, আর সবথেকে সুবিধা, -পরীক্ষায় না পড়েই নম্বর পাওয়া। তখন তার সবসময় মনে হতো, “ইস, যদি একটি ঝাড়ুতে সওয়ার হয়ে witch হতে পারতাম রে।
ভাবতে ভাবতে অরুণিমার ১৯৯৮ র এক দুপুরের কথা মনে পড়ে গেলো - অরুনিমা school থেকে এসে ভাত খেতে বসে, মাকে বলেই ফেললো তার witch, মানে ডাইনি হওয়ার ইচ্ছে। মেয়ের ডাইনি হওয়ার ইচ্ছে শুনে, পারুল তো অবাক। তবে ডাইনি হয়ে না পড়ে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যাপারটা বেশ মজার লাগলো তার। হঠাৎ এই ডাইনির প্রসঙ্গ ওঠায় পারুলের তার ছোটবেলার একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো। পারুল সেদিন অরুনিমাকে একটি সত্যিকারের ডাইনির গল্প শোনালো।
৫০ দশকের মালদার এক গ্রামের গল্প। পারুল মালদার এক ছোট্ট গ্রামে বড় হয়ে উঠেছে। তখন পারুলের বয়স পাঁচ কি ছয়। একদিন পারুল তার মায়ের সাথে কলতলায় জল আনতে গিয়ে এক অচেনা মহিলা কে দেখতে পায়। এই মহিলাকে সে আগে কোনোদিন দেখেনি। মহিলাকে দেখে পারুলের একটু অন্যরকম লেগেছিলো। একটু বললে ভুল হবে, বেশ অনেক খানি। সেই মহিলা পারুলের গ্রামের আর অন্য জেঠিমা কাকিমা দের মতন করে শাড়ি পরে নি। তার সাজটাও অন্যরকম ছিল। সেটাই পারুলের সবার আগে চোখে পড়েছিল। পারুলের তার শাড়িটা বেশ ভালো লেগেছিলো। কি সুন্দর ছবিতে দেখা জাপানি হাত পাখার মতন সামনে ভাঁজ-ভাঁজ করা। মাথায় ঘোমটা ছিল না বলে মুখখানা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিলো। কপালে সিঁদুরের টিপের জায়গায় ঘন কালো চুল কপালে পড়ছিলো আর চুলের ফাঁকে এক চিলতে সিঁদুর উঁকি মারছিলো। গ্রামের অন্য কাকিমাদের ও ঘোমটা ছাড়া কখনো দেখেনি। তাই এই মহিলাকে তার সত্যি একেবারে অন্যরকম লেগেছিলো।
মহিলা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল আর পারুলের মা জল ভরছিল । পারুল সেই মহিলার দিকেই তাকিয়ে ছিল। সে খেয়াল করেছিল যে তার মা সে মহিলার সাথে কোনো কথা বলে নি। এমনিতে কিন্তু মা কল তলায় দাঁড়িয়ে অন্যদের সাথে বেশ কথা বলে। কিন্তু সেদিন কেন বললো না, পারুলের ছোট্ট মাথায় সে কথা সেদিন ঢোকে নি। কিছুক্ষন পর মহিলা পারুল কে ওর নাম ও class জিজ্ঞেস করেছিল। পারুল মায়ের দিকে তাকিয়ে চুপ করে ছিল। সেদিন সে ওই মহিলা কে তার নাম ও বলেনি ও কোন class এ পড়ে তাও বলে নি। কি করেই বা বলবে ? পারুল তো তখন school এ যাওয়া শুরুই করে নি। আর এর আগে গ্রামে ওকে স্কুল এ যাওয়ার কথা কেউ জিজ্ঞেস করে নি। ওর বাকি বন্ধুরাও কেউ school এ যেত না। রান্না বাটি খেলেই বেশ দিন কাটছিলো তাদের। মা বাবাও কোনোদিন বলেনি school এ যেতে। কিন্তু আজ যখন এই মহিলার প্রশ্নের উত্তর তার জানা ছিল না, তখন তার মনে হলো school এ যাবার কথা। পারুলের মনে হলো school হয়তো গেলে ও সেই নতুন কাকিমার সাথে কথা বলতে পারবে।
সেদিন সন্ধে বেলা বাবা বাড়ি ফিরতেই পারুল school এ যাবার বায়না ধরে বসলো। পরদিনই সে গ্রামের school এ ভর্তি হলো। school এ খুব বেশি মেয়ে ছিল না, তাই পারুলের মেয়ে বন্ধু বলতে সেই দু'একজন। School এ ভর্তি হবার পরের দিনই সন্ধে বেলা আবার মায়ের সাথে কল তলায় গেলো। অপেক্ষায় ছিল কখন সেই নতুন মহিলার সাথে দেখা হবে। এবার দেখা হলেই সে বলতে পারবে তার কোন class । সেদিন মহিলা আর এলো না। তারপর দুদিন চলে গেলো, কিন্তু সেই মহিলার সাথে পারুলের আর দেখা হলো না।
সপ্তাহ খানেক বাদে পারুল মাকে সেই মহিলার কথা জিজ্ঞেস করলো। মা তো প্রথমটায় বুঝতেই পারে নি। যখন বুঝতে পারলো, মায়ের মুখ টা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছিলো। মা পারুলের গায়ে কপালে হাত দিয়ে দেখলো জ্বর আছে কিনা, তারপর দুদিন school এও যেতে দিলো না। বাড়িতে ওঝাও আনা হয়েছিল। পারুলের মা র ভীষণ দুশ্চিন্তা ছিল যে পারুল ওই মহিলার কথা মনে রাখছে। মা সেদিন পারুল কে বলেছিলো, "পারুল, ওই মহিলার কথা মুখেও আনবি না। ও এক ডাইনি। " পারুল ডাইনি মানে সেদিন বুঝতে পারেনি। কিন্তু এইটুকু বুঝতে পেরেছিলো যে সেই মহিলার কথা জানতে চাইলে পারুলের school এ যাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই তারপর থেকে সে আর কোনোদিন সেই মহিলার কথা জিজ্ঞেস করে নি। তারপর অবশ্য পারুল আর কোনোদিন সেই মহিলাকে গ্রামে দেখতেও পায়নি।
কিছু বছর পর পারুল যখন স্কুল শেষ করে college যাবে তখন পারুলের জন্য পাত্র দেখা শুরু হয়ে গেছে। পারুলের সেই সময় বিয়ে করার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু ওর অন্য বন্ধুদের সবার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। তার মানে ওর ও বিয়ের সময় হয়ে গেছে । তাছাড়া, কোনো মেয়ের যে বিয়ের ইচ্ছে নাও থাকতে পারে, সেই সময় পারুলের সেটা জানাই ছিল না। ও এমন কোনো মহিলাকে চিনতো না যে বিয়ে করে নি। তাই বিয়ে না করার ইচ্ছে টা সে কিশোর মনের অদ্ভুত এক খামখেয়ালি অনুভূতি ভেবে কোনোদিন কাউকে প্রকাশ ও করে নি।
পারুলের মায়ের অবশ্য পারুলকে কলেজে পড়াবার কোনো ইচ্ছে ছিল না। বাবা বলেছিলো যতদিন পাত্র না পাওয়া যায় , ততদিন পড়ুক। তারপর পাত্র ঠিক হলে নাহয় ছেড়ে দেবে। এই সুযোগে পারুল শহরে ওর কাকার বাড়িতে বিয়ের আগে ক'টা দিন কাটিয়ে আসতে পারবে। এই প্রস্তাবে মা রাজি হয়েছিল। পারুলের College এ এডমিশন এর কথা চলছে। এমন সময় একদিন সে আবার ওই মহিলার কথা ওর মনে পড়লো। মাকে সাহস করে জিজ্ঞেস করলো। পারুল বড় হয়েছে, এখন ওর বিয়ে হবে তাই মা তাকে সব খুলে বললো। মায়ের কথা গুলো পারুলের আজও মনে আছে। মা বলেছিলো সেই মহিলা ছিল গ্রামের ওপর এক কালো ছায়া - এক ডাইনি। সে বাড়িতে বৌ হয়ে আসার পর তার শ্বশুর শাশুড়ি দুজনেই এক বছরের মধ্যে মারা যায়। সে তার একমাত্র ননদ কে শশুর বাড়ির অমতে শহরে পড়তে যেতে সাহায্য করে। সে নিজে গ্রামের গুরুজন দের আজ্ঞা অমান্য করে শহরে কলেজ এ পড়তে যাওয়া শুরু করে। সে গ্রামের কোনো নিয়ম মানতে চাইতো না। মন্দিরের অন্দর-কক্ষে মেয়েদের যাওয়া মানা ছিল। সেই মহিলা ওখানেও চলে গিয়েছিলো। এরকমও নাকি শোনা গেছিলো যে ওই মহিলা কারো বাড়ি গেলে নাকি সেই বাড়িতে জ্বর-জ্বালা শুরু হতো। এতো সব শোনার পর গ্রামের গুরুজনরা তাকে গ্রাম ছাড়া করেছিল। এত কিছুর হওয়ার পরেও, তার স্বামী কিন্তু তাকে ছাড়েনি। বৌয়ের সাথে সেও গ্রাম ছেড়ে চলে গেছিলো। তারপর তাদের খবর আর কেউ জানে না। মায়ের কাছে এইসব শোনার পর পারুলের মনে অনেক প্রশ্ন এসেছিলো, কিন্তু তার মনে হয়নি যে সে ওর উত্তর গুলো মায়ের কাছে পাবে। তাই আর কোনো প্রশ্ন করে নি।
মাসখানেক পর পারুল কলেজে পড়া শুরু করলো। তখন তার বিয়ে প্রায় ঠিক হয়ে গেছে। যতদিন বিয়ে না হয়, ততদিন কলেজে ক্লাস করবে এই ঠিক হলো। বিয়ের পর কলেজে যাবে কিনা সেটা শ্বশুর বাড়ির ইচ্ছের ওপর। কলেজ টা শেষ নাও হতে পারে,
প্রথম দিন কলেজ যাবার সময় একটা অন্যরকম খুশি পারুল অনুভব করলো। তার অনেক দিনের কলেজ যাবার ইচ্ছা পুরো হওয়ার খুশি । কলেজ পৌঁছে দেখলো আবার সেই এক - ছাত্রীর সংখ্যা বেশ কম। পারুল অবশ্য এটাতে অভ্যস্ত। এক এক করে ক্লাস চললো, শেষে ভূগোল। ভূগোলের professor ঢুকতেই সবাই বেশ চুপ করে গেলো। পারুল মাথা ফেরাতেই দেখলো যে ইনি অধ্যাপক নন - অধ্যাপিকা। এক মাথা চুলে এক চিলতে সিঁদুর পরা তাদের ভূগোলের অধ্যাপিকা। পারুলের হঠাৎ সেই কলতলার মহিলার কথা মনে পড়ে গেলো। আজ আর সে কোনো প্রশ্ন মনে রেখে দিলো না। class শেষ হতেই ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো – ও জানতে পারলো তার মায়ের সেই ডাইনি, আজ পারুলের অধ্যাপিকা।
গল্প শেষ হলো, অরুণিমার ভাত ও শেষ হলো। পারুল অরুনিমা কে বললো "কি বুঝলি? নিজের ইচ্ছেটাই ডাইনির ঝাড়ু, বুঝলি? এইবার তুই তোর ঝাড়ু বানিয়ে ফেল আর witch হয়ে ডানা মেলে আকাশে উড়ে বেড়া।"
২০২০ র বিকেলে ফিরে এলো অরুনিমা।
অরুনিমা আর সন্দীপের ৭ বছর হলো বিয়ে হয়েছে। অরুনিমা পেশায় ডাক্তার। বেশ নাম করা ডাক্তার বললে ভুল হবে না। লোকে অরুনিমা কে magician ই বলে। Magic টা তার সবসময় বেশ প্রিয় তাই সেটা সে ছাড়ে নি। ৭ বছর বিয়ে হয়ে গেলো এবার সবার একটাই প্রশ্ন - 'Good news' কবে।
'Good news' টা অরুনিমার অবশ্য Good বলে মনে হয়না। সত্যি বলতে, অরুনিমার মা হবার সেরকম ইচ্ছে নেই । কিন্তু এরকম ইচ্ছা কি হওয়া উচিত ? অরুনিমাকে এটা ভীষণ ভাবায়। তার মোটামোটি সব বন্ধুরাই মা হয়ে সংসার করছে। সেটাই তো নাকি সংসারের নিয়ম। তার মধ্যে আসে পাশে কাকিমাদের, মাসি পিসিদের প্রশ্ন বেড়েই চলেছে। সন্দীপের ও সেরকম ইচ্ছে নেই। তবে সন্দীপ কে বেশি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় না। Somehow এই প্রশ্ন গুলো অরুনিমাকেই face করতে হয়। অরুনিমা তার এই ইচ্ছের কথা নিজের মাকে এক দুবার বলেওছে । কিন্তু পারুল সেটা অরুনিমার খামখেয়ালি মন ভেবে পাত্তা দেয় নি।
গতবছর অরুনিমা accidentally pregnant হয়েছিল। কিন্তু সেই news তা তার নিজের একটুও good বলে মনে হয় নি। বরং হঠাৎ মনে হয়েছিল সে যেন বেঁধে গেলো। অনেক স্বপ্ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এই সব ভেবে তার মোটেই মা হওয়ার ইচ্ছে হয় নি। তাই সে pregnancy তা নিয়ে এগোয় নি। মাকে এটা জানবার সাহস হয় নি। Infact কেউ জানে না। অরুনিমা নিজের সবচেয়ে কাছের বন্ধুকেও অনেক বার বলতে গিয়েও বলে নি। এটা বলাটা ভুল হবে যে অরুনিমা তার সেই decision তা নিয়ে পরে কখনো ভাবে নি, অনেকবার ভেবেছে , তবে তার কোনোদিন সেটা নিয়ে regret হয় নি। একবার ও মনে হয় নি সে কোনো ভুল করেছে।
তার ইচ্ছে হয় নি, তাই সে এগোয় নি।
ঠিক যেমন সেই কলতলার মহিলার মন্দিরের অন্দর কক্ষে যেতে ইচ্ছে করেছিল, college যেতে ইচ্ছে করেছিল, অধ্যাপিকা হতে ইচ্ছে করেছিল ঠিক সেই রকম 'ইচ্ছে'। এই সব ভাবতে ভাবতে অরুনিমার হঠাৎ মনে হলো সব যুগেই হয়তো ডাইনি জন্মায়। নিজের ইচ্ছে ঝাড়ুতে বেঁধে উড়ে বেড়ায়। এই যুগের ডাইনি হয়তো সে। যাক ছোটবেলার ডাইনি হবার স্বপ্ন টা তাহলে পূর্ণ হলো। এই ভেবে খুশি হয়ে ডানা মেলে Bewitched দেখতে লাগলো।