রবিবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

মাছভাজা

মাছভাজা

সেদিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই শুনি বাইরে বেশ হইচই হচ্ছে।  দরজা খুলে শুনি আমার দুই প্রতিবেশিনীর  উচ্চৈ স্বরে বাগযুদ্ধ চলছে।  একতলার বেলা বোসের সঙ্গে দোতলার রুবি রায় এর প্রচন্ড কথা কাটাকাটি হচ্ছে।  কলকাতার মধ্যবিত্ত আবাসনের দুই জন শিক্ষিতা এবং আধুনিক মহিলার এহেনো অভাবনীয় বাক্য বিনিময় খুবই অসঙ্গত লাগছিলো।  ঝগড়ার বিষয়টা ভালো করে শুনবার জন্য একটু কান খাড়া করলাম।  একজনের মুখে তোমার "Tom" আর আরেকজনের মুখে তোমার "Jerry" এই শব্দ গুলি বুঝতে পারছিলাম।

সকলের অবগতির জন্য জানাই Tom  হলো রুবি রায়ের কুচকুচে কালো রঙের Labrador আর Jerry  হলো বেলা বোসের সাদা ধবধবে অদূরে হুলো। আবাসনের বাচ্চারাই ওদের দুজনের নাম করণ করেছে। Tom  অরে Jerry র মধ্যে কোনো বিবাদ ছিল না। বিকেল বেলা রুবি রায় যখন Tom কে নিয়ে নিচের swimming pool  এর চারপাশে হাঁটেন তখন Jerry  ওর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে Tom এর পাশে পাশে বন্ধুর মতন হাঁটতে থাকে।  শান্ত স্বভাবের Tom  কখনো ঘেউ ঘেউ করে Jerry  কে ধমকায় নি। কুকুর অরে বেড়ালে বন্ধুত্ব এমন বিরল। আবাসনের সব বাচ্চারাও ওদের দুজনের খুব বন্ধু ছিল।  এমন শান্তিময় পরিবেশে Tom  অরে Jerry কে নিয়ে সকাল বেলায় কি অশান্তি হলো ভেবে একটু চিন্তান্বিত হয়ে পরলাম।

এমন সময় আমার Helping  Hand  মায়া দির আগমন।  ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম আজ পাক্কা কুড়ি মিনিট লেট।  আজ আর রাগ দেখলাম না।  কারণ নিচের ঘটনার প্রত্যক্ষ দর্শী মায়া দির কাছ থেকে এখন আমাকে সব জানতে হবে।  তাই আজ লেট করাটা যেন লক্ষ্যই করলাম না।

মায়া দি প্রথমেই "জানো বৌদি" বলেই একমিনিটের নাটকীয় নিস্তব্ধতা নিয়ে রান্না ঘরের বাসন ভর্তি sink  এর সামনে দাড়িয়ে বাসনের পরিমাণ দেখে ভুরুটা কুঁচকে ফেললো।  গলায় হালকা বিরক্তির ছোঁয়া লাগিয়ে বললো "উফ বৌদি আজকেও তুমি দু দুটো বড় করাই বের করেছো ?"

বুঝলাম অন্যায় হয়ে গেছে।  একটা কড়াই আমার রাতেই মেজে রাখা উচিত ছিল। এখানে অলিখিত নিয়ম তৈরী হয়েছে যে অন্যান্য ছোটোখাটো বাসনের সঙ্গে একটা করাই, একটা Pressure  cooker  আর একটা ভাত রাধার বাসনই মাজতে দেওয়া যাবে। তাড়াতাড়ি বললাম কষ্ট  হলে একটা করাই মাজতে হবে না। আমার কৌতূহল তখন উথলে উঠছে।

মায়া দি এবার নাটকের প্রথম অংকের আবহ সংগীতের মত বেশ শব্দ করেই বেসিন এ কড়াই মাজতে শুরু করেছে।  আর থাকতে না পেরে আমার শহুরে সংস্কৃতির মাথা খেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম "নিচে এতো চেঁচামেচি কিসের গো মায়া দি ?"

মায়া দি এবার আবহসংগীত বন্ধ করে বেসিন এর কলে হাত ধুয়ে পাক্কা আরো দু মিনিট চুপ থেকে তারপর রান্নাঘরের দরজার কাছে এসে বললো "আর কি ? নিচে কুকুর বেড়াল নিয়ে কুরুক্ষেত্তর হচ্ছে।"

তারপর প্রত্যক্ষ দর্শী মায়া দি ধারা বিবরণী শুনে যা বুঝলাম তা হলো গতকাল রবিবার রুবি দির স্বামী বারেন বাবু বাজার থেকে দেড় হাজার টাকা কেজিদরে দুখানা বড়ো বড়ো ইলিশ মাছ এনেছিলেন।  রুবি দির রান্নার মাসি কল্পনা ডিমওয়ালা মাছের পেটি ভাজা। গাদার মাছের সর্ষে ভাঁপে আর মাথা দিয়ে কচুর শাক রান্না করেছিল।

সেই সময় একতলার বেলা দির বেড়াল Jerry দোতলার রুবি দির ঘরে ঢুকে পড়েছিল।  কখনো কখনো Flat  এর দরজা খোলা থাকলে Jerry  বন্ধু Tom  এর বাড়িতে ঢুকে পরে। Jerry  আসলে Tom খুব আনন্দ প্রকাশ করে। দুই বন্ধু বসার ঘরে carpet  এর ওপর বসে বসে TV র Serial গুলো দেখতে থাকে। কারণ ররুবি দ ও সকাল থেকে TV  খুলে serial  দেখে।

গতকালও Tom আর Jerry TV দেখছিলো, কল্পনা রান্না করছিলো।  রুবি দির একমাত্র ছেলে বিট্টু ও ঘরে বসে বাবাবার কাছে অঙ্ক করছিলো। বিট্টু ক্লাস ৯ এর খুব মেধাবী ছাত্র। আর ওর বাবা বারীন বাবু স্থানীয় ছেলেদের স্কুলের ছাত্রদের প্রিয় অংকের মাস্টার মশাই। এই অবস্থায় রুবি দি বারীন বাবু কে দোকান থেকে এক liter cold drinks আনতে বলে স্নান করতে ঢুকলেন আর বারীন বাবু cold  drinks আনতে বেরোলেন।

এর পর রুবি দি স্নান করে বেরিয়ে দেখেন Tom  একই TV দেখছে Jerry নেই। কল্পনা রান্না করে চলে গেছে আর বিট্টুও ঘরে নেই।  রুবি রান্না করা খাবার গুলো টেবিল এ এনে রাখবেন বলে রান্নাঘরে ঢুকলেন। হঠাৎ নজরে পড়লো মাছ ভাঁজ রাখা বাসনের ঢাকনা তা খোলা। ভালো করে লক্ষ করে দেখলেন সবচেয়ে বড়ো ডিমওয়ালা ইলিশ মাছের পেটিটা থালায় নেই। বারবার গুনলেন, ১০টা পেটি ভাজতে দিয়েছিলেন, এখন ৯টা ভাঁজ মাছ রয়েছে।  রুবি দি খুবই আশ্চর্য হলেন।  কোথায় গেলো একটা মাছভাজা ?

ইতিমধ্যে বীরেন বাবু cold  drinks  কিনে ফিরে এসেছেন।  রুবি দি খুব উত্তেজিত ভাবে বীরেন বাবু কে মাছ ভাজা নিরুদ্দেশের কথা জানালেন।  বীরেন বাবু ততোধিক শান্ত ভাবে বললেন তোমার বোধয় কল্পনাকে বলতে ভুল হয়েছে।  কাল ওকে জিজ্ঞাসা করো।

রুবি দির মাথায় সেদিন সারাদিন সারারাত শুধু মাছ ভাজার চিন্তাই ঘুরতে থাকলো।  সকাল বেলা ৭ টার সময় বীরেন বাবু বিট্টু কে নিয়ে স্কুল এ বেরিয়ে গেলেন তারপরেই কল্পনা এলো।  রুবি দি কল্পনাকে জিজ্ঞাসা করলেন একটা মাছভাজা কম কেন।  কল্পনা বলে সে কিছু জানে না।  সব রান্না সেরে গুছিয়ে রেখে চলে গেছে।  তবে Jerry  কাল কয়েকবার TV  দেখা ছেরে রান্না ঘরের দিকে এসেছিলো।  বোধয় ইলিশ মাছের গন্ধেই এসেছিলো।  কল্পনা দি ছিল বলে রান্না ঘরে ঢুকতে পারে নি।

এটা আগুনে ঘৃতাহুতি হলো।  রুবি দি প্রথমে Tom কে একপ্রস্থ বকাঝকা করলেন, "আর যদি কখনো দেখেছি, তুমি ওই হলো বেড়ালটার সঙ্গে মিশেছ। আর ওকে আমার বাড়িতে ঢুকতে দিয়েছো।  তুমি একটা মাছ চোরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছো ? উচ্ছনে যাচ্ছ, ইত্যাদি। " বিট্টু কে শাসন করার সময় ওর বন্ধুদের সম্বন্ধে যা যা বলেন, শুধু বাবা-মায়ের নাম ডোবাবে আর বড়ো হয়ে চায়ের দোকান দেবে এই কথাগুলো বাদ গেলো।

এর পর রুবি দি তড়িৎ গতিতে এক তলায় অবতরণ করে সোজা বেলা দির দরজার বেল বাজান।  বেলা দি অসময়ে রুবি দি কে দেখে খুব আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করেন "কি ব্যাপার রুবি দি ? এতো সকালে কি হয়েছে ?"

এতেই রুবি দির Visuvious  এর অগ্ন্যুদ্গম। "কি হয়েছে ? তোমার Jerry  কাল আমার রান্নাঘরে ঢুকে ইলিশ মাছ চুরি করে খেয়েছে। কি বড়ো size  এর ডিমওয়ালা পেটি ছিল। " রুবি দির গলায় কান্নার সুর।

এবার বেলা দির গলায় ও Fujiyama  র অগ্নুপাত। "কি বাজে কথা বলছো রুবি দি।  আমার Jerry  সোনা কখনো এমন কাজ করতে পারে না।  ও মোটেও হ্যাংলা নয়।  ওর বাড়িতে কি মাছ ভাতের আকাল পড়েছে  যে আপনার বাড়িতে খেতে যাবে ? তাছাড়া ওই কাঁটাঅলা ইলিশ মাছ তো ও খাবেই না।  ওর বাবা ওর জন্য বাজার থেকে রোজ ভেটকি মাছের fillet আনে।  আর ও রোজ এক liter Amul milk  খায়। আপনার বাড়ির খাবার ওর মুখেই রুচবে না। "

বেলা দির এই সব কথায় রুবি দি যথেষ্ট অপমানিত বোধ করেন। উচ্চৈস্বরে বলেন "কি বললে ? আমাদের বাড়ির খাবার ওর মুখে রুচবে না ? যদি আর কোনোদিন তোমার ওই হুলো আমাদের বাড়িতে গেছে তবে ঠ্যাং ভেঙে রেখে দেব।  তোমার হুলো কে সামলে রাখবে।

চেঁচামেচি শুনে আবাসনের security ছুটে আসে কিন্তু দুই মহিলার মুখনিঃসৃত জ্বলন্ত অগ্ন্যুদ্গমএর মতন ভাষা থামানোর জন্য কি করা উচিত বুঝতে পারছিলো না। ওদের agency র guidebook  এ এ বিষয়ে কিছু লেখা নেই।  দমকল না police কাকে খবর দেবে ঠিক করতে পারছিলো না।

এমন সময় রুবি দির flat  থেকে কল্পনা অকুস্থলে প্রবেশ করে এবং খুব উত্তেজিত ভাবে রুবি দি কে বলে "বৌদি তোমাদের tom  এর আজ কি হয়েছে বোলো তো ? সকাল থেকে শুধু ঘেউ ঘেউ করতে লেগেছে ? রান্না ঘরের সামনে এসে চিৎকার করছে। Tom কি পাগোল হয়ে গেলো ?" এই বলে কল্পনা gate  এর বাইরে।

এতক্ষণ Jerry  র মাছ চুরির ঘটনা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে Tom এর পাগল হয়ে যাবার দিকে ঘুরে যেতেই বেলা দির আবার গর্জণ, "যাও যাও এবার কুকুর টাকে বাড়িতে বেঁধে রাখো। পাগলা কুকুর নিয়ে আর নিচে নামবে না। আজি সেক্রেটারি কে বলবো একটা meeting ডাকতে।  পাগল কুকুর আবাসনে রাখা চলবে না। "

এই ঘটনায় হতবুদ্ধি রুবি দি পরাজিত সৌনিকের মতো ওপরে উঠের আসেন। আর আবাসনে Tom  কে নিয়ে আতঙ্ক তৈরী হলো।  রুবি দির ফ্লাট এ প্রায় সারাদিন ই Tom  এর ঘেউ ঘেউ শোনা যাচ্ছিলো।

বিকাল বেলা বারীন বাবু স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলেই রুবি দি ওনাকে Jerry র মাছ চুরি করা, তা নিয়ে বেলা দির সাথে ঝামেলা আর Tom  এর সারাদিন ধরে ঘেউ ঘেউ করা সবই জানালেন। বারীন বাবু সব শুনে বললেন Tom  এর নিশ্চয় শরীর খারাপ হয়েছে, তাই অত ঘেউ ঘেউ করছে।  আমি ওকে সন্ধ্যা বেলা dogs  clinic এ নিয়ে যাবো।

এর পর প্রায় সন্ধ্যা বেলা বিট্টু স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলো। রুবি দি রাগত স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, "কি রে আজ এতো দেরি করে বাড়ি ফিরলি যে ? কোথায় গিয়েছিলি ?"

"স্কুলে football  match  ছিল" এই কথা বলে ক্লান্ত বিট্টু নিজের ঘরে ঢুকে গেলো।  অন্যদিন স্কুল থেকে ফিরে কোনো রকমে স্কুল uniform ছেড়ে হাত পা ধুয়ে খাবার টেবিল এ এসে বসে।  আজ আর কোনো সারা শব্দ নেই। রুবি দি আপন মনে গজগজ করে চলেছেন। বারীন বাবু ব্যাপারটা লক্ষ করে বিট্টুর ঘরে গিয়ে বললেন, "বিট্টু ঘর অন্ধকার করে বসে আছিস কেন ? মন খারাপ ? কিছু হয়েছে বন্ধুদের সাথে ?"

বিট্টু বিষন্ন গলায় বলে "বন্ধুদের সঙ্গে কিছু হয় নি বাবা।"

বারীন বাবু বলেন, "বিট্টু, মা জলখাবার করেছেন, তুমি খেয়ে নাও। তারপর Tom  কে নিয়ে আমাকে একটু ডাক্তার বাবুর কাছে যেতে হবে।

বিট্টু জিজ্ঞাসা করে "সেকি বাবা, Tom  এর কি হয়েছে ?"

বারীন বাবু বলেন "ওর বোধয় শরীর খারাপ হয়েছে। আজ কল্পনা কে ঘেউ ঘেউ করে তারা করেছে। কল্পনা কাজ না করেই চলে গেছে। ও তো এমন করে না। আর সবাই ওকে পাগল ভাবছে। "

বিট্টু শুনে চুপ করে থাকলো। তারপর বললো, "বাবা আমিও তোমার সঙ্গে যাবো।"

Dogs Clinic  আমাদের আবাসন থেকে খুব দূরে নয়। বিট্টুর তার বাবার সঙ্গে Tom  কে নিয়ে ডাক্তারের কাছে চললো। কিছু দূর যাবার পরেই বিট্টু Tom কে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।

বারীন বাবু একটু অবাক হয়ে বললেন "কি হলো বিট্টু ?"

বিট্টু বললো "বাবা Tom  কিন্তু পাগল হয়ে যায় নি। ও একদম সুস্থ, ওর কোনো শরীর খারাপ হয় নি। "

বারীন বাবু বললেন "তুই কি করে বুঝলি ? ও আজ ঘেউ ঘেউ করে কল্পনা কে তারা করে গেছে।  নিশ্চয় এর শরীর খারাপ। "

"না বাবা, কল্পনা দি কাল না বলে লুকিয়ে ইলিশ মাছ ভাজা নিয়ে গেছে। সেটা Tom বুঝতে পেরেছে। তাই রেগে গিয়ে কল্পনা দি কে ঘেউ ঘেউ করেছে।"

বারীন বাবু বললেন, "ছি বিট্টু, তুই না দেখেই কল্পনাদি কে এমন একটা খারাপ সন্দেহ করছিস ? তোর মায়ের কানে এই কথা গেলে তুই জানিস আমাদের বাড়িতে কল্পনা দির কাজ তা আর থাকবে না।"

বিট্টু বললো "বাবা বিশ্বাস করো আমি মিথ্যা কথা বলছি না। গতকাল দুপুর বেলা খাবার সময় ভাজা  মাছ কম বলে মা যখন রাগারাগি করছিলো তখন তোমার মতন আমিও ভেবেছিলাম মা হিসাবে কোনো ভুল করেছে। কিন্তু আজ বিকালে বিশুর কাছে সত্যি কথাটা জানতে পেরেছি। "

বারীন বাবু অবাক হয়ে বলেন "বিশু মানে কল্পনার ছেলে ? ও তো তোর কাছে মাঝে মাঝে ইংরেজি পড়তে আসে। "

"হ্যা বাবা, বিশু খুব ভালো ছেলে।  ওদের ক্লাস এর first  boy . খুব সুন্দর ছবি আঁকে। আর আমাদের স্কুল এর football  team  এর সেরা striker . আজ interschool football  ফাইনাল এ বিশু একাই তিনটে গোল দিয়ে আমাদের স্কুল কে champion করেছে। খেলার শেষে বিশুর সাইকেল এর পিছনে চেপে বাড়ি ফিরছিলাম তখন বিশু আমাকে বললো "বিট্টু দা গতকাল কাকিমা আমার জন্য যে ডিমওয়ালা ইলিশ মাছ ভাজা পাঠিয়েছিল সেটা এত ভালো খেতে।  আমি অতবড় ডিমওয়ালা ইলিশ মাছ কোনোদিন খাই নি। বাবা মারা যাবে পরে ঘর ভাড়া, আমার tution  এর খরচ আর ভাত ডালের খরচ জোগাতে মা হিমশিম খায়। ইলিশ মাছ খাবো কথা থেকে। "

বাবা আমি বুঝতে পারলাম অতগুলো মাছ দেখে কল্পনা দির বিশুর কথা মনে পড়েছে। কিন্তু জানো তো, মা কখনো কোনো ভালো খাবার কল্পনা দি কে দেয় না। তাই কল্পনা দি এই অন্যায় কাজ তা করে ফেলেছে।  আর Jerry র নামে দোষ  দিয়েছে। মা তো রেগে গেলে আর মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে না তাই কল্পনা দির কথায় বেলা মাসির সঙ্গে সকাল বেলায় প্রচন্ড ঝগড়া করেছে। আর Jerry  কে Tom  এর সঙ্গে খেলতে দেবে না বলেছে। কি বিশ্রী একটা ব্যাপার হলো বোলো তো বাবা। কি করলে যে সব আবার ঠিক হবে। মাকে তো সত্যি কথাটা বলাই যাবে না। "

বারীন বাবু এতক্ষন বিট্টুর মনের আবেগ মাখানো কষ্টের কথা শুনছিলেন।  জীবনে প্রথম অতিবিশ্বাসী  মানুষের অবিশ্বাসী হয়ে ওঠার ঘটনা ওর কাছে একটা বড়ো ধাক্কা। বিট্টু এই প্রথম জানলো আধুনিক পৃথিবীর এক সামাজিক আর অর্থনৈতিক বিবর্তনবাদ যাতে একজন মানুষ টেবিল এ তিন টুকরো ভাজা মাছ অর্ধেক অর্ধেক খেয়ে ফেলে যায় আর কেউ বা একটুকরো মাছ চুরি করে সন্তানের মুখে তোলে। শুরু হলো বিট্টুর গদ্যময় পৃথিবীকে দেখা।

বীরেন বাবু বিট্টুর মাথায় পরম আদরে হাত বুলিয়ে দেন তারপর বলেন "বিট্টু, কাল থেকে আজ পর্যন্ত যে এতগুলি ভুল ঘটনা ঘটে গেলো সেটাতো তোকেই  ঠিক করতে হবে শেষ ভুলটা করে। "

বিট্টু অবাক হয়ে গেলো "আমাকে ভুল করতে হবে ? তাও তুমি বলছো বাবা ? তুমি তো কোনোদিন জেনেশুনে কাউকে ভুল করতে বলো নি। "

বারীন বাবু বললেন "দেখ বিট্টু কল্পনার মাতৃ স্নেহ ওকে চুরি করে ছেলের জন্য মাছ নিতে বলেছে। এই ভুলটা কল্পনা মরিয়া হয়ে করেছে। এখনও fridge এ অনেক মাছ আছে। কল্পনা কাল সকাল থেকে অনেক গুলো মাছ রান্না করেছিল। মা যদি একবারও ওর বাচ্ছাটার জন্য এক টুকরো মাছ দিতো তাহলে ও হয়তো এটা করতো না। মা কিন্তু কোনো অন্যায় করে নি।  কারণ কল্পনার সঙ্গে কাজের চুক্তি তে ওকে কোনো খাবার দেবার কথা নেই। কিন্তু এটা ভুল। যেদিন কোনো ভালো জিনিস রান্না হয় তার থেকে কল্পনার বছর জন্য সামান্য কিছু দিলে আমাদের কারো ভাগে কি কম পরবে ? আমরা যে মাঝে মাঝে restaurant  এ খেতে গিয়ে বেয়ারা কে tips দেই সেটা কিন্তু চুক্তি তে নেই। এটা তার service  এর বিনিময় আমার token কৃতজ্ঞতা। বুঝলি কিছু বাবার এই গম্ভীর কথা গুলি ?"

বিট্টু বলে "কিছুটা বুঝেছি বাবা। এবার বোলো আমাকে কি ভুল কাজ করতে হবে ?"

বারীন বাবু হাসতে হাসতে বলেন "তোকে কল্পনার দোষ টা নিজের ঘাড়ে নিয়ে সকালে মাকে বলতে হবে যে মাছ টা তুই খেয়েছিস। বাকি টা আমি সামলে নেবো। এবার তাড়াতাড়ি ডাক্তার বাবুর কাছে চল। Tom  এর একবার checkup হয়ে যাবে আর ওকে নিয়ে সবার ভয় টাও কাটবে।

Football  champion হয়েছে বলে পরের দিন বিট্টুর স্কুল ছুটি। আর বারীন বাবুল আজ একটু দেরি করে বেরোবেন। সকাল বেলা bell  বাজানোর শব্দে বারীন বাবু দরজা খুলে দেখলেন কল্পনা। বারীন বাবু বললেন "এস কল্পনা, আজ আর তোমাকে Tom  কিছু বলতে না। আজ ওর মাথা ঠান্ডা আছে। আর মাছ চোর ধরা পড়েছে। "

কল্পনা প্রচন্ড চমকে উঠের বিস্ফারিত দৃষ্টি তে বারীন বাবুর দিকে তাকিয়ে থাকে। রুবি দি রান্না ঘর থেকে ছিটকে বাইরে বেরিয়ে এসে বারীন বাবু কে বলেন, "কে মাছ চুরি করেছে ? তুমি সব জানতে ?Jerry  চুরি করে নি ?"

বারীন বাবু বলেন "তুমি শুধু শুধু Jerry  কে চোর ভেবে বেলা দির সাথে বিশ্রী ঝগড়া করে এলে।  আজ গিয়ে মিটমাট করে এস। আর Jerry  কে ওপরে Tom  এর কাছে পাঠিয়ে দিতে বোলো। Please  রুবি দুটো অবলা প্রাণীর সুন্দর বন্ধুত্ব তোমরা নষ্ট করো না। "

রুবি কি অধৈর্য হয়ে বলেন "ঠিক আছে আমি বেলা দির কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবো।  কিন্তু চোর টা কে ? মাছ টা কে খেলো ?"

বারীন বাবু হাসতে হাসতে বলেন "দাঁড়াও দাঁড়াও অত ব্যস্ত হলে চলে ?" তারপর আতঙ্কিত কল্পনার মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন "কি হলো কল্পনা তুমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে কেন ? রান্না ঘরে গিয়ে এক কাপ ভালো করে চা করো দেখি "

কল্পনা প্রায় টলতে টলতে রান্নাঘরে ঢোকে।  এমন সময় বিট্টু মাথা নিচু করে drawing room  এ এলো।  বারীন বাবু বলেন "এবার বিট্টু, কাল আমাকে যা বলেছিলে সেই সত্যি কথাটা মাকে এবার বলে দাও।  অনেক জট পাকিয়ে গেছে। এবার জট ছাড়াতে হবে।"

বিট্টু মুখ নিচু করে বলে "রবিবার সকালে নিচে খেলতে  যাবার আগে রানাঘরে ঢুকে ডিমওয়ালা ইলিশ মাছ ভাজা দেখে লোভ সামলাতে পারিনি।  তুমি bathroom এ ছিলে আর কল্পনা দি চলে গেছিলো। বড় ডিমওয়ালা মাছ ভাজা টা তোমাকে না বলে আমি খেয়েছি। "

রান্নাঘরে কাপ ভাঙার শব্দ। কল্পনার হাত থেকে চায়ের কাপ তা মাটিতে পরে ভাঙলো বারীন বাবুর আবার জিজ্ঞাসা "কি কল্পনা হাত কাটে নি তো ?"

রুবি দি নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। "তুই কেমন ছেলে রে বিট্টু ? কাল তুই না বলে মাছ খেলি আর আমাকে সেটা না জানিয়ে চুপ করে থাকলি ? এতো সব ঝগড়া ঝাটি ঘটে গেলো আর তুই মুখ খুললি  না ? ছি ছি আমি বেলা দির কাছে মুখ দেখাবো কি করে ?"

বারীন বাবু বললেন "বিট্টু ওর মাকে এতো ভয় পায় যে বললে মা কি ভীষণ রেগে যাবে এই ভেবে সাহস করে তোমায় কিছু বলতে পারে নি।  সেজন্য কষ্ট পাচ্ছিলো। কাল সন্ধ্যা বেলা আমাকে সত্যি কথাটা বললো। আমি ওকে বললাম তোমাকে সব জানাতে।  শোনো আর দেরি করো না।  এখুনি বেলা দির বাড়ি যাও।  কালকের ব্যাপারটা মিটিয়ে এস। " লজ্জিত রুবি দি এবার বেলা দির বাড়ি মিট মাট করতে চললেন। বিট্টু ঘরে গিয়ে পড়তে বসলো।

বারীন বাবু সোফায় বসে ডাক দিলেন "কল্পনা চা  হয়েছে ? তাড়াতাড়ি চা টা  নিয়ে এস। "

কল্পনা চায়ের কাপ নিয়ে বারীন বাবু কে দিলো। হাত টা  তার থর থর করে কাঁপছে।  বিট্টু কেন এতো বড়ো মিথ্যা কথাটা বললো। তা কিছু তাই বুঝতে পারছে না। শুধু চোখ দুটো ছল ছল করে উঠছে। বিট্টুর দিকে চোখ তুলে তাকাবে কি করে ভাবতে পারছিলো না।

বারীন বাবু বললেন "জানো কল্পনা বিট্টু যে আজ তোমার দোষ টা নিজের ঘাড়ে নিয়ে ওর মাকে এতো বড়ো  একটা মিথ্যা কথা বললো তা কিন্তু শুধু ওর বন্ধু বিশুর জন্য।  কারণ ওর মা যদি সত্যি কথাটা জানতে পারে তাহলে ওর বন্ধুর মাকে সবাই চোর ভাববে।  আর বিশু তো লজ্জায় গ্লানি তে কোনোদিন ই ওর বন্ধির কাছে আস্তে পারবে না। তোমার কাজ টাও থাকবে না।  এটা কেন করলে কল্পনা ?"

কল্পনা আর্তনাদ করে ওঠে "আপনি সব জানেন দাদা।  আমার বড় ভুল হয়ে গেছে। ছেলে কে ইলিশ মাছ খাওয়ানোর লোভ হয়েছিল আমার। আমাকে ক্ষমা করেন দাদা। এই অন্যায় কাজ আমি আর কখনো করবো না। আমার কাজ তা ছাড়াবেন না দাদা। বিশু যদি জানতে পারে এখন থেকে চুরি করে মাছ নিয়ে ওকে খায়িয়েছি আর সেজন্য আমার কাজ তা গেছে তাহলে ও লজ্জায় মরে  যাবে। "

বারীন বাবু বলেন "কল্পনা, তুমি মানুষ টা খুব ভালো, কিন্তু হঠাৎ একটা অবিশ্বাসের কাজ করে ফেলেছো। তোমার মনের ইচ্ছাটা বৌদিকে বলে দেখতে।  বৌদি নিশ্চয় তোমার বিশুর জন্য মাছ দিতো। তোমার বৌদি যতই রাগারাগি করুক আর সবকিছু কড়া  নিয়মে চালানোর চেষ্টা করুক না কেন আমরা কোনো কোনো সময় বেনিয়ম করে আমাদের জীবনটাকে  সহজ ভাবে চালাতে চাই। ভেবে দেখো তো আজ আমাদের বাড়ির "সত্যি কথা বলার" নিয়ম ভেঙে বিট্টু ওর মাকে যে মিথ্যা কথা গুলি বললো তা শুধু তোমার আর বিশুর জীবন টা যাতে কঠিন হয়ে না পরে তার জন্যই। বিট্টুর মনে কিন্তু তোমার সম্বন্ধে একটা অবিশ্বাস তৈরী হয়েছে। এর পরে কিন্তু আমরা কেউই আর তোমাকে ক্ষমা করবো না।"

কল্পনা হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে "আমি বড় ভুল করেছি দাদা। বিট্টু আমার জন্য সব দোষ নিজে নিলো"

বারীন বাবু বলেন "কেঁদো না কল্পনা।  আর কখনো এমন কাজ করার আগে বিট্টু আর বিশু দুজনের কথা ভেবো। আর শোনো এবার থেকে প্রতি শনিবার সন্ধেবেলা বিশু কে ওর অংক বই খাতা নিয়ে এখানে পাঠিয়ে দিও। এবার থেকে ওর অংক টা আমি দেখিয়ে দেব। তোমার কোনো ভুলের জন্য বিশু কে নষ্ট করে ফেলো না। "

বারীন বাবুর প্রতি কৃতজ্ঞতায় নুইয়ে পরে কল্পনা।  নিঃশব্দে চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পরে। বাইরেও তখন বৃষ্টি নেমেছে।

বারীন বাবু বলেন রান্নাঘরে যাও কল্পনা।  আজ একটু জমিয়ে খিচুড়ি রাঁধো তো।  খিচুড়ি আর ডালের বড়া ।  বিট্টু খুব ভালোবাসে।

কল্পনা চোখ মুছে রান্নাঘরে ঢুকলো। আর Tom দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আনন্দে ঘেউ ঘেউ করতে লাগলো। বারীন বাবু দরজা খুলে দেখেন Jerry কে কোলে নিয়ে রুবি দি দাড়িয়ে আছে।  মুখে একগাল হাসি নিয়ে বললেন "শুনছো আমি বেলা দির সঙ্গে সব ঝামেলা মিটিয়ে নিয়েছি। " Jerry লাফ দিয়ে রুবি দির কোল থেকে নেমে Tom  এর সামনে খেলতে লেগে গেছে। বিট্টুও ওদের খেলায় যোগ দিয়েছে। বিট্টুর মুখটা আনন্দে ঝলমল করছে।

বিট্টু চিৎকার করে বললো "কল্পনা দি একটু বেশি করে খিচুড়ি করো, বিশুও খিচুরি খেতে ভালোবাসে।  আজ ওর জন্য নিয়ে যেও। "

রান্না ঘরে কল্পনার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরে আর বারীন বাবুর মুখটা প্রশান্তি তে ভরে ওঠে। উনি নিশ্চিন্ত ভাবে ভবিষ্যৎ প্রজম্নের দিকে তাকিয়ে থাকেন। বাইরে কালো মেঘের ফাঁকে রোদ্দুর দেখা যায়।


----------- সুস্মিতা সেন 































































বৃহস্পতিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

মিসিসিপি

মিসিসিপি তুমি আমার ছোট্টো বেলার নদী
 তখন একবার তোমায় দেখতে পেতাম যদি।
বইয়ের পাতায় লুকিয়ে থাকা তুমি,
কোথায় শুরু কোথায় শেষ কি জানি।

চাক্ষুষ হয়তো হওনি তুমি আমার,
তবে মনে মনে আমি তোমায় করেছিলাম পার,
তোমার তীরে বসে রাত্রি দিন
পিকনিক, ক্যাম্পিং আর প্ল্যানিং।

ভাবছো তুমি সাত সমুদ্র তেরো নদীর পারে
কি করে আমার মনে দিলে হানা।
বইয়ের পাতার মাঝ দিয়ে যে আমার
গজিয়েছিলো অনেক বড় ডানা।

তোমার পারে Aunt Polly র বাড়ি,
যেথায় আমি বেঁধেছিলাম বাসা
Orange cake , Pumpkin Pie  আর Chocolate cookie  দিয়ে
দিনগুলো কাটতো যে মোর খাসা।
পকেট মানি ও রোজগার করতাম বেশ
বোকা ছেলেদের রং করিয়ে ফেন্স,
তারপর সেই ফেন্স টপকে রাতে
Adventure  শুরু হতো তোমার ঘাটে।

ওপারেতে ছিল এক জঙ্গল
কাউকে দেখিনি কখনো সেখানে যেতে,
তবে রাতের বেলা তোমার ঘাটে বসে
দেখেছি ওপার থেকে আলোর শিখা আসত ভেসে।
ইচ্ছে হতো একবারটি দেখে আসি
আলোর শিখা কথা হতে আসে ভাসি,
Steam Boat এ ঘট ঘট করে
চলে যাই তোমার ওপর দিয়ে সেই দূরে।

যেই না ভাবা সেই সফল হওয়া
গল্পের  বইয়ের এটাই তো বিশাল পাওয়া,
পরের পাতায় আমার জঙ্গল যাওয়া
Jackson Island এ থাকা খাওয়া দাওয়া।

Becky র সাথে প্রথম প্রেমের ছোঁয়া
ডিগবাজি দিয়ে তার মনে নাড়ি কড়া,
দুজন মিলে গুফাই হারিয়ে যাওয়া
St Petersburg এ আরো কত স্মৃতির আনা গোনা।

ভাবছো তুমি আমি এতো কি করে জানি
Becky আর Aunt Polly তো ছিলোনা ভূগোলে,
কে বলেছে আমি তোমায়  ভূগোলে চিনেছি
তোমার তীরে তো আমি বন্ধু নিয়ে দিনের পর দিন মেতেছি,
জানতে চাও কে ছিলাম ওই বন্ধু তিন
আমি, Tom  Sawyer আর Huckleberry Finn.
         
                                            - জয়িতা ব্যানার্জী







বুধবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

দুর্গা দুর্গতিনাশিনী

আকাশ পানে তাকিয়ে দেখি 
নীল সাগরের রঙ বাহার, 
মাঝে মাঝে মেঘের ঢেউয়ে 
সাদা ফেনার চমক তার। 

কোথায় গেল ধূসর আকাশ 
কালো মেঘের ধূম নিয়ে ?
বর্ষা রানী গেলেন কখন 
মাটিকে সব প্রেম দিয়ে ?

নদীর জলে থৈ থৈ সুর 
কূল ছাপানোর সঙ্গীতে,
কাশের বনের দুলছে মাথা 
নাচের তালের ভঙ্গিতে। 

ভোরের বেলায় শিউলি তলায় 
কমলা বোঁটার সাদা ফুল,
ঘাসের আগায় স্ফটিক দানা 
শিশির কণা দোদুল দুল। 

সূয্যি মামা ছড়ায় সোনা 
সাদা মেঘের ফাঁক গলে,
আকাশ বাতাস বদলে গেল 
আনমনা হই কাজ ভুলে। 

সেই চেনা সুর বাজলো আবার 
আলোর বেণুর তাল গুনে,
মাতলো ভুবন আনন্দেতে 
আগমনীর  সুর শুনে। 

"সাজ সাজ সাজ", রব উঠেছে
শারদীয়ার প্রাক্কালে,
শোক, তাপ, দুখ সরিয়ে রেখে 
আনন্দে ভাস সক্কলে। 

আসছে উমা মায়ের কাছে 
মর্ত্যধামে এই শরতে, 
পুত্র কন্যা আসছে সাথে 
স্বামী রইলেন কৈলাশেতে। 

পৃথিবীটা আজ বড়ো কালো উমা 
মহিষাসুর আর একা নয় আজ,
মায়ের আদর পরে খেয়ো তুমি 
চার দিনই পরো যুদ্ধের সাজ। 

দশ ভূজে তুমি প্রহরণ ধরো 
অগ্নি বর্ষ ললাট নেত্রে,
রুদ্র চন্ডী জ্বালাও আগুন 
রক্ত বীজের জন্ম ক্ষেত্রে। 

প্রকাশ হয়ও মা ভুবন ব্যাপিয়া 
অসুর নিধনে শক্তি রূপিনী,
শান্তির বারি সিঞ্চণ করো 
তাপিত মানবে শান্তি দায়িনী। 

রূপ, জয়, যশ sotru বিজয় 
চাই না কিছুই বর প্রদায়িনী,
হও সিংহ বাহিনী জগদ্ধাত্রী 
মা দুর্গা তুমি দুর্গতিনাশিনী।   

                                           --- সুস্মিতা সেন 








শুক্রবার, ২ আগস্ট, ২০১৯

যানবাহন

Public transport এর দিক থেকে কিন্তু কলকাতার কোনো তুলনা হয় না।  গাড়ি, স্কুটার, মোটরসাইকেল  - এগুলি চালাতে জানা বাধ্যতামূলক নয়।  Infact আমার পরিচিতির মধ্যে অনেকেই শুধু সাইকেল চালানো রপ্ত করেই জীবন যুদ্ধে জয় ঘোষণা করেছে। এঁরা বুঝে গেছে - এটাই যথেষ্ট।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পা রাখতেই যে রিক্সা পাওয়া যায়। মানব শক্তি চালিত এই যান এর উদয় হয় ১৯০০ সালে কলকাতায়।  চিনে ব্যবসায়ী দেড় কৃতিত্বে। সর্গ, নরক আর কলকাতা পুলিশ কে এড়িয়ে , পাড়ার গলি,  চায়ের দোকান , বাস স্ট্যান্ড,  এমনকি বাড়ির উঠোনে - এদের সীমাহীন গতিবিধি। বাইরের গঠন দেখে সেকেলে মনে হলেও, রিকশা কিন্তু far ahead of its time । Surge Pricing এর কনসেপ্ট টা এখান থেকেই তো এসেছে।  বৃষ্টি হলে দু  গুন ভাড়া, বাজারের থলি থাকলে ২ টাকা বেশি, বড়ো রাস্তা পার হলে ১ টাকা বেশি আর রাত ৯ টার পর কাকুতি-মিনতি। Uber অনেক পিছিয়ে আছে। মধ্যবিত্ত কলকাতার লাইফ লাইন এরা।
রিকশায় চেপে অবশ্য বেশি দূর যাওয়া যায় না।  ওই পাড়ার গলি থেকে বড়ো রাস্তা।  তার ধীর গতি লম্বা সফরের জন্য উপযুক্ত নয়।
বড়ো রাস্তায় পৌঁছে বোঝা যায় কেন বাঙালি রা নিজেদের Public transport সিস্টেম নিয়ে এতো গর্বিত।বাস, ট্যাক্সি , মেট্রো, ট্রাম, অটো - শারীরিক ক্ষমতা এবং সময় এর দাম, এই দুটো factor এর ওপর বেছে নিন নিজের বাহন। তবে কটা জিনিস জেনে নেওয়া দরকার, যাত্রা শুরুর আগে।

বাস: কলকাতায় বাস মুলত তিন রকমের - টিনের বাস, মিনি বাস, সরকারি বাস।
প্রথমেই মিটিয়ে নি সরকারি বাস এর ব্যাপারটা। খুব সহজ - এগুলো রাস্তায় দেখা যায় না।  মেরামতির অভাব আর দুর্নীতির উপস্থিতি - এই দুই কারণে সরকারি বাস এখন লুপ্তপ্রায়। হাতে গোনা যেকটি রাস্তায় দেখা যায়, সেগুলো খুব সম্ভবত পশ্চিমবঙ্গ পরিবহন সংস্থার কর্মচারীদের work shuttle রূপে ব্যবহার হচ্ছে।  এতে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নেই।

টিনের বাস: কাঠের কাঠামোর ওপর টিনের পাত বসিয়ে এই বাস তৈরী। তাই টিনের বাস। ভিতরে বসার স্থান ৩৫। এটাই একমাত্র নির্দিষ্ট সংখ্যা । বাস্তবে এই বাসে কতজন ধরে, এই তথ্য আজও সঠিক ভাবে জানা যায় নি। Considered a State Secret। তবে এটা ঠিক - যতই ভিড় হোক না কেন, টিনের বাস কাউকে ফেরায় না। ছাদে, দরজায়, জানলায় বাদুড় ঝোলার মতন করে মানুষ হাওয়া খেতে খেতে দিব্বি গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পারি দিচ্ছে। দেখে যতটা অস্বস্তিকর মনে হয়, আসলে ততটা নয়। অন্তত যারা বাস এর ভিতরে, তাদের তুলনায় অনেকটাই কম।  ভারত বর্ষের Population density আর High  Contact culture এর এক অপূর্ব মেলবন্ধন দেখা যায় বাসের ভিতরে। বিশদ বর্ণনার প্রয়োজন নেই। ঘামের গন্ধ মাখা কিছু লোমহর্ষক স্মৃতি মাথা চারা দিয়ে উঠবে। জানতে হলে সোমবার সকাল ৯ টায়, ২১৮ নং বাস এ চেপে বাবুঘাট চলে যাবেন। বাঙালি বাস যাত্রীদের প্রতি এক উঁচু মানের শ্রদ্ধা অনুভব করবেন।  ও হ্যা আরেকটা কথা - তারা থাকলে টিনের বাসে না চাপায় ভালো। বাস স্ট্যান্ড, স্কুল কলেজ এর গেট, সিনেমা হল, মিষ্টির দোকান, মাছের বাজার - সম্ভাব্য যাত্রী দেখলেই বাস যেখানে সেখানে দাঁড়িয়ে যায়। এই চলা থামার নাটকে ব্যস্ততার কোনো জায়গা নেই। ধৈর্য ধরে বসুন - কোনো এক সময় ঠিক পৌঁছে যাবেন।

এই টিনের বাসের ছোট সংস্করণ হলো মিনিবাস। আয়তন এর অপূর্ণতা সে গতি আর আক্রমণাত্মক ব্যবহার দিয়ে পূর্ণ করে নেয়। মিনিবাস চালক দেড় concept of speed, space and time অন্য মানুষেদের থেকে একটু আলাদা। সেটা মিনিবাস এর যাত্রী বুঝতে না পারলেও, রাস্তার দুর্ভাগ্য পথচারি খুব ভালো করে টের পায়। অতয়েব, রাস্তায় মিনিবাস দেখলেই টুক করে উঠে পড়ুন। বাইরে থাকা নিরাপদ নয়।

মিনিবাস এর aggression এর ঠিক উল্টো হলো ট্রাম। সরকারি বাস এর মতন ট্রাম ও প্রায় লুপ্ত। কিন্তু এটার জন্য সরকার কে দোষ দেওয়া ঠিক যায়না। দোষ তা শ্রী চার্লস ডারউইন এর। উনি দুম করে বলে দিলেন "Survival of  the fittest" - আর ব্যাস, ট্রাম এর দিন শেষ। ট্রাম এর ধীর গতি এবং সীমিত route এর জন্য আজ আর তাকে reliable transportation ভাবে গ্রহণ করা যায় না। আজ একবিংশ শতাব্দী তে ট্রামের ভূমিকা দুটো: প্রথমত ময়দান এ প্রেমিক - প্রেমিকাদের নির্বিঘ্নে সময় কাটানোর সুযোগ দেওয়া আর দ্বিতীয়ত সিনেমা শুটিং এর প্রপ হওয়া।  এক অতি সাধারণ Public Transport থেকে ট্রাম এখন ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি র এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে উঠেছে।

ট্রামের আরাম আর মিনিবাস এর গতি - দুই চাই ? তাহলে ট্যাক্সি ছাড়া উপায় নেই। ট্যাক্সি হলো আজকের দিনের সত্যিকারের শ্রেণী শত্রূ।  বোঝাচ্ছি। মদ্ধবিত্ত বাঙালি ট্যাক্সি চড়ে  বছরে ২ বার। বাৎসরিক পুরী ব্রাহ্মণের সময় হাওড়া স্টেশন যাওয়া এবং সেখান থেকে ফেরা। অথচ প্রয়োজনের সময় রাস্তায় খালি ট্যাক্সি পাওয়া অসম্ভব। সবসময় সোয়ারি নিয়ে সে চলেছে কোথাও। এরা শহরের উচ্চবিত্ত। ভিড় বাস এ দাঁড়ানো মধ্যবিত্ত বাঙালির মনে আঘাত করবে না ? সে জবাব চায় - সেও রোজ ট্যাক্সি চড়তে চায়। তাই আপনি যদি শ্রেণী সচেতন বুদ্ধিজীবী বাঙালি হন, তাহলে ট্যাক্সি বস্তু টি কে এড়িয়ে চলাই ভালো।

রয়ে গেলো খালি অটো - কিন্তু তা নিয়ে আমি বিশেষ বলতে পারবো না।  অটো ইউনিয়ন এর সদস্য রা আমাকে মিষ্টি করে অনুরোধ করেছে তাঁদের নিয়ে না লিখতে । তাঁদের কথা আমি ফেলতে পারবো না। তবে একটা কথা বলি - বর্তমান কাগজ আর  অটো চালক - এরা ভগবান ছাড়া কাউকে ভয় পায়না। বাকিটা আপনি বুঝে নিন। 

রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০১৯

মনের আকাশ

বৈঠকখানা র লম্বা জানলা টা দিয়ে অনেকটা আকাশ দেখা যায়।  দূরে এক চিলতে পাহাড় ও দেখা যায়।  টেবিল এর পাশ থেকে চেয়ার তা টেনে নিয়ে জানলার ধারে বসলাম।  বিকেলের সোনালী রোদে ঝলসে যাচ্ছে চারিদিক।  আকাশে মেঘ দেখতে দেখতে মনটা হঠাৎ ২০১৬ হিউস্টন এ।  মাস খানেক হলো এই দেশে এসেছি।  হিউস্টন এ আমাদের apartment এর বারান্দা থেকেও অনেক তা খোলা আকাশ দেখা যেত।  উজ্জ্বল নীল আকাশে তুলোর মতন মেঘ।  সেই মেঘ যেন সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে আমার জন্য বার্তা নিয়ে এসেছে। আমার নিজের জনের বার্তা - পরিবার, পরিজন , বন্ধু বান্ধব এর বার্তা। এক ঢেউ স্মৃতি ভেসে উঠলো। মনটা পিসিজিয়ে গেলো ২০০৮ সা লের Bangalore শহরে। সদ্য পড়াশোনা শেষ করে চাকরি তে ঢুকেছি।  মাইনে সামান্য কিন্তু খরচা অনেক। বছর দু এক এর মধ্যে বিয়ে করার ইচ্ছে - তাই খুব সামলে চলা দরকার। তিন তোলার ওপর একটা চিলেকোঠার ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম।  ঘরের বাইরে পা রাখলেই খোলা ছাঁদ। আর সেখান দাঁড়িয়ে  দুটো প্রকান্ড multistorey বিল্ডিং এর মাঝখান থেকে এক ফালি আকাশ দেখা যেত। সূর্যাস্তের সমত সেই রক্তবর্ণ আকাশে রঙের খেলা দেখতে দেখতে মন খারাপ হয়ে যেত।  কলকাতার সোনালী বিকেল গুলোর কথা মনে পরে যেত । মা, বাবা, ভাই, বন্ধু বান্ধব - তারা সবাই আমার থেকে সহস্র মাইল দূরে কিন্তু, মনের নিকটে। এই ঠিক যেন কদিন আগেই তিন বন্ধু মিলে চায়ের ঠেক জমিয়ে রাখতাম।  সুখ-দুঃখ্যের কথা, রাজ্যের বাঁদরামো সব ঐখানেই। বাড়ি ফিরে বাবার বকা আর মায়ের হাথের রান্না খেয়ে ভাইয়ের সাথে আড্ডা।  আকাশের তখন অরে রক্তবর্ণ নয়।  গাঢ় বেগুনি রঙের চাদর যেন তাকে ঢেকে দিচ্ছে।

হঠাৎ ঘোর কাটলো ফোন আওয়াজে। স্মৃতি রোমন্থনের ঘোরে কখন যে বিকেল পেরিয়ে সন্ধে হয়ে গেছে খেয়াল ও করি নি। মায়ের  ফোন।  ঘড়ি দেখলাম - ৮ টা বাজে। আকাশে ঠিক সেই ছেলেবেলার মতন একই রকম গাঢ় বেগুনি রং।

স্থান পাল্টেছে, কাল পাল্টেছে কিন্তু  যদি কিছু না পাল্টিয়ে থাকে তা হলো আমার ছেলেবেলার সেই আকাশ। এই আকাশ ই যেন মনের প্রিয়জন দেড় কাছে এনে দেয়।  ভৌগোলিক দূরত্ব শুধু কিছু সংখ্যা মাত্র ।  

শনিবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৯

আমার গল্প

আমার গল্প শুনবে কি ?
বাজে আবদার তাই নাকি ?
যদি সবাই শুনতে চাও
চুপটি করে মনটা দাও।

আমি সুস্মিতা সেন,
Miss Universe নই
শেমলা বর্ণা পাঁচ ফিট হাইট
মুখ চোরা হয়ে রোই।

আমার স্বামীটি বড়ো কেজো লোক
কোনো ছুটি তার নাই।
সারাদিন ধরে সংসার ভুলে
কাজ খুঁজে পাওয়া চাই।

আমি যে আবার স্বামী গরবিনী
ছুটে ছুটে মরি পিছে।
কখন যে তার কোন কাজে লাগি
দিন কাটে মোর মিছে।

ছোট পুত্রটি ব্যস্ত বেজায়
cellphone কানে দিয়ে
এই বয়সের এটাই ধর্ম
বুঝি এই বয়সে পৌছিয়ে।

মিষ্টি স্বভাব দায়িত্ব আছে
ভালোবাসে তার মা কে।
সময় মতো ওষুধ খাবার
খোঁজ ঠিক ঠাক  রাখে।

অনেক দুরে থাকে ঋত্বিক
সে আমার বড়ো ছেলে,
সন্তান মোর প্রিয় বন্ধু  ও বটে
মন ভরে কাছে পেলে।

আরো আছে মোর পুত্রবধুটি
জয়িতা যে নাম তার,
মামনির বড়ো প্রিয় মনোমিতা
খাঁটি রত্নের হার।

এ জগৎ নিয়ে
আমি আছি সুখে,
নত  যেন থাকি
তাহারি সমুখে।

যিনি বল দেন
দেন যে শক্তি,
প্রণাম তাহারে
লয়ে পূর্ণভক্তি।

ভালোবাসি সবে,
সবে ভালো থেকো,
ভালোবাসা রেখো
বিশ্বাসে থেকো।

------ সুস্মিতা সেন (আমার মামনি )







শনিবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

হোম সাইন্স


কথা আছে, "Life is a  great teacher". আমি বলি "Married life is the greatest teacher". বাকিদের কথা বলতে পারবো না - তবে আমি জীবনের কিছু অত্যন্ত মূল্যবান শিক্ষা অর্জন করেছি
 সংসার ধর্ম পালন করতে গিয়ে। যুক্তিবিদ্যা বা তর্কশাস্ত্রে পারদর্শীতার  প্রয়োজন নেই। খালি প্রয়োজন  আছে  গুরুর প্রতি শিষ্যের অগাধ বিশ্বাস। বলাই বাহুল্য এই ক্ষেত্রে আমি শিষ্য আর গুরুদেবীর ভূমিকায় আমার অর্ধাঙ্গিনী। কৌতূহল নিবারণার্থে আজ আমি কিছু বাছাই করা মুখরোচক  উদাহরণ পেশ করছি পাঠকের সামনে। বড় মন নিয়ে পড়ুন ও পড়ান।

১. চটি : ঘরের চটি, বাইরের চটি, বাগানের চটি, Carpet এর চটি, বাথরুম এর চটি. ভিন্ন ভিন্ন রং আর নকশা দিয়ে চটির সামাজিক স্থান নির্দিষ্ট করা হয়।  ব্যাপারটা যতটা জটিল মনে হচ্ছে ততটা নয়।  বাড়ি ঢোকার সময় বাইরের চটি টা চৌকাঠএর ওপারে রেখে ঘরের চটি পরে নিলাম। তারপর বেডরুম এ ঢোকার আগে কার্পেট এর চটি তে বদল।  সেখান থেকে বাথরুম যাবার আগে আর একবার পদান্তর।  চটি বদলের এই ছন্দে তাল মিলিয়ে চলা এক অনন্য অভিজ্ঞতা।  গুরুদেবী বলেন এতে জীবনে শৃঙ্খলা আসে।  অকাট্ট যুক্তি।

২. এঁটো  : গুরুদেবীর প্রাণপণ চেষ্টার পরেও আমি আজও এঁটো কাটার বিষয়ে একটু পিছিয়ে আছি।  তবে in all fairness এই বিষয় টা সবচেয়ে জটিল।  বিশ্বাস হচ্ছে না ? আচ্ছা বুঝিয়ে বলছি। প্রথমে আমাদের জানতে হবে এঁটো জিনিসের তালিকা।  এই লম্বা list এ যে যে পদের নাম থাকবে, তাদের থেকে খুব সাবধান। এরা নিজেরা এঁটো, আর যে জিনিসের সংস্পর্শে আসে, তাকেও এঁটো করে দেয়। মাছের এঁটো, ডিমের এঁটো, chicken এর এঁটো, ভাতের এঁটো, ডালের এঁটো। না খিচুড়ির এঁটো হয় না - ওটা পবিত্র। বাজার থেকে ডিম্ এনে যদি টেবিল এর ওপর রাখি, তাহলে টেবিল তা এঁটো হয়ে যায়। এখন টেবিল এ যাই রাখি সব এঁটো। যতক্ষণ না ভেজা ন্যাকড়া দিয়ে মুছে  টেবিল কে শুদ্ধ করা হচ্ছে, ততক্ষন তাকে ব্যবহার করা চলবে না।  কি সাংঘাতিক ! এই সেদিন যেমনি অজ্ঞাতবশে ল্যাপটপ তা টেবিল এ রেখেছি, আর ঠিক তার পরক্ষনেই গুরুমা ভেজা ন্যাকড়া নিয়ে ঘরে ঢুকলো। বুঝলাম, টেবিল এঁটো আর এখন ল্যাপটপ টাও  এঁটো হয়ে গেছে। এবার উপায় ? আমি করুণ  চোখে গুরুমায়ের দিকে তাকালাম।  office  এর ল্যাপটপ। কলের তলায় চান করালে বোধহয় boss পছন্দ করবে না।  কিন্তু গুরুমায়ের অসীম প্রতিভা, সঙ্গে সঙ্গে clorex wipes বেরিয়ে এলো।  সমস্যা  সমাধান।  যদিও এই পুরো ঘটনায় এঁটো হয়ে যাবার প্রভাব বোঝার সুযোগ পেলাম না, কিন্তু সেটা গুরুত্ব পূর্ণ না।  গুরুমা বলেন বিশ্বাসে  মেলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। আমার বিশ্বাস এখন এই laptop  সম্পূর্ণ পাপমুক্ত । এখন খালি সুন্দর, সুশীল আর পবিত্র powerpoint তৈরী হবে এতে।

৩. বাসি কাপড় : এইটা বোঝা যতটা সহজ কিন্তু অনুসরণ করা ততটাই কঠিন। যেমনি শৌচালয় ভ্রমণের আগে গায়ের সমস্ত কাপড় ছেড়ে তবেই প্রবেশের অনুমুতি। খুব সোজা মনে হচ্ছে না ? শীতকালীন ভোরে এই প্রথা অবলম্বন করা খুবই বেদনাদায়ক।  ও বলতে ভুলে গেলাম, শৌচালয়ের কার্য সম্পন্ন হলে আপাদমস্তক স্নান করা অবশ্য কর্তব্য । গোসলে  যাবার ভয় শীতকালে অনেকেরই খাওয়া কমে যায়। বলাই  বাহুল্য রাস্তা ঘাটে শৌচালয় ব্যবহার ভাবনার অতীত।  তবে হ্যা, একটা exception আছে। মাঠে ঘটে, প্রকৃতির মাঝে কার্য সিদ্ধি হলে এই নিয়ম খাটে না। কিন্তু এই দেশে সেটার উপায় নেই। তাই অর্থহীন। তবে শুনেছি নাকি কম্বলে দোষ নেই। না থাকাই ভালো।  সকাল বিকেল কম্বল কাঁচা একদমই  প্রীতিকর নয়.

আজ এই পর্যন্তই থাক। এ এক বিশাল গ্রন্থের একটা ছোট্ট অংশ। একমাত্র সিদ্ধ পুরুষ এবং নারী ই এই জ্ঞান সম্পূর্ণ রূপে অর্জন করতে পারেন। আমরা তাদেরই দেখানো পথ অবলম্বন করার চেষ্টা করি। মাঝে মাঝে ত্রূটি হয়।  আপাদমস্তক স্নান করে, জামা কেচে প্রায়শ্চিত্ত কোরে নি।

                                                                                     ---- ঋত্বিক সেন