মাছভাজা
সেদিন সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই শুনি বাইরে বেশ হইচই হচ্ছে। দরজা খুলে শুনি আমার দুই প্রতিবেশিনীর উচ্চৈ স্বরে বাগযুদ্ধ চলছে। একতলার বেলা বোসের সঙ্গে দোতলার রুবি রায় এর প্রচন্ড কথা কাটাকাটি হচ্ছে। কলকাতার মধ্যবিত্ত আবাসনের দুই জন শিক্ষিতা এবং আধুনিক মহিলার এহেনো অভাবনীয় বাক্য বিনিময় খুবই অসঙ্গত লাগছিলো। ঝগড়ার বিষয়টা ভালো করে শুনবার জন্য একটু কান খাড়া করলাম। একজনের মুখে তোমার "Tom" আর আরেকজনের মুখে তোমার "Jerry" এই শব্দ গুলি বুঝতে পারছিলাম।
সকলের অবগতির জন্য জানাই Tom হলো রুবি রায়ের কুচকুচে কালো রঙের Labrador আর Jerry হলো বেলা বোসের সাদা ধবধবে অদূরে হুলো। আবাসনের বাচ্চারাই ওদের দুজনের নাম করণ করেছে। Tom অরে Jerry র মধ্যে কোনো বিবাদ ছিল না। বিকেল বেলা রুবি রায় যখন Tom কে নিয়ে নিচের swimming pool এর চারপাশে হাঁটেন তখন Jerry ওর ঘর থেকে বেরিয়ে এসে Tom এর পাশে পাশে বন্ধুর মতন হাঁটতে থাকে। শান্ত স্বভাবের Tom কখনো ঘেউ ঘেউ করে Jerry কে ধমকায় নি। কুকুর অরে বেড়ালে বন্ধুত্ব এমন বিরল। আবাসনের সব বাচ্চারাও ওদের দুজনের খুব বন্ধু ছিল। এমন শান্তিময় পরিবেশে Tom অরে Jerry কে নিয়ে সকাল বেলায় কি অশান্তি হলো ভেবে একটু চিন্তান্বিত হয়ে পরলাম।
এমন সময় আমার Helping Hand মায়া দির আগমন। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলাম আজ পাক্কা কুড়ি মিনিট লেট। আজ আর রাগ দেখলাম না। কারণ নিচের ঘটনার প্রত্যক্ষ দর্শী মায়া দির কাছ থেকে এখন আমাকে সব জানতে হবে। তাই আজ লেট করাটা যেন লক্ষ্যই করলাম না।
মায়া দি প্রথমেই "জানো বৌদি" বলেই একমিনিটের নাটকীয় নিস্তব্ধতা নিয়ে রান্না ঘরের বাসন ভর্তি sink এর সামনে দাড়িয়ে বাসনের পরিমাণ দেখে ভুরুটা কুঁচকে ফেললো। গলায় হালকা বিরক্তির ছোঁয়া লাগিয়ে বললো "উফ বৌদি আজকেও তুমি দু দুটো বড় করাই বের করেছো ?"
বুঝলাম অন্যায় হয়ে গেছে। একটা কড়াই আমার রাতেই মেজে রাখা উচিত ছিল। এখানে অলিখিত নিয়ম তৈরী হয়েছে যে অন্যান্য ছোটোখাটো বাসনের সঙ্গে একটা করাই, একটা Pressure cooker আর একটা ভাত রাধার বাসনই মাজতে দেওয়া যাবে। তাড়াতাড়ি বললাম কষ্ট হলে একটা করাই মাজতে হবে না। আমার কৌতূহল তখন উথলে উঠছে।
মায়া দি এবার নাটকের প্রথম অংকের আবহ সংগীতের মত বেশ শব্দ করেই বেসিন এ কড়াই মাজতে শুরু করেছে। আর থাকতে না পেরে আমার শহুরে সংস্কৃতির মাথা খেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম "নিচে এতো চেঁচামেচি কিসের গো মায়া দি ?"
মায়া দি এবার আবহসংগীত বন্ধ করে বেসিন এর কলে হাত ধুয়ে পাক্কা আরো দু মিনিট চুপ থেকে তারপর রান্নাঘরের দরজার কাছে এসে বললো "আর কি ? নিচে কুকুর বেড়াল নিয়ে কুরুক্ষেত্তর হচ্ছে।"
তারপর প্রত্যক্ষ দর্শী মায়া দি ধারা বিবরণী শুনে যা বুঝলাম তা হলো গতকাল রবিবার রুবি দির স্বামী বারেন বাবু বাজার থেকে দেড় হাজার টাকা কেজিদরে দুখানা বড়ো বড়ো ইলিশ মাছ এনেছিলেন। রুবি দির রান্নার মাসি কল্পনা ডিমওয়ালা মাছের পেটি ভাজা। গাদার মাছের সর্ষে ভাঁপে আর মাথা দিয়ে কচুর শাক রান্না করেছিল।
সেই সময় একতলার বেলা দির বেড়াল Jerry দোতলার রুবি দির ঘরে ঢুকে পড়েছিল। কখনো কখনো Flat এর দরজা খোলা থাকলে Jerry বন্ধু Tom এর বাড়িতে ঢুকে পরে। Jerry আসলে Tom খুব আনন্দ প্রকাশ করে। দুই বন্ধু বসার ঘরে carpet এর ওপর বসে বসে TV র Serial গুলো দেখতে থাকে। কারণ ররুবি দ ও সকাল থেকে TV খুলে serial দেখে।
গতকালও Tom আর Jerry TV দেখছিলো, কল্পনা রান্না করছিলো। রুবি দির একমাত্র ছেলে বিট্টু ও ঘরে বসে বাবাবার কাছে অঙ্ক করছিলো। বিট্টু ক্লাস ৯ এর খুব মেধাবী ছাত্র। আর ওর বাবা বারীন বাবু স্থানীয় ছেলেদের স্কুলের ছাত্রদের প্রিয় অংকের মাস্টার মশাই। এই অবস্থায় রুবি দি বারীন বাবু কে দোকান থেকে এক liter cold drinks আনতে বলে স্নান করতে ঢুকলেন আর বারীন বাবু cold drinks আনতে বেরোলেন।
এর পর রুবি দি স্নান করে বেরিয়ে দেখেন Tom একই TV দেখছে Jerry নেই। কল্পনা রান্না করে চলে গেছে আর বিট্টুও ঘরে নেই। রুবি রান্না করা খাবার গুলো টেবিল এ এনে রাখবেন বলে রান্নাঘরে ঢুকলেন। হঠাৎ নজরে পড়লো মাছ ভাঁজ রাখা বাসনের ঢাকনা তা খোলা। ভালো করে লক্ষ করে দেখলেন সবচেয়ে বড়ো ডিমওয়ালা ইলিশ মাছের পেটিটা থালায় নেই। বারবার গুনলেন, ১০টা পেটি ভাজতে দিয়েছিলেন, এখন ৯টা ভাঁজ মাছ রয়েছে। রুবি দি খুবই আশ্চর্য হলেন। কোথায় গেলো একটা মাছভাজা ?
ইতিমধ্যে বীরেন বাবু cold drinks কিনে ফিরে এসেছেন। রুবি দি খুব উত্তেজিত ভাবে বীরেন বাবু কে মাছ ভাজা নিরুদ্দেশের কথা জানালেন। বীরেন বাবু ততোধিক শান্ত ভাবে বললেন তোমার বোধয় কল্পনাকে বলতে ভুল হয়েছে। কাল ওকে জিজ্ঞাসা করো।
রুবি দির মাথায় সেদিন সারাদিন সারারাত শুধু মাছ ভাজার চিন্তাই ঘুরতে থাকলো। সকাল বেলা ৭ টার সময় বীরেন বাবু বিট্টু কে নিয়ে স্কুল এ বেরিয়ে গেলেন তারপরেই কল্পনা এলো। রুবি দি কল্পনাকে জিজ্ঞাসা করলেন একটা মাছভাজা কম কেন। কল্পনা বলে সে কিছু জানে না। সব রান্না সেরে গুছিয়ে রেখে চলে গেছে। তবে Jerry কাল কয়েকবার TV দেখা ছেরে রান্না ঘরের দিকে এসেছিলো। বোধয় ইলিশ মাছের গন্ধেই এসেছিলো। কল্পনা দি ছিল বলে রান্না ঘরে ঢুকতে পারে নি।
এটা আগুনে ঘৃতাহুতি হলো। রুবি দি প্রথমে Tom কে একপ্রস্থ বকাঝকা করলেন, "আর যদি কখনো দেখেছি, তুমি ওই হলো বেড়ালটার সঙ্গে মিশেছ। আর ওকে আমার বাড়িতে ঢুকতে দিয়েছো। তুমি একটা মাছ চোরের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছো ? উচ্ছনে যাচ্ছ, ইত্যাদি। " বিট্টু কে শাসন করার সময় ওর বন্ধুদের সম্বন্ধে যা যা বলেন, শুধু বাবা-মায়ের নাম ডোবাবে আর বড়ো হয়ে চায়ের দোকান দেবে এই কথাগুলো বাদ গেলো।
এর পর রুবি দি তড়িৎ গতিতে এক তলায় অবতরণ করে সোজা বেলা দির দরজার বেল বাজান। বেলা দি অসময়ে রুবি দি কে দেখে খুব আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করেন "কি ব্যাপার রুবি দি ? এতো সকালে কি হয়েছে ?"
এতেই রুবি দির Visuvious এর অগ্ন্যুদ্গম। "কি হয়েছে ? তোমার Jerry কাল আমার রান্নাঘরে ঢুকে ইলিশ মাছ চুরি করে খেয়েছে। কি বড়ো size এর ডিমওয়ালা পেটি ছিল। " রুবি দির গলায় কান্নার সুর।
এবার বেলা দির গলায় ও Fujiyama র অগ্নুপাত। "কি বাজে কথা বলছো রুবি দি। আমার Jerry সোনা কখনো এমন কাজ করতে পারে না। ও মোটেও হ্যাংলা নয়। ওর বাড়িতে কি মাছ ভাতের আকাল পড়েছে যে আপনার বাড়িতে খেতে যাবে ? তাছাড়া ওই কাঁটাঅলা ইলিশ মাছ তো ও খাবেই না। ওর বাবা ওর জন্য বাজার থেকে রোজ ভেটকি মাছের fillet আনে। আর ও রোজ এক liter Amul milk খায়। আপনার বাড়ির খাবার ওর মুখেই রুচবে না। "
বেলা দির এই সব কথায় রুবি দি যথেষ্ট অপমানিত বোধ করেন। উচ্চৈস্বরে বলেন "কি বললে ? আমাদের বাড়ির খাবার ওর মুখে রুচবে না ? যদি আর কোনোদিন তোমার ওই হুলো আমাদের বাড়িতে গেছে তবে ঠ্যাং ভেঙে রেখে দেব। তোমার হুলো কে সামলে রাখবে।
চেঁচামেচি শুনে আবাসনের security ছুটে আসে কিন্তু দুই মহিলার মুখনিঃসৃত জ্বলন্ত অগ্ন্যুদ্গমএর মতন ভাষা থামানোর জন্য কি করা উচিত বুঝতে পারছিলো না। ওদের agency র guidebook এ এ বিষয়ে কিছু লেখা নেই। দমকল না police কাকে খবর দেবে ঠিক করতে পারছিলো না।
এমন সময় রুবি দির flat থেকে কল্পনা অকুস্থলে প্রবেশ করে এবং খুব উত্তেজিত ভাবে রুবি দি কে বলে "বৌদি তোমাদের tom এর আজ কি হয়েছে বোলো তো ? সকাল থেকে শুধু ঘেউ ঘেউ করতে লেগেছে ? রান্না ঘরের সামনে এসে চিৎকার করছে। Tom কি পাগোল হয়ে গেলো ?" এই বলে কল্পনা gate এর বাইরে।
এতক্ষণ Jerry র মাছ চুরির ঘটনা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ভাবে Tom এর পাগল হয়ে যাবার দিকে ঘুরে যেতেই বেলা দির আবার গর্জণ, "যাও যাও এবার কুকুর টাকে বাড়িতে বেঁধে রাখো। পাগলা কুকুর নিয়ে আর নিচে নামবে না। আজি সেক্রেটারি কে বলবো একটা meeting ডাকতে। পাগল কুকুর আবাসনে রাখা চলবে না। "
এই ঘটনায় হতবুদ্ধি রুবি দি পরাজিত সৌনিকের মতো ওপরে উঠের আসেন। আর আবাসনে Tom কে নিয়ে আতঙ্ক তৈরী হলো। রুবি দির ফ্লাট এ প্রায় সারাদিন ই Tom এর ঘেউ ঘেউ শোনা যাচ্ছিলো।
বিকাল বেলা বারীন বাবু স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলেই রুবি দি ওনাকে Jerry র মাছ চুরি করা, তা নিয়ে বেলা দির সাথে ঝামেলা আর Tom এর সারাদিন ধরে ঘেউ ঘেউ করা সবই জানালেন। বারীন বাবু সব শুনে বললেন Tom এর নিশ্চয় শরীর খারাপ হয়েছে, তাই অত ঘেউ ঘেউ করছে। আমি ওকে সন্ধ্যা বেলা dogs clinic এ নিয়ে যাবো।
এর পর প্রায় সন্ধ্যা বেলা বিট্টু স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলো। রুবি দি রাগত স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন, "কি রে আজ এতো দেরি করে বাড়ি ফিরলি যে ? কোথায় গিয়েছিলি ?"
"স্কুলে football match ছিল" এই কথা বলে ক্লান্ত বিট্টু নিজের ঘরে ঢুকে গেলো। অন্যদিন স্কুল থেকে ফিরে কোনো রকমে স্কুল uniform ছেড়ে হাত পা ধুয়ে খাবার টেবিল এ এসে বসে। আজ আর কোনো সারা শব্দ নেই। রুবি দি আপন মনে গজগজ করে চলেছেন। বারীন বাবু ব্যাপারটা লক্ষ করে বিট্টুর ঘরে গিয়ে বললেন, "বিট্টু ঘর অন্ধকার করে বসে আছিস কেন ? মন খারাপ ? কিছু হয়েছে বন্ধুদের সাথে ?"
বিট্টু বিষন্ন গলায় বলে "বন্ধুদের সঙ্গে কিছু হয় নি বাবা।"
বারীন বাবু বলেন, "বিট্টু, মা জলখাবার করেছেন, তুমি খেয়ে নাও। তারপর Tom কে নিয়ে আমাকে একটু ডাক্তার বাবুর কাছে যেতে হবে।
বিট্টু জিজ্ঞাসা করে "সেকি বাবা, Tom এর কি হয়েছে ?"
বারীন বাবু বলেন "ওর বোধয় শরীর খারাপ হয়েছে। আজ কল্পনা কে ঘেউ ঘেউ করে তারা করেছে। কল্পনা কাজ না করেই চলে গেছে। ও তো এমন করে না। আর সবাই ওকে পাগল ভাবছে। "
বিট্টু শুনে চুপ করে থাকলো। তারপর বললো, "বাবা আমিও তোমার সঙ্গে যাবো।"
Dogs Clinic আমাদের আবাসন থেকে খুব দূরে নয়। বিট্টুর তার বাবার সঙ্গে Tom কে নিয়ে ডাক্তারের কাছে চললো। কিছু দূর যাবার পরেই বিট্টু Tom কে নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।
বারীন বাবু একটু অবাক হয়ে বললেন "কি হলো বিট্টু ?"
বিট্টু বললো "বাবা Tom কিন্তু পাগল হয়ে যায় নি। ও একদম সুস্থ, ওর কোনো শরীর খারাপ হয় নি। "
বারীন বাবু বললেন "তুই কি করে বুঝলি ? ও আজ ঘেউ ঘেউ করে কল্পনা কে তারা করে গেছে। নিশ্চয় এর শরীর খারাপ। "
"না বাবা, কল্পনা দি কাল না বলে লুকিয়ে ইলিশ মাছ ভাজা নিয়ে গেছে। সেটা Tom বুঝতে পেরেছে। তাই রেগে গিয়ে কল্পনা দি কে ঘেউ ঘেউ করেছে।"
বারীন বাবু বললেন, "ছি বিট্টু, তুই না দেখেই কল্পনাদি কে এমন একটা খারাপ সন্দেহ করছিস ? তোর মায়ের কানে এই কথা গেলে তুই জানিস আমাদের বাড়িতে কল্পনা দির কাজ তা আর থাকবে না।"
বিট্টু বললো "বাবা বিশ্বাস করো আমি মিথ্যা কথা বলছি না। গতকাল দুপুর বেলা খাবার সময় ভাজা মাছ কম বলে মা যখন রাগারাগি করছিলো তখন তোমার মতন আমিও ভেবেছিলাম মা হিসাবে কোনো ভুল করেছে। কিন্তু আজ বিকালে বিশুর কাছে সত্যি কথাটা জানতে পেরেছি। "
বারীন বাবু অবাক হয়ে বলেন "বিশু মানে কল্পনার ছেলে ? ও তো তোর কাছে মাঝে মাঝে ইংরেজি পড়তে আসে। "
"হ্যা বাবা, বিশু খুব ভালো ছেলে। ওদের ক্লাস এর first boy . খুব সুন্দর ছবি আঁকে। আর আমাদের স্কুল এর football team এর সেরা striker . আজ interschool football ফাইনাল এ বিশু একাই তিনটে গোল দিয়ে আমাদের স্কুল কে champion করেছে। খেলার শেষে বিশুর সাইকেল এর পিছনে চেপে বাড়ি ফিরছিলাম তখন বিশু আমাকে বললো "বিট্টু দা গতকাল কাকিমা আমার জন্য যে ডিমওয়ালা ইলিশ মাছ ভাজা পাঠিয়েছিল সেটা এত ভালো খেতে। আমি অতবড় ডিমওয়ালা ইলিশ মাছ কোনোদিন খাই নি। বাবা মারা যাবে পরে ঘর ভাড়া, আমার tution এর খরচ আর ভাত ডালের খরচ জোগাতে মা হিমশিম খায়। ইলিশ মাছ খাবো কথা থেকে। "
বাবা আমি বুঝতে পারলাম অতগুলো মাছ দেখে কল্পনা দির বিশুর কথা মনে পড়েছে। কিন্তু জানো তো, মা কখনো কোনো ভালো খাবার কল্পনা দি কে দেয় না। তাই কল্পনা দি এই অন্যায় কাজ তা করে ফেলেছে। আর Jerry র নামে দোষ দিয়েছে। মা তো রেগে গেলে আর মাথা ঠান্ডা রাখতে পারে না তাই কল্পনা দির কথায় বেলা মাসির সঙ্গে সকাল বেলায় প্রচন্ড ঝগড়া করেছে। আর Jerry কে Tom এর সঙ্গে খেলতে দেবে না বলেছে। কি বিশ্রী একটা ব্যাপার হলো বোলো তো বাবা। কি করলে যে সব আবার ঠিক হবে। মাকে তো সত্যি কথাটা বলাই যাবে না। "
বারীন বাবু এতক্ষন বিট্টুর মনের আবেগ মাখানো কষ্টের কথা শুনছিলেন। জীবনে প্রথম অতিবিশ্বাসী মানুষের অবিশ্বাসী হয়ে ওঠার ঘটনা ওর কাছে একটা বড়ো ধাক্কা। বিট্টু এই প্রথম জানলো আধুনিক পৃথিবীর এক সামাজিক আর অর্থনৈতিক বিবর্তনবাদ যাতে একজন মানুষ টেবিল এ তিন টুকরো ভাজা মাছ অর্ধেক অর্ধেক খেয়ে ফেলে যায় আর কেউ বা একটুকরো মাছ চুরি করে সন্তানের মুখে তোলে। শুরু হলো বিট্টুর গদ্যময় পৃথিবীকে দেখা।
বীরেন বাবু বিট্টুর মাথায় পরম আদরে হাত বুলিয়ে দেন তারপর বলেন "বিট্টু, কাল থেকে আজ পর্যন্ত যে এতগুলি ভুল ঘটনা ঘটে গেলো সেটাতো তোকেই ঠিক করতে হবে শেষ ভুলটা করে। "
বিট্টু অবাক হয়ে গেলো "আমাকে ভুল করতে হবে ? তাও তুমি বলছো বাবা ? তুমি তো কোনোদিন জেনেশুনে কাউকে ভুল করতে বলো নি। "
বারীন বাবু বললেন "দেখ বিট্টু কল্পনার মাতৃ স্নেহ ওকে চুরি করে ছেলের জন্য মাছ নিতে বলেছে। এই ভুলটা কল্পনা মরিয়া হয়ে করেছে। এখনও fridge এ অনেক মাছ আছে। কল্পনা কাল সকাল থেকে অনেক গুলো মাছ রান্না করেছিল। মা যদি একবারও ওর বাচ্ছাটার জন্য এক টুকরো মাছ দিতো তাহলে ও হয়তো এটা করতো না। মা কিন্তু কোনো অন্যায় করে নি। কারণ কল্পনার সঙ্গে কাজের চুক্তি তে ওকে কোনো খাবার দেবার কথা নেই। কিন্তু এটা ভুল। যেদিন কোনো ভালো জিনিস রান্না হয় তার থেকে কল্পনার বছর জন্য সামান্য কিছু দিলে আমাদের কারো ভাগে কি কম পরবে ? আমরা যে মাঝে মাঝে restaurant এ খেতে গিয়ে বেয়ারা কে tips দেই সেটা কিন্তু চুক্তি তে নেই। এটা তার service এর বিনিময় আমার token কৃতজ্ঞতা। বুঝলি কিছু বাবার এই গম্ভীর কথা গুলি ?"
বিট্টু বলে "কিছুটা বুঝেছি বাবা। এবার বোলো আমাকে কি ভুল কাজ করতে হবে ?"
বারীন বাবু হাসতে হাসতে বলেন "তোকে কল্পনার দোষ টা নিজের ঘাড়ে নিয়ে সকালে মাকে বলতে হবে যে মাছ টা তুই খেয়েছিস। বাকি টা আমি সামলে নেবো। এবার তাড়াতাড়ি ডাক্তার বাবুর কাছে চল। Tom এর একবার checkup হয়ে যাবে আর ওকে নিয়ে সবার ভয় টাও কাটবে।
Football champion হয়েছে বলে পরের দিন বিট্টুর স্কুল ছুটি। আর বারীন বাবুল আজ একটু দেরি করে বেরোবেন। সকাল বেলা bell বাজানোর শব্দে বারীন বাবু দরজা খুলে দেখলেন কল্পনা। বারীন বাবু বললেন "এস কল্পনা, আজ আর তোমাকে Tom কিছু বলতে না। আজ ওর মাথা ঠান্ডা আছে। আর মাছ চোর ধরা পড়েছে। "
কল্পনা প্রচন্ড চমকে উঠের বিস্ফারিত দৃষ্টি তে বারীন বাবুর দিকে তাকিয়ে থাকে। রুবি দি রান্না ঘর থেকে ছিটকে বাইরে বেরিয়ে এসে বারীন বাবু কে বলেন, "কে মাছ চুরি করেছে ? তুমি সব জানতে ?Jerry চুরি করে নি ?"
বারীন বাবু বলেন "তুমি শুধু শুধু Jerry কে চোর ভেবে বেলা দির সাথে বিশ্রী ঝগড়া করে এলে। আজ গিয়ে মিটমাট করে এস। আর Jerry কে ওপরে Tom এর কাছে পাঠিয়ে দিতে বোলো। Please রুবি দুটো অবলা প্রাণীর সুন্দর বন্ধুত্ব তোমরা নষ্ট করো না। "
রুবি কি অধৈর্য হয়ে বলেন "ঠিক আছে আমি বেলা দির কাছে ক্ষমা চেয়ে নেবো। কিন্তু চোর টা কে ? মাছ টা কে খেলো ?"
বারীন বাবু হাসতে হাসতে বলেন "দাঁড়াও দাঁড়াও অত ব্যস্ত হলে চলে ?" তারপর আতঙ্কিত কল্পনার মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন "কি হলো কল্পনা তুমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে কেন ? রান্না ঘরে গিয়ে এক কাপ ভালো করে চা করো দেখি "
কল্পনা প্রায় টলতে টলতে রান্নাঘরে ঢোকে। এমন সময় বিট্টু মাথা নিচু করে drawing room এ এলো। বারীন বাবু বলেন "এবার বিট্টু, কাল আমাকে যা বলেছিলে সেই সত্যি কথাটা মাকে এবার বলে দাও। অনেক জট পাকিয়ে গেছে। এবার জট ছাড়াতে হবে।"
বিট্টু মুখ নিচু করে বলে "রবিবার সকালে নিচে খেলতে যাবার আগে রানাঘরে ঢুকে ডিমওয়ালা ইলিশ মাছ ভাজা দেখে লোভ সামলাতে পারিনি। তুমি bathroom এ ছিলে আর কল্পনা দি চলে গেছিলো। বড় ডিমওয়ালা মাছ ভাজা টা তোমাকে না বলে আমি খেয়েছি। "
রান্নাঘরে কাপ ভাঙার শব্দ। কল্পনার হাত থেকে চায়ের কাপ তা মাটিতে পরে ভাঙলো বারীন বাবুর আবার জিজ্ঞাসা "কি কল্পনা হাত কাটে নি তো ?"
রুবি দি নিজের কান কে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। "তুই কেমন ছেলে রে বিট্টু ? কাল তুই না বলে মাছ খেলি আর আমাকে সেটা না জানিয়ে চুপ করে থাকলি ? এতো সব ঝগড়া ঝাটি ঘটে গেলো আর তুই মুখ খুললি না ? ছি ছি আমি বেলা দির কাছে মুখ দেখাবো কি করে ?"
বারীন বাবু বললেন "বিট্টু ওর মাকে এতো ভয় পায় যে বললে মা কি ভীষণ রেগে যাবে এই ভেবে সাহস করে তোমায় কিছু বলতে পারে নি। সেজন্য কষ্ট পাচ্ছিলো। কাল সন্ধ্যা বেলা আমাকে সত্যি কথাটা বললো। আমি ওকে বললাম তোমাকে সব জানাতে। শোনো আর দেরি করো না। এখুনি বেলা দির বাড়ি যাও। কালকের ব্যাপারটা মিটিয়ে এস। " লজ্জিত রুবি দি এবার বেলা দির বাড়ি মিট মাট করতে চললেন। বিট্টু ঘরে গিয়ে পড়তে বসলো।
বারীন বাবু সোফায় বসে ডাক দিলেন "কল্পনা চা হয়েছে ? তাড়াতাড়ি চা টা নিয়ে এস। "
কল্পনা চায়ের কাপ নিয়ে বারীন বাবু কে দিলো। হাত টা তার থর থর করে কাঁপছে। বিট্টু কেন এতো বড়ো মিথ্যা কথাটা বললো। তা কিছু তাই বুঝতে পারছে না। শুধু চোখ দুটো ছল ছল করে উঠছে। বিট্টুর দিকে চোখ তুলে তাকাবে কি করে ভাবতে পারছিলো না।
বারীন বাবু বললেন "জানো কল্পনা বিট্টু যে আজ তোমার দোষ টা নিজের ঘাড়ে নিয়ে ওর মাকে এতো বড়ো একটা মিথ্যা কথা বললো তা কিন্তু শুধু ওর বন্ধু বিশুর জন্য। কারণ ওর মা যদি সত্যি কথাটা জানতে পারে তাহলে ওর বন্ধুর মাকে সবাই চোর ভাববে। আর বিশু তো লজ্জায় গ্লানি তে কোনোদিন ই ওর বন্ধির কাছে আস্তে পারবে না। তোমার কাজ টাও থাকবে না। এটা কেন করলে কল্পনা ?"
কল্পনা আর্তনাদ করে ওঠে "আপনি সব জানেন দাদা। আমার বড় ভুল হয়ে গেছে। ছেলে কে ইলিশ মাছ খাওয়ানোর লোভ হয়েছিল আমার। আমাকে ক্ষমা করেন দাদা। এই অন্যায় কাজ আমি আর কখনো করবো না। আমার কাজ তা ছাড়াবেন না দাদা। বিশু যদি জানতে পারে এখন থেকে চুরি করে মাছ নিয়ে ওকে খায়িয়েছি আর সেজন্য আমার কাজ তা গেছে তাহলে ও লজ্জায় মরে যাবে। "
বারীন বাবু বলেন "কল্পনা, তুমি মানুষ টা খুব ভালো, কিন্তু হঠাৎ একটা অবিশ্বাসের কাজ করে ফেলেছো। তোমার মনের ইচ্ছাটা বৌদিকে বলে দেখতে। বৌদি নিশ্চয় তোমার বিশুর জন্য মাছ দিতো। তোমার বৌদি যতই রাগারাগি করুক আর সবকিছু কড়া নিয়মে চালানোর চেষ্টা করুক না কেন আমরা কোনো কোনো সময় বেনিয়ম করে আমাদের জীবনটাকে সহজ ভাবে চালাতে চাই। ভেবে দেখো তো আজ আমাদের বাড়ির "সত্যি কথা বলার" নিয়ম ভেঙে বিট্টু ওর মাকে যে মিথ্যা কথা গুলি বললো তা শুধু তোমার আর বিশুর জীবন টা যাতে কঠিন হয়ে না পরে তার জন্যই। বিট্টুর মনে কিন্তু তোমার সম্বন্ধে একটা অবিশ্বাস তৈরী হয়েছে। এর পরে কিন্তু আমরা কেউই আর তোমাকে ক্ষমা করবো না।"
কল্পনা হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে "আমি বড় ভুল করেছি দাদা। বিট্টু আমার জন্য সব দোষ নিজে নিলো"
বারীন বাবু বলেন "কেঁদো না কল্পনা। আর কখনো এমন কাজ করার আগে বিট্টু আর বিশু দুজনের কথা ভেবো। আর শোনো এবার থেকে প্রতি শনিবার সন্ধেবেলা বিশু কে ওর অংক বই খাতা নিয়ে এখানে পাঠিয়ে দিও। এবার থেকে ওর অংক টা আমি দেখিয়ে দেব। তোমার কোনো ভুলের জন্য বিশু কে নষ্ট করে ফেলো না। "
বারীন বাবুর প্রতি কৃতজ্ঞতায় নুইয়ে পরে কল্পনা। নিঃশব্দে চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পরে। বাইরেও তখন বৃষ্টি নেমেছে।
বারীন বাবু বলেন রান্নাঘরে যাও কল্পনা। আজ একটু জমিয়ে খিচুড়ি রাঁধো তো। খিচুড়ি আর ডালের বড়া । বিট্টু খুব ভালোবাসে।
কল্পনা চোখ মুছে রান্নাঘরে ঢুকলো। আর Tom দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আনন্দে ঘেউ ঘেউ করতে লাগলো। বারীন বাবু দরজা খুলে দেখেন Jerry কে কোলে নিয়ে রুবি দি দাড়িয়ে আছে। মুখে একগাল হাসি নিয়ে বললেন "শুনছো আমি বেলা দির সঙ্গে সব ঝামেলা মিটিয়ে নিয়েছি। " Jerry লাফ দিয়ে রুবি দির কোল থেকে নেমে Tom এর সামনে খেলতে লেগে গেছে। বিট্টুও ওদের খেলায় যোগ দিয়েছে। বিট্টুর মুখটা আনন্দে ঝলমল করছে।
বিট্টু চিৎকার করে বললো "কল্পনা দি একটু বেশি করে খিচুড়ি করো, বিশুও খিচুরি খেতে ভালোবাসে। আজ ওর জন্য নিয়ে যেও। "
রান্না ঘরে কল্পনার দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পরে আর বারীন বাবুর মুখটা প্রশান্তি তে ভরে ওঠে। উনি নিশ্চিন্ত ভাবে ভবিষ্যৎ প্রজম্নের দিকে তাকিয়ে থাকেন। বাইরে কালো মেঘের ফাঁকে রোদ্দুর দেখা যায়।
----------- সুস্মিতা সেন
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন