শনিবার, ১৬ জুলাই, ২০২২

ঠাকুমা ও লোলিতা

   শনিবারের সকাল - 

'টাকা না দেওয়াই পাটনায় গৃহবধূকে  অভিযোগ - পাটনায় সীতাকুন্ড এলাকায় টাকার দাবিতে গৃহবধূকে সানস্রোধ করে খুনের অভিযোগ উঠলো স্বামী ও  সদস্যদের বিরুদ্ধে' - লোলিতা গড়গড় করে   খবরের কাগজ পড়ছে , সামনে লোলিতার মা আর ঠাকুমা  সকালের চা টা  নিয়ে বসলো। " কি সব আজে বাজে খবর,  ভালো খবর হয় না রে লোলিতা ?" - ঠাকুমা  জিজ্ঞেস করলো।  "বাজে খবর আবার কি ঠাকুমা? খবর মানেই তো খবর ই, নিশ্চই ঘটেছে।   এই জন্যে আমি বলি বিয়ে টিয়ে আমি করবো না।  এই সব পন - টন আমার  এক্কেবারেই সহ্য হয় না।  'ধুর তোর বিয়েতে আমরা পন দিতে যাবো কেন ? এখনকার দিন এ আর পন দেওয়া নেওয়া হয় না।  " ঠাকুমা র  গলায় বেশ একটা বিশ্বাস।  বেঙ্গল এ পণপ্রথা সেইভাবে কোনোদিনই ছিল না।  তোর দাদু র বাবা, মানে আমার  শশুড়মশাই  ও কোনো পন দাবি করেন নি জানিস।  আমার বাবা র যা ইচ্ছে হয়েছিল দিয়েছিলো।  তবে বাবা যে কম দিয়েছিলো তা কিন্তু না।  পন দাবি করে নি তো কি হয়েছে, আমাকে কিন্তু আমার বাড়ির থেকে বেশ সাজিয়ে গুছিয়ে পাঠিয়েছিল - ১৩ ভরি শোনা, অর্ডার দিয়ে বাড়িতে বানানো  সেগুন  কাঠের পালঙ্ক , বসার চেয়ার , সাজার টেবিল - কি  যেন বলিস তোরা - Dressing table ,  Gramophone record  - সব দিয়েছিলো।  আমার শাশুড়ি, মানে তোর বাবা র ঠাকুমা রে , কি খুশি - বললে "সাক্ষাৎ লক্ষী  এলো ঘরে" . খুব ধুম ধাম করে আমার বাবা আমার বিয়ে দিয়েছিলো জানিস।  

তাই নাকি ঠাকুমা? আর মা কে নানু কি দিয়েছিলো? তোর  মায়ের বাড়ির  থেকেও আমরা কিচ্ছু দাবি  করি নি।  তোর দাদু আর বাবা এই পুনপ্রথার  এক্কেবারে বিরুদ্ধে।  তবে তোর মা কেউ তোর নানু বেশ সাজিয়ে পাঠিয়েছিল।  এই শুনে ললিতার মা এর মুখে এক গাল হাসি, গর্বে মুখ জ্বলজ্বল করে উঠেছে।  চা এর কাপ তা নামিয়ে রেখে লোলিতা র মা এবার এবার হিসেবে দিতে শুরু করলো - ১০ ভরি শোনা, জোরোয়ার একটা সেট , সেগুনের খাট ইত্যাদি ইত্যাদি।  ঠাকুমা বললো ' শোন্ লোলিতা এই পণপ্রথা জড়িত এরম বাজে খবর বিহার, ইউ পি টেই পাবি।  আমাদের দিকে এইসব অনেক দিন আগেই উঠে গেছে। বুঝলি ? " 

উঠে গেছে তো বুঝলাম ঠাকুমা , কিন্তু তও তো দেখছি তোমরা দুজনেই বেশ গর্বের সাথে হিসেবে দিলে তোমাদের বাবা রা তোমাদের বিয়েতে কেরাম তোমাদের সাজিয়ে গুছিয়ে শশুরবাড়ি পাঠিয়েছে।  এবার যদি আমি এই সব জিনিস না নিতে চাই , বাবা দিতে চাইলেও না , তাহলে কি আমি শশুড়বাড়ির লক্ষী হবো ? 

মা ঠাকুমা দুজনেই চুপ।  

"The Dowry Prohibition Act enacted on July 1, 1961, in India prohibits the giving or receiving of a dowry. The law defines a dowry as property or valuable security given by either party to the marriage, or by the parents of either party, or by anyone else, in connection with the marriage."

রোববার সকাল - 

'সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ  - বাবা কে কোর্টে তুললো মেয়ে।  সম্পত্তি বিভাজন নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই অশান্তি চলছে হাওড়া জিলা র বালি এলাকার ঘোষ পরিবারে।  সুবীর ঘোষ ও ওনার স্ত্রী সব সম্পত্তি ছেলে সায়ন্তন ঘোষ এর নাম এ লিখে দেওয়ার মেয়ে সোনালী ঘোষ এর চরম আপত্তি। সোনালী ও তার স্বামী বালিতেই থাকে। সোনালী র স্বামী এক বোরো ইন্সুরেন্স কোম্পানি র ম্যানেজার।  সোনালী র বক্তব্য যে গত দু বছর আলোচনা র পরেও তার বাবা ও মা নিজেদের সিদ্ধান্ত থেকে নড়েনি আর এই সমস্যার কোনো মীমাংসা করা যায়নি , তাই সে বাধ্য হয়েছে  আইনের সাহায্য নিতে। " লোলিতা রোজকার মতন নিজের মনে আবার গড় গড় করে খবরের কাগজ পরে চলেছে।  ঠাকুমা ও মা সকালের চা নিয়ে সামনে বসে।  

'এ আবার কেমন কথা ? মেয়ে বাবাকে কোর্ট এ তুললো , তও বাবা র সম্পত্তি পাওয়ার জন্যে।  ' ঠাকুমা শুরু করলো।  'হ্যাঁ ঠাকুমা  আইন অনুযায়  - বাবার সম্পত্তি তে  যে মেয়ের সমান অধিকার। সোনালী ঘোষ ন্যায্য দাবি করছে। ' লোলিতা বেশ উত্তেজনার সাথে বললো।  ' যাই বোলো বাপু, বাপের জন্মে শুনি নি মেয়ে রা সম্পত্তি দাবি করে।  তও বুঝতাম যদি অবিবাহিত বা বিধবা মেয়ে। দিব্বি ভালো বাড়িতে বিয়ে হয়ে মেয়ে। কোথায় শান্তিতে নিজের সংসার করবে না এখন বাবা র সম্পত্তি র জন্যে মামলা করছে।  

জানিস, তোর দাদুর বাবা , মানে তোর বাবার ঠাকুরদা, আমার শশুরমশাইয়ের র বিশাল জমিদারি ছিল।  বিশাল বাড়ি, অনেক জমি জায়গা, আমাদের কত ধান হতো , পুকুরে মাছ। .. তুই তো আমাদের রামচন্দ্রপুরে এর বাড়িতে গেছিস তাই  না? তোর মা ওনাকে দেখেছে।  তোর মা র যখন বিয়ে হয়ে আসেন উনি বেঁচে ছিলেন।  যেমন জমিদারি চেহারা সেরম দাপট। যাইহোক, ওনার ৫ ছেলে আর এক  মেয়ে ছিল।  তোর বাবার এক মাত্র পিসি, আমার এক মাত্র ননদ।  ননদের বেশ ভালো বাড়িতে বিয়ে হয়েছিল। স্বামী র পরিবারের বিশাল মসলা র ব্যবসা।  জানিস, ওদের বাড়িতে গেলে কি সুন্দর মসলার সুগন্ধ আসতো। প্রান্ত চনমনে হয়ে উঠতো।  কিন্তু ব্যবসা সে তো ওপর নিচ চলতেই থাকে। হটাৎ সেই সময় পর পর তিন বছর বর্ষায়  খুব বৃষ্টি হলো।  তাতে ব্যবসায়ী অনেক ক্ষতি হলো।  অতিরিক্ত আদ্রতার জন্যে অনেক মসলা ভাড়ারেই নষ্ট হলো।  এদিক ওদিকের ধার দেনা - সব মিলিয়ে আমার নন্দাই আর ব্যবসা টাকে ফিরে  দাঁড় করাতে পারলেন না।  আমার শশুরমশাই কিছু সাহায্য করেছিলেন , কিন্তু তাতে সেরম লাভ কিছু হলো না।  অগত্যা ব্যবসা বন্ধ করতে হলো।  যাইহোক, সে অনেক পুরোনো কথা।  যা বলছিলাম, আমার ননদের পরিবার সেই সময় সচ্ছল না থাকলেও সম্পত্তি ভাগের সময় যখন আমার শশুরমশাই মনিদি, মানে তোর বাবার পিসিকে ভাগ দিতে চাইলো সে কিছুতেই নিলো না।  ভাইদের সম্পত্তি তে কোনো দাবি করলো না।  খুব উঁচু মাপের মানুষ ছিলেন আমার ননদ।  কত ভালো সম্পর্ক ছিল আমাদের সাথে।  আমাদের সময় বাবা এই সব মেয়েদের সম্পত্তি দাবি নিয়ে কোনো ঝামেলা ছিল না।  এরম অদ্ভুত আইন ও ছিল না।  

কিন্তু ঠাকুমা এই যে তুমি বোলো আজকাল ছেলে - মেয়ে সব সমান। তো এখানে সমান কি করে হলো।  ছেলে র জেরোম বাবা মেয়ে র ও তো বাবা।  ছেলে যদি বাবা র সম্পত্তি পাই তো মেয়ে কেন বঞ্চিত থাকে? সমান কি করে হলো তাহলে? এই নতুন আইন তো সমান করার চেষ্টা করছে। সেটাতে তোমার আপত্তি কেন? ললিতার যুক্তিবাদী মনের প্রশ্ন। 

'কি যে বলিস ? সমান মানে কি সম্পত্তি নিয়ে  ভাগাভাগি? এই যে তোদের বাবা তোকে আর ভাইকে সমান ভাবে পড়াশুনো করেছে, এরপর কলেজ পাঠাবে, তারপর দুজনেই চাকরি করবি - এইগুলো কত পাওয়া বলতো ? এইটাই তো সমান। আমাদের সময় আমরা কোথায় স্কুল এ গেলাম। ১৮ বছর বয়সে বিয়ে হয়ে গেলো , বেশ তারপর সংসার। সম্পত্তি কি সব হলো? ' 

'তুমি যেগুলো বললে সেগুলো তো basic needs এ পরে  ঠাকুমা।  যাই হোক তোমাকে আর এই নিয়ে বোঝাবার সময় নেই আমার' লোলিতা বেশ রেগেই বললো।  

ললিতার মা এবার বলে উঠলো ' এই দেখ না ২ ম্যাশ আগে আমি যে মামারবাড়ি গেছিলাম , তখন তো আমি আর তোর মাসি আমাদের ভাগের সম্পত্তি লিখে দিলাম তোর মামাদের। আমার যথেষ্ট আছে , আমি কেন ভাইদের সম্পত্তি নেবো? সমাজ বলে তো একটা জিনিস আছে বুঝলি লোলিতা ? লোক এ কি বলবে আমি যদি এখন বাবা র সম্পত্তি দাবি করি।  সবই কি আইন মেনে হয় ? ' 

সব শুনে লোলিতা প্রশ্ন করলো - ' তাহলে যা বুঝলাম তোমরা বলছো আইন না মেনে সমাজের প্রাচীন প্রথাগুলো বজায় রাখতে ?' মা, আইনত নানুর  সম্পত্তি খালি তোমার ভাইদের সম্পত্তি কি করে হলো ? ইটা তুমি ভাবচই  বা কেন ? তোমার সমান অধিকার আছে নানুর সম্পত্তি র ওপর।  তাছাড়া বড়মামা আর ছোটমামা র ও তো অনেক আছে তো োর কেন তোমার প্রাপ্য সম্পত্তি তে ভাগ বসলো? 

ঠাকুমা, নিজের কম  বাবার পিসি যখন সম্পত্তি র ভাগ নিলো না তখন তোমাদের কারুর মনে হলো না তাকে ভাগ দেওয়ার কথা।  ওনাকে ভাগ না দিয়ে তোমরা তো ভুল করেছো।  তখন কোন সমাজ পিসিঠাকুমার সংসার এর কথা ভাবলো ? পিসিঠাকুমা তো না হয় উঁচু মাপের মানুষ ছিলেন বললে, কিন্তু  দেখেছো তোমাদের চিন্তাধারা কতটা regressive - দাড়াও রিগ্রেসিভ এর বাংলা বলি - 'পশ্চাদ্গামী,  প্রত্যাবর্তী, পশ্চাদমুখী/  বুঝলে ? জাজহীন আইন ছিল না তখন সেটার সুবিধে নেওয়া হতো আর এখন আইন আছে তো সমাজ এর নাম করে সেটা পাস্ কাটিয়ে যাচ্ছ।  

"The Hindu Succession (Amendment) Act, 2005 (39 of 2005) was enacted to remove gender discriminatory provisions in the Hindu Succession Act, 1956. Under the amendment, the daughter of a coparcener shall by birth become a coparcener in her own right in the same manner as the son. "





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন