শনিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৪

পুরুষ সিংহ

"আমার আজ একটা meeting  আছে  তুমি চা টা করে নিতে পারবে ? চা এর কৌটো বার করে রেখেছি।" কানে হেডফোন গুঁজতে গুঁজতে রিনি জিগেশ করলো। 

"ওহ... আচ্ছা ঠিক আছে" বোধয় একটু ইতস্তত করে প্রভাত জানালো। প্রায় ৩ মাস হলো তাদের বিয়ে হয়েছে।  কিন্তু এরকম দাবি রিনি আগে কখন করে নি। প্রভাতের কপালে চিন্তার রেখা। রান্নাঘরের দিকে তাকিয়ে প্রভাতের চিন্তা আরো গভীর হয়ে গেলো। তাঁদের "Love Marriage". কিন্তু বিয়ের মাত্র ৩ মাসের মধ্যেই কি ভালোবাসায় ফাটল ধরলো ? চা পাতার কৌটো হাথে নিয়ে প্রভাত ভাবতে লাগলো। 

চা করা তো দুরে থাক, জীবনে এই প্রথম প্রভাত গ্যাস জ্বালাতে চলেছে। সে কখনো দেখেনি তার বাবাকে রান্না ঘরে পা দিতে। তাদের বাড়িতে ছেলেদের ঘরের কাজ করার প্রথা ছিল না।  এমনকি বাড়ির মহিলাদের মতে রান্নাঘর টা পুরুষ সিংহ দেড় জায়গা নয়। ওটা মহিলাদের তত্ত্বাবধান এই থাকা ভালো। তাই প্রথামত রোধনশালার সাথে প্রভাতের সম্পর্ক ওই নামমাত্র।   

প্রাণের প্রতি ভয় আর রিনির  প্রতি রাগ এই দুই নিয়ে গ্যাসের knob  তা ভালো করে পরীখ্যা করলো প্রভাত ।  On - Off - Sim তিন  টা option দেখা যাচ্ছে।  On -Off  টা  তো বোঝা গেলো, কিন্তু sim মানে কি ? Simulation ? Simple ? Sympathy ? না না Sympathy হতে পারে না।  ওটা অন্য বানান।  অগ্নিকাণ্ডের সম্ভাবনা এড়াতে গ্যাস জ্বালানোর উদ্যোগ তা বাতিল করে দিলো প্রভাত। সে পেশায় ইঞ্জিনিয়ার তাই একটা বিকল্প বার করে ফেলতেই পারবে।  তাছাড়া তার মতে সারা বিশ্ব এখন electric এ শিফট করে যাচ্ছে। এই বাজারে গ্যাস জ্বালাতে না পারাটা এমন কিছু না।  অতয়েব microwave এর দিকে focus shift করা হলো। "How to make tea in microwave" - Google করতেই বেশ কয়েক পাতা রেজাল্ট পাওয়া গেলো। কাপ এ জল নিয়ে ভিতরে রেখে দাও।  একটা বোতাম টেপ।  ব্যাস এক মিনিটের মধ্যে জল গরম।  তারপর  চা পাতা।  নতুন  উদ্যোগ এর উত্তেজনায় প্রভাত এক কাপ জল microwave এর ভিতরে রেখে দিয়েছে।  দরজা বন্ধ করে ফেলেছে।  এখুনি জল গরম হয়ে যাবে। আসন্ন বিশ্ব জয়ের আনন্দ প্রভাতের চোখে মুখে প্রকট।  খালি একটা বোতাম টেপার অপেক্ষায়। কিন্তু এখানেই হলো বিপদ। কোন বোতাম ? ইন্টারনেট এ বললো "express" বোতাম তা টিপতে।  কিন্তু এই microwave এ তো "এক্সপ্রেস" বলে কোনো বোতাম নেই। 

Microwave  এর model টা  দিয়ে google  করে জানা গেলো যে এই বিশেষ model এ জল গরম করার প্রথাটা একটু অন্যরকম। কোনো বড় ব্যাপার নয়। এক মিনিট পর microwave  এর পি পি আওয়াজ সংকেত জানালো যুদ্ধ জয় হয়ে গেছে। চা পাতার কৌটো হাথেই ছিল।  গরম জলে ভরা কাপ টা বার করে এবার চা বানাও হবে। চা এর রেসিপির বাকি অংশটা পরে ফেললো প্রভাত। "Put the tea bags in and steep them for ২ minutes". জাহ, আবার বিপদ।  Tea bag এর অংশটা সে আগে লক্ষ্য করে নি। তার কাছে তো টি ব্যাগ নেই। খালি পাতা চা। Research করে জানা গেলো যে microwave এ পাতা চা বানানো একদমই সহজ নয়। 

ইতিমধ্যে রিনির মিটিং শেষ হয়ে গেছে। রান্নাঘরে ঢুকে সে তো অবাক। সেই এখনো চা খাও নি ? আধ ঘন্টা ধরে কি করলে ? প্রভাতের রাগের পারা এবার মাত্রা ছাড়াচ্ছে। অনেক কষ্টে রাগ সংযম করে দাঁতে দাঁত চিপে বললো "গবেষণা করছিলাম". তাকে উপেখ্যা করে রিনা ইতিমধ্যে চা বানিয়ে ফেলেছে।  "এই নাও চা। " প্রভাতের গালে আদর করে হাত তা বুলিয়ে মিষ্টি করে বললো "চা যে বানাতে পারো না, সেটা বললেই পারতে, আমি কি না করতাম ?".

নিমেষের মধ্যে প্রভাতের রাগ গলে জল। এমন মধুর বাণীর পর কি অরে অভিমান করে থাকা চলে ? কিন্তু একটা দ্বন্ধ তাঁর মনে বাসা বাঁধছে। এই romantic gesture টার পেছনে কি কটাক্ষ লুকিয়ে আছে ? "চা বানাতে পারো না" এই কথাটা কি প্রভাতের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরছে ? সে নিজেকে পুরুষ সিংহ মনে করে - আর পুরুষ সিংহ কিছু পারে না এমন হতেই পারে না।  প্রভাত স্থির করলো এই লাঞ্ছনার বদলা সে নেবেই। কিন্তু এই পুরো কার্যসিদ্ধি করতে হবে সবার চোখের আড়ালে।  লোকে জানতে পারলেই চরম বেইজতির সম্মুখীন হতে হবে। Hollywood action সিনেমার ভক্ত প্রভাত এর নাম দিলো অপারেশন সিংহ। 

কিছুদিনের  মধ্যেই গুপ্তচরের মতন রিনির  থেকে প্রভাত কিছু তত্ত্ব আবিষ্কার করেছে। এই যেমন রান্না করতে গেলে দুটো জিনিস খুব জরুরি।  কি রাঁধবে ? আর কিভাবে রাঁধবে ? 

Engineer মানুষ প্রভাত একটা বেশ detailed ফ্লোচার্ট বানিয়ে ফেললো। যদি সবজি রাঁধবে তাহলে কি সবজি  রাঁধবে ? আলু, পটল, ফুলকপি, ঝিঙে ইত্যাদি। ডাল বানাবে ? তাহোলে কি ডাল ? মুগ, মুসুর, কলাই ? আমিষ খাবে ? তাহলে decide করো মাছ খাবে না মাংস খাবে ? ডিম্ ও খেতে পারো। এইটা confirm হয়ে গেলে এবার স্থির করতে হবে কি ভাবে রান্না করবে ? মানে ঝোল হবে, না tight ? সেদ্ধ হবে নাকি fry ? শুধু তাই নয়, youtube এ ভিডিও দেখে সে আন্দাজ করেছে কোন preparation সহজ আর কোনটা কঠিন। তার basis এ একটা করে difficulty score দিয়েছে।  যেমন তার মনে হয়েছে ডাল ব্যাপারটা বেশ সোজা তাই তার স্কোর কম. আবার পাঠার মাংসের কষা বেশ কঠিন। তাই তার স্কোর অনেক বেশি। এক সপ্তাহ ধরে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে প্রভাতের homework তৈরী।  এবার execution এর পালা। 

পুরো ব্যাপারটা গোপনে করতে হবে।  তাই রিনির অফিস থেকে ফেরা আগেই তাকে ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলতে হবে।  শুক্র বার দুপুর বেলা তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফায়ার এসেছে প্রভাত।  আগে থেকেই স্থির করা ছিল সে ডাল বানাবে। রেসিপির ভিডিও ডাউনলোড করা আছে।  বাড়িতে ডাল বানানোর সামগ্রী ও সব আছে।  এখানেই বলে নেওয়া উচিত যে Youtube এ কয়েকটা ভিডিও দেখে প্রভাত ইতিমধ্যে গ্যাস জ্বালাতে শিখে গেছে। আর হ্যা Sim কথাটার মানেই সে এখন জানে। 

বাড়ি ফিরে মুখ হাত ধুয়ে সোজা রান্না ঘরে প্রবেশ। আজ আর তার অহংকারে কোনো আঘাত পড়ছে না। এই রান্নাঘর কে জয় করতেই হবে । রেসিপি মিলিয়ে সে এক েকে সব সামগ্রী রান্নাঘরের কাউন্টার এর ওপর রেখেছে। একদম মাপ করে ডাল, তেল, নুন, জিরে, হলুদ আর জল বাটিতে বাটিতে করে সাজানো। রেসিপি অনুযায়ী ৫ বার ডাল ধোয়া হয়ে গেছে।  প্রেসার cooker এর মধ্যেই প্রথমে জিরে তা ভেজে নিয়ে ডাল , জল, নুন, আর হলুদ দিয়ে ঢাকা দেওয়া হয়ে গেছে। গ্যাস জ্বলছে।  এবার প্রতিখ্যা । খালি ৩ তে সিটি - ব্যাস কেল্লা ফতে । 

Cooker এর সামনে ঠায়ে দাঁড়িয়ে আছে প্রভাত।  যেকোনো সময় সিটি মারা শুরু হবে।  কিন্তু সিটি আর হচ্ছে না। খালি ধুয়ো বেরোচ্ছে। এবার প্রভাতএর একটু একটু চিন্তা হতে শুরু করলো।  রেসিপির ভিডিও তে তো দেখলে ১০ মিনিটের মধ্যে সিটি দিয়ে দেবে। এখানে তো প্রায় আধ ঘন্টা হতে চললো। কিছু স্টেপ miss হয়ে গেলো কি ? সে ভালো করে আবার ভিডিও তা প্রথম থেকে দেখতে থাকলো - আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই নিজের  ভুল তা আবিষ্কার করলো।  সে এটি অ্যামেচার, যে pressure cooker এর সিটি টাই লাগে নি। ভীষণ রাগ হলো।  কিরকম irresponsible youtuber রে বাবা।  সিটি টা লাগানোর কথা তা বেমালুম চেপে গেছে। কিন্তু এখন মাথা গরম করার সময় নেই।  গ্যাস বন্ধ করে খুব সন্তর্পনে pressure এর ঢাকনি তা খুলেছে।  ভিতরে তাকিয়ে আতঙ্কে তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেলো।  ডাল আর ডাল নেই পুরো মাখা সন্দেশ হয়ে গেছে।  এবার কি হবে ? 

প্রভাত স্থির করলো এই বিপর্যয় এর সব প্রমাণ লোপাট করে ফেলতে হবে। সমস্ত সামগ্রী জায়গা মতন গুছিয়ে ফেলেছে।  রান্নাঘর পরিষ্কার করে ফেলেছে।  এবার প্রেসার থেকে মাখা সন্দেশ রুপি ডাল বার করে ফেলে দিলেই সব পরিষ্কার।  প্রেসার তা নিয়ে ডাস্টবিনের দিকে এগোতে যাবে - এর মধ্যে হঠাৎ রিনির প্রবেশ। 

ভূত দেখার মতন pressure cooker হাথে নিয়ে প্রভাত কিংকর্তবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। "ওমা pressure নিয়ে কি করছো ?" - রিনি অবাক হয়ে জিগেশ করলো।  "ওকিছু না সরিয়ে রাখছিলাম। তুমি তৈরী হয়ে নাও, আজ বাইরে ডিনার" প্রভাত প্রশ্ন বদলের চেষ্টা করলো। তাকে অগ্রাহ্য করে রিনি এগিয়ে এসে তার হাত থেকে প্রেসারে তা টেনে নিলো। রিনির চোখ ছলছল করে  উঠলো । প্রভাত মেঝের দিকে চেয়ে আছে। মালসমেত ধরা পড়া চোরের মতন সাজার অপেখ্যা করছে। "তুমি আমার জন্য ডাল মাখা বানিয়েছো ? ডাল মাখা আমার favorite. মা ছাড়া কেউ বানাতে পারে না " রিনির কথায় প্রভাত চমকে উঠলো। ডাল মাখা ? সে আবার কি ? প্রভাত জবাব দেওয়ার আগেই রিনি তাকে জড়িয়ে ধরে বললো "I Love You". প্রভাত কিছুই বুঝতে পারছে না।  কিন্তু এই পরিস্থিতে এর চেয়ে better outcome আশা করা যায় না।  

সেদিন ডিনার এ বাইরে যাওয়া হয় নি।  রিনি রুটি বানিয়েছে আর তাই দিয়ে এই accidental ডাল মাখা খাওয়া হয়েছে।  খেতে মন্দ হয় নি।  শুধু পরের বার থেকে জিরে আর জোয়ানের ফারাক তা জেনে রাখতে হবে।  কিন্তু তাতে কিছু এসে যায় না কারণ  সেদিন রান্নাঘর কে জয় করেছিল পুরুষ সিংহ প্রভাত !

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন