শনিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

Acceptance

 দরজা খুলে দেখে চায়ের কাপটা যত্ন করে টেবিল এর ওপর রাখা।  কোস্টের টা ও নিজের জায়গায় আছে।  সামনে গিয়ে দেখলো কাপের নিচে শেষ টুকু চা এখনো পরে আছে।  আজকের Telegraph টাও পাশে ভাঁজ করে রাখা , স্পোর্টস এর পেজটাই সামনে আছে।  রুপা র বাড়িতে সবাই স্পোর্টস নিয়ে ভীষণ প্যাশনেট।  ও ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে বাবা, কাকা , পিসিরা সবাই স্পোর্টস নিয়ে খুব উৎসাহিত ।  ক্রিকেট আর ফুটবল হলে তো কোথায় নেই।  সেই সিউড়ি র বাড়ির সামনের ঘরে টিভি তে যখন ক্রিকেট ম্যাচ  গুলো হতো, সারা ঘর জুড়ে সবাই মিলে  বসে ঝাল মুড়ি খাওয়া আর ম্যাচ দেখা, সে কি আনন্দ।  ঘর ভর্তি কত লোক।  দুই কাকা ই ব্যাডমিন্টন খেলেছে স্টেট লেভেল এ।  বাবা ক্রিকেট ফুটবল দুটোই কলেজ লেভেল এ খেলতো। খুড়তোতো পিস্ততো ভাই বোনদের সাথে গরমের ছুটির সময়  সেই খালি রাত রাত সৌরভ দ্রাবিড় সচিন নিয়ে গল্প, হটাৎ একরাশ স্মৃতি ভেসে এলো। গত রোববার রুপা যখন এসেছিলো তখন ও সে এরমটাই দেখেছিলো, সেদিন অবশ্য এতো স্মৃতি ভেসে আসে নি। আগের রোববার এর থেকে এই রোববার টা তো  অনেকখানি আলাদা। আগের দিন কি চায়ের কাপে  এ শেষ এর চা টা ছিল ? রুপা ঠিক মনে করতে পারলো না।  ও তো সেদিন অটো খেয়াল এই করে নি।  

বসার ঘরে সাথেই দিননিং টেবিলটা।  আজকাল কার ফ্লাট গুলো যেমন হয় - Drawing cum dinning . দিনদিন টেবিল এর ওপরে একটা থালা এর ওপর আরেকটা থালা ঢাকা।  ওপরের থালা তা ওঠাতেই রুপা বুঝতে পারলো দুপুরের খাবার  টা  বাড়া আছে - ভাত, ফুলকপির তরকারি, সাগ।  পাশে আরো দুটো বাটি ঢাকা - একটাই মাছের ঝোল, আরেকটায় ডাল।  ডাল এ হলুদ পড়েছে কিনা বোঝাই  যাচ্ছে না।  মাছের ঝোল টা পুরো জল আর মাছ তা যেন তাকাচ্ছে।  সব কোটা রান্না খুব দায়সাড়া করে বানানো।  রুপা র মনে পরে গেলো মণিমা কি সুন্দর রান্না করতো।  এই বাড়িতেই মণিমা স্পেশাল চিল্লি চিকেন অরে ফ্রেইড রিসের কত স্মির্তি।  বড়কাকু সবসময় খুব রিচ রান্না খেতে ভালোবাসতো তাই দুপুরের খাবার এর থালা তা দেখে রুপা র একটু খারাপ এই লাগলো।  ভাবছিলো বড়কাকু এরম রান্না নিশ্চই ভালোবেসে খেত না।  ভাবতে ভাবতে রান্নাঘর এ গেলো।  মণিমা চলে যাওয়ার পর এই প্রথম রুপা এই বাড়ির রান্না ঘর এ ঢুকলো।   গ্যাস এর পাশে আরো কিছু বাতি ঢাকা ছিল।  খুলেই বুঝলো ফ্রিজ এ ঢোকাবার জন্যে রাখা আছে , তোলা হয়ে আর ওঠেনি।  রান্নাঘরটা কি সুন্দর পরিষ্কার করে গোছানো। মণিমা র রান্নাঘর কখনোই এতো পরিষ্কার থাকতো না।  চোদ্দ বছর হয়ে গেলো মণিমা চলে গেছে।  এর মধ্যে রুপা তো কতবার এই বাড়িতে এসেছে, কিন্তু আর কখনো রান্নাঘর এ ঢোকেই নি।  কেনই বা যাবে রান্নাঘর এ তো কারোর সাথে তো দেখা করার এই ছিল না ।  মালাটি এই রান্নাঘর থেকে খাবার, জল যা দরকার, নিয়ে আস্ত।  এতো বছর ঢুকে তাই কত অন্যরকম লাগছে।  এটা তো আর মণিমা র রান্নাঘর নোই তাই আলাদা তো হবেই।  রান্নাঘর এর পাশেই বাথরুম।  বাথরুম খুলে দেখলো ঠিক একইরকম।  সিনথল রের সাবান আর লিফেবুয়ায় এর হ্যান্ডওয়াশ - দুটো  যে জায়গায় থাকে সেখানেই আছে।  দরজার পিছলে বোরকাকু র তোয়ালে তা ও ঝোলানো।  রুপা দরজা তা বন্ধ করে দিলো।  বোরকাকুর ব্র্যান্ড লয়াল্টি তা একই থেকে গেলো।  বাথরুম এর পাশে সৃজা র রুম তা।  দু বছর আগে সৃজা র বিয়ে হয়।  এই বাড়িতেই কত হৈচৈ।  সৃজা র রুমটা ভর্তি ওর তত্ত্বে র থালা সাজানো ছিল।  গত বছর সৃজা লন্ডন মুভ করে যাই।  চৈ ম্যাশ আগে এসেছিলো তখন রুপা র সাথে দেখা হয়েছিল।  বিছানার চাদর তা টানটান করে পাতা , পাশে কম্পিউটার টেবিল এ কম্পিউটার তা ঢাকা দেওয়া , টেবিল এ হালকা ধুলো র ইটা লেয়ার।  দেখেই মনে হচ্ছে বেশ কয়েকদিন এই রুমটা ব্যবহার করা হয়নি।  

সৃজা র পাশের ঘরটা বোরকাকুর শোয়ার  ঘর ।  আগে এটাই মণিমা আর বোরকাকুর শোয়ার  ঘর ছিল।  ঘরটাতে ঢুকে রুপা র মনে হলো কতদিন যেন এই ঘরটাতে ও ঢোকে নি।  বিছানা তা পরিষ্কার করে পাতা আর তার ও পর বেশ কয়েকটা শার্ট  আর পাঞ্জাবি আইরন করে এনে রাখা ।  জামাকাপড় আয়রন বোরকাকু র চাই।  আজকে ফ্লাট এ আসার সময়  নিচের আইরন ওয়ালা র  সাথে রুপা র দেখা হলো।  রুপা কে দেখে সে আজকে আর হাসে নি। ঘরটার চোখ ফেরাতেই দেখতে পেলো বেডসিডি টেবিল এর পাশে মণিমা র একটা ছবি রাখা। রুপা ছবিটা হাতে তুলে নিলো।  রুপার মনে হলো ছবিটা যেন কথা বলছে। রুপা এই ছবিটা তো আগে কোনোদিন দেখেনি।  ছবিটার  মুখে যেন একটা মৃদু হাসি।  চোখ গুলো যেন কথা বলছে।  সারা বাড়িতে রুপা একা।  রুপা ছবিটা নিয়ে বিছানাটাই বসে পড়লো।  ছবিটার দিকে অনেক্ষন চেয়ে থাকলো।  তারপর হাউহাউ  করে কেঁদে উঠলো।  এতক্ষন ধরে যে প্রশ্নের উত্তর  হয়তো রুপা খুঁজছিলো ছবিটা যেন সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলো।  

আজ সকালে পুলিশ এর ফোনে  রুপার বাবা খবর পাই যে তার মেজো  ভাই আর নেই।  রাস্তায় পরে মারা গেছে, রাস্তার লোক পিপলিসে খবর দিয়েছে ।  রুপা সকাল থেকে মা, বাবা, ছোটকাকু, ছোটকাকিমা সবাইকে  সামলিয়ে , পুলিশের এর সব ফর্মালিটি করে বড়কাকু র বাড়ির চাবি নিয়ে একাই  এসেছিলো।  সারাদিন ধরে বাকি সবার মতন সব কাজের মাঝে নিজেকে প্রশ্ন করে যাচ্ছিলো - কি করে হলো? কেন হলো? কাল এই কথা হলো , সব ই তো ঠিক ছিল। . .. ইত্যাদি ইত্যাদি।  মণিমা র ছবিটা হাতে নিয়ে ওর যেন সবটা স্পষ্ট হয়ে গেলো।  চোদ্দ বছর হয়ে গেলো মণিমা চলে গেছে।  সৃজা বোরো হলো, ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করলো, বিয়ে হলো আর এই ৬ ম্যাশ আগে সৃজা র একটা ছেলে হলো।  মণিমার হয়তো এবার বড়কাকু কে বেশি দরকার আমাদের চেয়ে।  চোদ্দ বছর তারা আলাদা আছে এবার তো একসাথে থাকবে।  বিছানায় বসে রুপা চারিদিকে চোখ ফেরালো - সবটা  একই আছে, -  মানুষগুলো আর নেই।  বড়কাকু মণিমা র বাসা টা  হটাৎ যেন খালি ইট পাথরের বাড়ি হয়ে গেলো।  

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন