রবিবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৩

"Mailbox" অভিযান

সকাল সকাল email  account তা খুলেই মেজাজ তা খিচড়ে গেলো।  না, নতুন করে কোনো বিকট email এর অবির্ভাব ঘটে নি। কেউ আমায় টাকা দিতে চাইছে না - কেউ নিতেও চাইছে না।  আমার গাড়ির extended warranty নিয়ে অজানা-অচেনা সুনাগরিক দের কোনো মাথা ব্যাথা নেই। রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার কোনো উপায়ের সংকেত ও চোখে পড়লো না।  সব একদম শান্ত, নিরিবিলি - ঠিক যেমনটি হওয়া উচিত। বিপদ তা হলো screen এর নিচে ডানদিকে একটা ছোট্ট বার্তা দেখে। "Your email storage is full. Please free up space to continue to send or receive emails". ভাবছেন এতে এতো চটে যাবার কি আছে ? অনেক কারণ আছে। বছর কুড়ি আগে যখন এই email account টা খুলেছিলাম, তখন email company  আশ্বাস দিয়েছিলো যে আমায় কোনোদিন email delete করতে হবে না।  সমস্ত স্মৃতি চিরকালের মতন কয়েদ হয়ে থাকবে এই ছোট্ট inbox টার মধ্যে। এমনকি প্রথম কয়েক বছর তো email delete করার কোনো উপায় ছিল না।  কি আত্মবিশ্বাস ! ফলে আমিও কোনোদিন পুরোনো email delete করার চেষ্টাও করি নি। বন্ধু-বান্ধব, পরিবার-পরিজন, কর্মক্ষেত্রের email, নিজেকে পাঠানো জরুরি document, কয়েকশো পুরোনো ছবি - আমার জীবনের শেষ দুই দশকের ইতিহাস সযত্নে আগলে রাখা আছে এই email account এ। তবে, ইদানিং কালে রাজ্যের ইমেইল মার্কেটিং এর জঞ্জালে ভোরে গেছে inbox. ক্রেডিট কার্ড, হোম লোন, কার লোন, কোটিপতি হবার উপায়, রোগ হবার উপায়, প্রেমে সাফল্যের উপায় - ক্রেতা, বিক্রেতা আর ঠকবাজদের কুরুক্ষেত্রে আমি জেরবার হয়ে গেছি । হাজার হাজার অবান্তর, অনর্থক, ওঁচা ইমেইল এ ভোরে গেছে inbox. এই সব আগাছা পরিষ্কার করা যে কি দুরহ কাজ সে আর বলে বোঝানো যাবে না।  কিন্তু অরে কোনো উপায় ও নেই।  তাই মনে সাহস নিয়ে, হাত গুটিয়ে নেবে পড়লাম "স্বচ্ছ mailbox" অভিযানে। 

শুরু করলাম অবান্তর ইমেইল গুলো দিয়ে।  কিন্তু প্রথম দুপাতা পেরোতেই বুঝতে পারলাম যে এই গতিতে এগোলে আমার সারা জীবন লেগে যাবে এই কার্য সিদ্ধি করতে।  ঠিক করলাম, পিছন থেকে শুরু করি। মানে সবচেয়ে পুরোনো ইমেইল গুলো থেকে ডিলিট করা শুরু করি।  এতো পুরোনো ইমেইল এর বোধয় অরে প্রয়োজন হবে না।  নিজের ওপর বেশ গর্ব বোধ করে সোজা চলে গেলাম একদম শেষের পাতায়।  এইবার ঘচাং-ফু করে সব ডিলিট করে দেব।  কিন্তু এখানেই শুরু হলো বিপদ। প্রথম ইমেইল তা ২০০৫ সালের জুন মাসে - বাল্য বন্ধু রাজীবের ইমেইল। 

"কংগ্রাটস ভাই, খাওয়াবি কবে ?" কিসের কংগ্রাটস ? এমন কি ভালো ঘটনা ঘটেছিলো সেদিন যে আমি ওকে খাওয়াবো ? তখন আমি কলেজ পড়ি।  বোধয় পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য অভনন্দন জানাচ্ছে। ডিলিট করতে গিয়েও করলাম না।  এই account এর প্রথম ইমেইল, এটা  থাক।  

পরের ইমেইল তা প্রদীপ্ত ব্যানার্জীর কাছ থেকে।  একটা এটাচমেন্ট এ একগুচ্ছ শপিং মল এর ছবি। সাবজেক্ট লাইন - "Dubai Documents". জাব্বাবা - এই লোক টা আবার কে ?একে তো চিনি না।  আর এরম একটা গম্ভীর subject লাইন দিয়ে ভুল ভাল দোকানের ছবি পাঠিয়েছে ? আমি আবার তাকে reply ও করেছি " Thank you sir ". ভারী চিন্তায় পরে গেলাম। ২০০৫ সালের জুলাই মাসে দুবাই এর শপিং মল এর ছবি দিয়ে আমি কি করতে চাইছিলাম ? এমনি তে আমি বেশ সাহসী প্রবিত্রীর মানুষ, কিন্তু এইসব দুবাই টুবাই ব্যাপার গুলো নিয়ে একটু অস্বস্তি হয়। কি জানি কিসে ফেঁসে যাবো ? চটপট  ডিলিট করে দিলাম। আর কোনো চিহ্ন নেই। 

পরের ইমেইল সেই অগাস্ট মাসে - সুব্রত মল্লিক এর থেকে। সুব্রত আমার কলেজের সহপাঠী ছিল। আমার ঠিক পরের রোল নম্বর। অনেক এসাইনমেন্ট আর প্রজেক্ট আমরা একসাথে করেছি। বেশ মেধাবী ছাত্র ছিল। কলেজের পরে আর সেরম যোগাযোগ ছিল না। কি জানি আজ-কাল কি করছে।  facebook আর linkedin থাকার দরুন জানতে পারলাম সুব্রত এখন বেঙ্গালুরু এ আছে।  এক বড়ো সফটওয়্যার কোম্পানিতে সিনিয়র ম্যানেজার।  ভালো লাগলো।  সুব্রতর ইমেইল তা খুললাম - "Implementation of NEMO on Linux", সাউথ ওয়েলস ইউনিভার্সিটি র একটা রিসার্চ পেপার।  একবার চোখ বুলিয়ে বুঝলাম যে আমি কিছুই বুঝলাম না। অথচ আমি বিজ্ঞের মতন  এর একটা লম্বা reply ও করেছি।  তাতে আবার গুরুগম্ভীর কঠিন কিসব শব্দ ও ব্যবহার করেছি। নিজেই আশ্চর্য হয়ে গেলাম - ২০০৫ সালে আমি এতো জ্ঞানী ছিলাম ? তাহলে এখন এরম অজ্ঞ কি করে হয়ে গেলাম ? শুনেছিলাম বয়সের সাথে সাথে মানুষের পান্ডিত্য বৃদ্ধি পায় - আমার ক্ষেত্রে তার উল্টো।  বুঝলাম মগজের ব্যাম করা বন্ধ হয়ে গেছে।  উৎকৃষ্ট মানের চিন্তা ভাবনা প্রাক্টিস করতে হবে।  তাই সুব্রতর ইমেইল তা ডিলিট করলাম না।  ওটা দিয়েই শুরু হবে আমার মগজাস্ত্রে শান দেওয়া। 

কিন্তু মগজে হাত দেওয়ার আগেই হৃদয়ের তারে টান পড়লো। পুরোনো কিছু প্রেম পত্র চোখে পড়লো। অবশ্য প্রেম পত্র বলাটা বোধয় ঠিক হবে না । কারণ এই পত্রে প্রেম কম - আদিখ্যেতা আর ন্যাকামো বেশি। "ঘুম থেকে উঠলে?", "ঘুমিয়ে পড়েছো?", "জেগে আছো?", "কি করছো?" , "কি খাচ্ছো ?" ইত্যাদি প্রশ্নোত্তর ছড়িয়ে আছে বেশ কয়েক পাতায়।  দুঃখের বিষয় টা হলো যে Amazon Alexa র এর সাথে আমি আজকাল এর থেকে উচ্চ মানের আলোচনা করেই থাকি।  তাই আশ্চর্য্য হবার কোনো কারণ নেই যখন এই প্রেমের প্রশ্ন বানের ইমেইল বর্ষণ একদিন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলো। "Select all" করে এই সমস্ত ইমেইল এক্কেবারে ডিলিট করে দিলাম। এইসব মুর্খামির উদাহরণ লুপ্ত থাকায় ভালো। 

ইমেইলের এর সময়রেখা ধরে চলতে চলতে এখন ২০০৮ সালে এসে পড়েছি। কলকাতা ছেড়ে সবে বেঙ্গালুরু এসেছি চাকরি সূত্রে। কিন্তু ইনবক্স এখনো তাজা পুরো বন্ধুদের ইমেইল এ। অকাজ এর ফরওয়ার্ড ইমেইল, আড্ডা, পুজোয় ঠাকুর দেখার প্ল্যান, একে ওপরের সাথে ঠাট্টা - এসব যেন লেগেই থাকতো দৈনন্দিন। Whatsapp / IP calling এর আগের যুগ।  সস্তায় যোগাযোগ রাখার এই একমাত্র উপায়। একটা একটা করে ইমেইল পড়ছি আর নিজের মনেই হেসে যাচ্ছি। সন্দীপ এর ভূতের ভয়, ইন্দ্রজিৎ এর বাংলায় ফেল, সৌমেন এর লাল জুতো, রাজীবের পুষ্ট শরীর - কিছুই বাদ যায় নি।  সে এক নির্ভেজাল সময় - বন্ধুদের deliberately offend করাতে কেউ offence নিতো না। এই ইমেইল গুলোর হাত ধরে আমি যেন আবার সেই পুরানো দিনেই ফিরে গেছি।  

ধীরে ধীরে কলকাতার বন্ধুদের সাথে ইমেইল আদান-প্রদান কমে এলো। দিনে ৩-৪ তে থেকে মাসে ২ টো তে এসে থেকেছে। সবাই যে যার নিজের জীবন আর কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল নিশ্চয়। অথচ আমার ইনবক্স কিন্তু তখনও ভোরে চলেছে। বেঙ্গালুরু এ নতুন বন্ধুদের আবির্ভাব। আমার সহকর্মী  Mandeep ও Ganga . জীবন যুদ্ধের সেই অধ্যায় আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। Mandeep পাঞ্জাব এর ছেলে।  পড়ুয়া, সাধা-সিধা, এক্কেবারে শান্ত শিষ্ট ল্যাজবিশিষ্ট ভদ্রলোক যাকে বলে। আর Ganga ঠিক তার উল্টো - ডানপিটে, সাহসী মারাঠি মেয়ে । আমাদের এই ৩ মূর্তির সমস্ত কুখ্যাতি বিশদ বিবরণ ছড়িয়ে আছে ইনবক্স এ। Mandeep এখন দিল্লী তে।  বছরে একদুবার ফোনে কথা হয়  । আর গঙ্গা ? তার সাথে শেষ কথা হয়েছিল ২০২১ জুলাই মাসে। সেই নভেম্বর এ Ganga আমাদের সবাই কে বিদায় জানায়।  ব্রেস্ট ক্যান্সার। তার শেষ ইমেইল টার জবাব দেওয়া হয়নি আমার। 

পুরোনো স্মৃতি মাখানো  ইমেইল গুলো পড়তে পড়তে মনটা ভারী হয়ে গেলো। চোখের দৃষ্টি বোধয় একটু ঝাপসা হয়ে এসেছে। পুরোনো email পিছন থেকে ডিলিট করার পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে backfire করেছে। শেষ ৩ ঘন্টায় আমি মাত্র ১৫২ টা  ইমেইল ডিলিট করতে পেরেছি।  আমায় করতে হবে কয়েক লখ্য। মাঝখান থেকে মন মেজাজ আরো খারাপ করে পুরো দিনটাই মাটি হবার জোগাড় । এই ভাবে হবে না। ৫ বছর আগের যত ইমেইল এসেছে সেগুলো সব সিলেক্ট করলাম। সে লখ্য লখ্য email। বেশ কয়েকবার ডিলিট বাটন এর ওপর মাউস তা নিয়ে গেলাম, আবার ফিরিয়ে আনলাম।  দ্বিধা আর দ্বন্দে ভরা এক সংঘর্ষ চলছে মনের ভিতর। কিছু অমূল্য স্মৃতি হারিয়ে যাবার আশংকা।  তখনি একটা আধুনিক ইংরিজি গানের কথা মনে পড়লো - "Nostalgia is one hell of a drug". গানের কথা গুলো মনে করিয়ে দেয় অতীতকে আটকে ধরে রাখার পরিণাম।  স্মৃতির পিছুটান জীবনে এগিয়ে যাবার রাস্তায় বাঁধা আনে। 

সত্যি তো দিব্বি ফুফুর মেজাজ এ ইমেইল ডিলিট করতে বসেছিলাম এখন মুখ গোমড়া করে, দার্শনিক হয়ে প্রবন্ধ লিখছি । নিকুচি করেছে। এক নিস্বাসে ডিলিট বাটন তা ক্লিক করে ফেললাম।  কয়েক লক্ষ্য ইমেইল - একটু বোধয় সময় লাগে কার্য সিদ্ধি হতে. চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি একটার পর একটা পাতার সংখ্যা কমে আসছে। প্রথম কয়েক সেকেন্ড একটা আতঙ্ক যেন চেপে ধরলো আমাকে - কিন্তু আশ্চর্য্য ভাবে যত পাতার সংখ্যা কমতে থাকলো তত যেন মনটাও  হালকা হতে থাকলো।  মিনিট দুয়েকের মধ্যে সব পরিষ্কার। মন আর inbox দুটুই। খালি রয়ে গেছে Ganga র করা শেষ ইমেইল টা। Reply লিখলাম - "ভালো থাকিস বন্ধু। এবার  দেখা হলে কিন্তু আর veg খাবো না". Reply টা পাঠালাম আর তার সাথেই গঙ্গার শেষ ইমেইল টাও  ডিলিট করে দিলাম। 

এবার নতুন স্মৃতি বানানোর পালা। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন