রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২০

শ্রীতমা

 শ্রীতমা 

স্কুলের টিফিন এর সময় প্রায় সব মেয়েরাই সবুজ মাঠটাতে ছড়িয়ে পরে।  classroom এর সামনে বারান্দা থেকে তমালি অন্যমনস্ক ভাবে স্কুলের মাঠের দিকে দেখছিল।  নিচু class  এর বাচ্ছা গুলো দৌড়াদৌড়ি করে খেলছে। আর কেউ কেউ ছোট দলে ভাগ হয়ে বসে গল্প করছে। 

এরকম একটা বসে থাকা জটলার দিকে হঠাৎ তমালির চোখ আটকে গেলো। ওই জটলাতে, বছরের মাঝখানে ওদের class ৯ এ নতুন ভর্তি হওয়া তামিল মেয়েটাকে ঘিরে class ৯ এর ওর প্রিয় বন্ধু সুতপাও আছে। সুতপা কে ওর সঙ্গে গল্প করতে দেখে তমালির খুব রাগ হয়ে গেলো। রোজ টিফিন খাবার পরে ও আর সুতপা classroom  এ বসে গল্প করে। কিন্তু ওই নতুন মেয়েটা ভর্তি হবার থেকে ও সব মেয়েদের কাছে popular হয়ে গেছে। 

তমালি স্কুলের president এর মেয়ে আর class  এর first girl .ও সবার সঙ্গে একটু দূরত্ব রেখে চলে। বিশেষ করে গত বছর ওর মা accident এ মারা যাবার পর থেকে ও নিজেকে আরো গুটিয়ে নিয়েছে। সুতপা ছাড়া আর কারো সঙ্গেই যেন কথা বলতে ইচ্ছে করে না। সেই সুতপাই কিনা তমালিকে ছেড়ে ওই মেয়েটার সঙ্গে আড্ডা মারছে। 

মেয়েটাকে  একদম ভালো লাগে না তমালির। একটা অদ্ভুত সেকেলে নাম - শ্রীপঞ্চমী আইয়ার। গায়ের রং বেশ কালো।  মুখোশ্রীও সেরম সুন্দর নয়। শুধু ওর চোখ দুটো কেমন আলাদা। বেশ বড়ো ভাসা ভাসা দুই চোখ। মনে হয় ওর চোখ দুটো যেন সবসময় হাসছে। আর তমালিকে দেখলেই যেন ইচ্ছে করে বেশি হাসে। ওর সঙ্গে চোখাচোখি হলেই তমালি মুখ ঘুরিয়ে নেয়। 

সুতপা বলে ওর মুখে নাকি সব সময় হাসিখুশি ভাব। তমালির ওর ওই হাসিখুশি মুখ দেখলেই খুব বিরক্ত লাগে। আর মেয়েটা ওর দিকে এমন ভাবে তাকে যেন কতকালের চেনা। 

তমালি মাঝে মাঝে confused হয়ে যায়। ওকে কি আগে কোথাও দেখেছে ? সুতপা বলে, ও এই শহরে প্রথম এসেছে। আগে ওর নিজের শহর চেন্নাই তে থাকতো। 

তবে নতুন এসেছে বলে ওর মধ্যে কোনো জড়তা নেই। সবার সঙ্গে ভুলভাল বাংলায় কথা বলার চেষ্টা করে। বন্ধুরা ওর বাংলা শুনে হাসে আর ওকে সঠিক ভাবে বাংলা বলতে শেখায়। ও কিন্তু খুব আগ্রহ নিয়ে বাংলা শেখার চেষ্টা করে। 

তমালি সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছিল, যখন গত শনিবার স্কুলের annual  function  এ শ্রীপঞ্চমী স্টেজ এ ভরতনাট্যম perform করলো। সমস্ত hall হাততালিতে ফেটে পড়েছিল। শুধু তমালি হাততালি দেয় নি। তখন ওর মায়ের কথা মনে পড়ছিলো।  তমালির মাও ভরতনাট্যম নাচতেন। মা যখন stage  এ নাচতো তমালি তখন মুগ্ধ হয়ে মায়ের নাচ দেখতো। মাকে তখন ওর স্বর্গের দেবীর মতন লাগতো। আর ওই কালো মেয়েটা যখন stage  এ নাচ করছিলো তখন ওর নাচ তমালির একটুও ভালো লাগে নি। ও চেন্নাই থেকে এসেছে বলেই কি তমালির ওর ওপর এতো রাগ ?

টিফিন শেষের ঘন্টা পরে, তমালি বাস্তবে ফেরে। সব মেয়েরা নিজের নিজের ক্লাসরুম এর দিকে দৌড় লাগায়।  শ্রীপঞ্চমীও দৌড়ে classroom এ ঢুকলো। ঢোকার সময় তমালির সঙ্গে একটু ধাক্কা লাগে। শ্রীপঞ্চমী sorry বলে দাঁড়িয়ে পরে আর অদ্ভুত ভাবে তমালির দিকে তাকিয়ে থাকে। তমালির আবার মনে হয় এই ছাউনি ওর খুব চেনা। ওকে যেন আগে কোথাও দেখেছে। ওর ওপরে রাগ করতে গিয়েও নরম হয়ে যায় তমালি।  এলোমেলো চিন্তা নিয়ে বাড়ি ফিরলো তমালি।  শোবার ঘরে ঢুকে দেখে মায়ের বড় ছবিটার সামনে বাবা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।  বাবার চোখে জল। 

তমালি জানে, ঠিক এক বছর আগেই এই অভিশপ্ত দিনে এক গাড়ি দুর্ঘটনায় ওর মা গুরুতর আহত হয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় দশদিন হাসপাতালে senseless থেকে তারপর মারা যায়। ওর south India বেড়াতে গেছিলো।  সেদিন বাড়ি ফেরার জন্য চেন্নাই airport যাচ্ছিলো। তখন ওই ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে। তমালির আর কিছু মনে নেই। একটা দুঃস্বপ্ন ওকে তারা করে। মাকে আর কোনোদিনই দেখতে পায় নি।  ও এতো shocked হয়েছিল যে তিন মাস ওর পিসির কাছে Bombay  তে ওর চিকিৎসা করতে হয়েছিল। এখন মায়ের এই ছবিটার সঙ্গে কথা বলে সে। বাবা আর মেয়ে দুজন দুজনকে আগলে রাখে। 

তমালি আস্তে করে বাবার পাশে দাঁড়ায়।  বাবার হাতটা নিজের হাথের মুঠোয় শক্ত করে ধরে বলে, "কেঁদো না বাবা, আমি ভাবি মা বাড়ী নেই।  নাচের show করতে দূরে কোথাও গেছে। "

তমালির বাবা চোখ মুছে বলেন, "ঠিক বলেছিস, এখন থেকে আমিও তাই ভাববো।  তোর মা অন্য ভাবে আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবে। " তারপর প্রসঙ্গ পাল্টে বলেন, "তোকে বলা হয় নি, আজ আমার এক বন্ধু কে dinner এ invite করেছি।অনেকদিন ধরেই ওর এখানে আসার অপেক্ষা করছিলাম। আজ তোর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব। যা তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নে ".

প্রচন্ড কৌতুহল নিয়ে তমালি ঘরবার করতে লাগলো। বাবার কে সেই বিশেষ বন্ধু, যার আসার জন্য বাবা এতো অপেক্ষা করে ? আর আজকের এই ভীষণ দুঃখের দিনে তাকে dinner  এ ডাকতে পারে ?

সন্ধ্যা ঠিক সারে সাতটার সময় calling bell বাজতেই টমলি দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলেই চমকে গেলো। দরজার বাইরে একমুখ হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে শ্রীপঞ্চমী। আর ওর পিছনে একজন অচেনা ভদ্রলোক।

শ্রীপঞ্চমীর চোখও বিস্ফোরিত।  এটা যে তমালির বাড়ি তা ওর ধারণার বাইরে ছিল। ভদ্রলোক ভাঙা বাংলায় বলছেন "তুমি নিশ্চয় তমালি ? Good evening ".তমালির বাবার উচ্ছাসিত গলা শোনা গেলো, "Hello Mr. Iyer, good evening, এতদিন পরে আমার বাড়িতে আসার সময় হলো ?". 

তারপর শ্রীপঞ্চমীর মুখের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলেন। ওর মাথায় হাত রেখে খুব আপন জনের মতন জিজ্ঞেস করলেন  "কেমন আছো মা ?" . 

আজ তমালির শুধু অবাক হবার পালা। বাবা শ্রীপঞ্চমী কে আগে থেকে চিনতো ? ওর কথা কখনো বলেনি তো। 

তমালির বাবা তমালিকে জিজ্ঞেস করলেন "কিরে ওকে চিনতে পারছিস ?" 

- হ্যা আমার class  এ পরে। 

- ভালো করে দেখ, আগে কখনো দেখিস নি ?

- আগে কোথায় দেখেছি, মনে করতে পারছি না। 

- সবাই ওপরে চলো, ঠিক চিনতে পারবি। আসুন Mr. Iyer .

তমালি আর শ্রীপঞ্চমী দুজনেই খুব অবাক হচ্ছিলো। োর কেউ কাউকে আগে দেখে নি অথচ দুজনকেই দুজনের খুব চেনা মনে হয়। 

তমালির বাবা ওদের নিয়ে শোবার ঘরে তমালির মায়ের ছবির সামনে এনে শ্রীপঞ্চমী কে ওর মায়ের ছবিটি ঠিক নিচে দাঁড় করিয়ে দিলেন। 

তারপর তমালিকে বললেন, "এবার শ্রীপঞ্চমীর মুখটা দেখ, মনে হয় না ওর চোখ দুটো হাসছে ? ঠিক যেমন তোর মায়ের চোখ দুটো সবসময় হাসতো। "

তমালি দেখলো, তাইতো, ছবিতে মায়ের হাসি মাখা চাউনি আর ওর দিকে তাকিয়ে থাকা শ্রীপঞ্চমীর চাউনি ঠিক একরকম। এবার যেন ও শ্রীপঞ্চমীকে চিনতে পারছে। 

Mr. Iyer বললেন "তোমরা এতো অবাক হয়ো না। আজ তোমাদের অনেক কথা জানানোর জন্য আমরা সবাই এক জায়গায় হয়েছি"। 

এক বছর আগে ঠিক এইদিনেই দুপুর বেলা প্রায় দুটোর সময় তোমাদের তিনজন কে নিয়ে তোমাদের গাড়িটা চেন্নাই airport এর দিকে যাচ্ছিলো। রাস্তা ফাঁকা থাকায় driver বেশ জোরে গাড়ি চালাচ্ছিল। হটাৎ সে বুঝতে পারে গাড়ির brake fail  করেছে।  Driver প্রাণপনে গাড়ি থামাবার চেষ্টা করে, কিন্তু পারে না।  শেষে উল্টো দিক থেকে আসা একটা scooter কে  ধাক্কা মেরে তারপর রাস্তার বা দিকে একটা বড় গাছে ধাক্কা লাগিয়ে থেমে যায়। Driver , তোমার বাবা আর তোমার বিশেষ কিছু হয় নি। তুমি জ্ঞান হারিয়েছিলে। আর গাড়ির পিছনে বাঁদিকে বসে থাকা তোমার মায়ের মাথায় আঘাত লেগে internal hemorrhage শুরু হয়। ওই scooter এ করে পঞ্চমীর মা ওকে স্কুল থেকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলো।  ওর মায়ের ওখানেই সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু হয়। আর পঞ্চমী scooter থেকে ছিটকে পরে মাথায় চোট পেয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। 

হাসপাতালে নিয়ে যাবার ২৪ ঘন্টা পরে পঞ্চমীর জ্ঞান ফিরে আসলেও দৃষ্টিশক্তি ফিরে আসে না। Specialist ডাক্তার বললেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চোখের operation করতে হবেনইলে চিরকালের মতন অন্ধ হয়ে যাবে। একজন সুস্থ চোখের eye donor লাগবে। আমার তখন পাগলের মতন অবস্থা। ওই হাসপাতালে তোমার মা তখন senseless অবস্থায় ছিলেন।  তোমার বাবার সঙ্গে আলাপ হলো। শুনলাম accident এর পরের দিনই তোমার পিসি এসে তোমাকে তার কাছে মুম্বাই নিয়ে গেছে। তুমি ভীষণ mental shock পেয়েছিলে। 

দুটো পরিবারের উপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়া এক ভয়ঙ্কর বিপদ আমাদের দুজন অসহায়, হতবুদ্ধি বাবাকে কাছাকাছি এনে দিয়েছিলো। আমরা দুজন বাঙালি আর তামিল যেন দুই ভাইএর মতন হয়ে গেলাম। 

দশদিন পর ডাক্তাররা জানালেন তোমার মায়ের brain death হয়েছে। সেই অবস্থায় তোমার বাবা আমার পাশে ঈশ্বরের মতন দাঁড়ালেন।  তার ইচ্ছা অনুযায়ী তোমার মায়ের সুস্থ, সুন্দর চোখ দুটো পঞ্চমীকে দান করে ওর দৃষ্টি ফিরিয়ে দিলেন। তোমার মায়ের চোখ দিয়ে পঞ্চমী এখন এই জগতে সবকিছু দেখতে পারছে। ওর এই সুস্থ স্বাভাকিক জীবন ফিরে পাওয়া তোমার মায়ের দানে সম্ভব হয়েছে। 

আমি তোমার বাবা ও মায়ের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো। এর প্রতিদান দেওয়া যায় না। শুধু পরম কৃতজ্ঞতাই তোমার মাকে স্মরণ রাখার জন্য সেই থেকে পঞ্চমীর নামের আগে তোমার মায়ের নামের "শ্রী" টুকু জুড়ে দিয়েছি। 

তমালির দুচোখ দিয়ে তখন অঝোর ধারায় জল গড়িয়ে পড়ছে। মনে পড়লো ওর মায়ের নাম ছিল শ্রীতমা সান্যাল। তখন চোখের জলের ঝাপসা দৃষ্টিতেও তমালি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলো ওই কালো মেয়ে শ্রীপঞ্চমী ওর মায়ের "শ্রী" টুকু নিয়ে কি সুন্দর হাসছে। আর মায়ের "তমা" টুকু ওর কাছেই রয়ে গেছে। 

শ্রীতমা ভীষণ ভাবে বেঁচে আছে ওদের দুজনের মধ্যে। 

                                                                                                                        - সুস্মিতা সেন 

 




1 টি মন্তব্য: