বুধবার, ১১ মে, ২০১৬

দুয়ে দুয়ে এক

এই সবে ছ  মাস হয়েছে নতুন দেশে এসেছি। দেখেতে দেখতে সময় টা কেটে যাচ্ছে। সংসার যে আমার নতুন তাই নয়। ৫ বছরের পুরনো সংসার । এর আগেও আমি আর ঋত্বিক দুজন মিলে  সংসার পেতেছি-বেঙ্গালুরু এ। আগেই পরিচয় করিয়ে দিই ,ঋত্বিক আমার বর। একসাথে কলেজ এ পড়তাম, খুব ভালো বনধু কে বর করে ফেললাম।

ফিরে আশা যাক সংসার এ। সংসার তো সবাই দুজন মিলেই শুরু করে আর আমি ব্যতিক্রম একেবারেই নই।  কিন্তু  আমরা যা দেখে অভ্যস্ত সেটিকেই নিয়ম বলে মনে করে নি। সেরকমই আমি বরাবর দেখে এসেছি নতুন সংসার পাতার আড়ম্বর টা।

একটা সময় পশ্চিম-বঙ্গে একান্নবর্তী পরিবার এই বেশি দেখা যেত।  বিয়ে করে বউ কে নিয়ে অন্য সংসার করা ভালো চোখে দেখা হত না। আজকেও  হয়ত হয়  না যদি একই শহরে বাস হয় । নতুন বউ এর সংসার সেই একটি ঘরেই বাঁধা থাকে। তার যত সখ আল্হাদ সবই ওই ঘরের চারটি  দেওয়ালের মধ্যে দানা ম্য়ালে। যাইহোক সেটা নিয়ে নাহয় পরে লেখা যাবে। কিন্তু আজকাল তো পশিম-বঙ্গে চাকরির অভাব তাই গত দশ পনের বছর ধরে প্রচুর বাঙালি ছেলে মেয়ে বাইরে চলে যাচ্ছে, ভালো চাকরি র খোঁজে। আর এর সাথে একান্নবর্তী  পরিবার ও লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বিয়ে করেই বর বা বউ কেউ ই আর পাঁচটা মানুষের সাথে সংসার করছে না। একটা ঘর থেকে এখন দুটো ঘরের ফ্ল্যাট এ শুরু  হয় নতুন সংসার।

অবশ্য আমাদের আগের প্রজন্মেও অনেকেই বাইরে চাকরি করতে যেতো। সংখা কম হলেও একেবারে না হওয়া হত না। আমি যা শুনেছি সেই সময় নাকি কেন্দ্রীয় সরকার আর ব্যাঙ্ক এর চাকরি র খুব কদর ছিল আর তার মানেই এক জায়গায় থাকা যাবে না। তো সেই ঘুরে ফিরে, আলাদা সংসার বর আর বউ। তাতে যে কেউ অখুশি থাকত তা বলে তো শুনিনি বরং উল্টোটাই শুনেছি। তবে সেই সংসার পাতার জন্যে ছেলের মা বা মা স্থানীয় কেউ নিসন্ধেঃ যেতেন। এটা একটা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বর  মধ্যে পরত।

এবার নিয়ম এ আসা যাক। বিয়ের পর নতুন বউ কে বেশ কিছুদিন বর বিরহে শশুরবাড়িতে থাকতে হত। বিয়ে তো আর খালি দুটি মানুষ কে নিয়ে নয়, দুটি পরিবার নিয়ে। বউ এর কর্তব্যের মধ্যে পরে যেত বর এর পরিবার চেনা।  বর বাবাজি কে কিন্তু অত সব পরিবার নিয়ে মাথা ঘামাতে হত না। নতুন বউ শশুরবাড়ি তে শাশুড়ির কাছে তালিম পেতো।  ঠাকুরপো ঠাকুরঝি  র সাথে সময় কাটাত আর বর আসার দিন গুনত। শশুরবাড়ি থাকাটা কিন্তু সবসময় মন্দ হত না। মায়ের কাছে শুনেছি মা বেশ আনন্দেই থাকত। আমার কাকা পিসি দের সাথে সিনেমা দেখত, একসাথে আড্ডা, গল্প হোটেল এ খেতে যাওয়া আরো কত কিছু। বর এর সাথে একা একা থাকার চেয়ে হয়ত এটাতেই বেশি আনন্দ হত। কিন্তু বর ছাড়া আর কতদিন, তাই বছর ঘুরে আসতেই  শ্বাশুড়ি নিজে গিয়ে ছেলের কর্মস্থলে বাসা বাড়িতে ছেলের সংসার পেতে আসত।অবস্য সময় টা বাঁধা ছিল না যে, এক বছর ই  শশুরবাড়ি থাকতে হবে । কখনো আগেউ হত কখনো পরে। সবই শাশুড়ির ইচ্ছে। এরম ও শুনেছি যে কোনো কোনো শাশুড়ি ছেলের বউ কে নিজের কাছেই রেখে নিত, আর বর ওই ছুটি তে আসা যাওয়া করত। এরকম ক্ষেত্রে অবশ্য বউ এর জন্যে শশুরবাড়ি থাকাটা খুব আনন্দদায়ক হত না।

আবার ফিরে আসি সংসারে। সংসার পাতা মানে মূলত ছিল নতুন বউ কে জানিয়ে দেওয়া খাবার সংক্রান্ত ছেলে র  পছন্দ অপছন্দের কথা - ছেলে কি খেতে ভালবাসে, কবার চা খায় , জলখাবার কি করে, কটার  সময় করে ইত্যাদি । সংসার চালানো নিয়ে কিছু টিপ্পনি দেওয়া আর নিজের এত বছরের অভিজ্ঞতার কিছু অংশ ভাগ দেওয়া। লক্ষ্য অবশ্য একটাই - ছেলের সংসার যাতে সুখী হয়। তখন কম বয়সে বিয়ে হত, নতুন বউ ছেলেমানুষ থাকত, তাই সংসার ঘোছাতে সাহায্য আর জ্ঞান দুটোই  লাগতো । নতুন বউ ও খুব মন দিয়ে শাশুড়ি র কাছ থেকে সব আসতে আসতে শিখে নিত। কিছুটা নিজের মা য়ের কাছ থেকেও শিখত আর এইভাবেই আরেকটা নতুন সংসার আরম্ভ হত। এই সবই আমার মা, কাকিমা র কাছে শোনা।  আবার কিছুটা দেখাও ,যদিও তার স্মৃতি খুব শিথিল।

আমার তখন পাঁচ বছরর বয়স। বাড়িতে বরকাকার বিয়ে হলো বউ এলো, আমার কাকিমা। আমি আর আমার বোন  কাকিমাকে "মনিমা" বলতাম। বাঙালি পরিবারে এই যে আমরা মামা, কাকা,কাকিমা মামীদের কত  সুন্দর নামে  ডাকি  এইটাই আমার খুব ভালো লাগে - বরমা , ফুলমামা , দাদান পিপি আরো কত কি। মনিমা আমাদের বাড়িতে এলো। বরকাকা তখন জামশেদপুরে চাকুরী করে। মনিমা ও প্রায় ছ মাস মতন শশুরবাড়িতে ছিল। আমার গরমের ছুটি হলো আর আমি ঠাকুমার কাছে চলে এলাম। ঠাকুমা তখন বরকাকার সংসার পাততে যাবে আমিও সঙ্গে গেলাম। এক মাস জামশেদপুরে আমার তো বেশ মজা হয়েছিল। একটা অন্য জায়গায় গরমের ছুটিটা কেটেছিল। মা বলে মায়ের সাথে ঠাকুমা আর আমার ছোটপিসি এসেছিল আর তারা চলে যাবার পর মায়ের খুব একলা লাগত। সত্যি তো ঘরে লোক না থাকলে সারাদিন একা একা কি ভালো লাগে ? আমার তো লাগে না।

এখনো আমি দেখেছি বেশির ভাগ নতুন সংসার গুছিয়ে দিতে কেউ না কেউ গুরুজন আসে। সময়ের সাথে অনেক পরিবর্তন হয়েছে । এখন  শশুড়  শাশুড়ি দুজনেই আসে আবার মাঝে মাঝে বউ এর বাবা মা ও আসে । সংসার পাতার মূল উদ্দেশ্য টা সেই একই - নতুন দম্পতি কে সংসার পাততে সাহায্য করা,তাদের তো আর সেই অভিজ্ঞতা নেই। প্রথম টাই একটু সাহায্য করে দিলে সুবিধেই হয়। সংসার করতে যা যা উপদ্রব লাগার কথা সব কেনা কাটা, রোজকার চটপট  রান্না আরো কত কিছু শেখার থাকে।

যাইহোক আমার সংসার অবশ্য আমি আর ঋত্বিক মিলেই পেতেছি। নিজেদের মতন করে। কিছু কিছু মা বা বোন এর কাছ থেকে ফোনে  এ রান্না শিখতাম আর বাকিটা 'গুগল'।  খুব যে  অসুবিধে হয়েছে তা নয়, কিন্তু কেউ একটু দেখিয়ে দিলে সত্যি সুবিধে হত। তবে একটা জিনিস অনুভব করেছি যে নিজে দের হাতে ঠেকে  শিখে নিজেরা সংসার করেছি বলেই হয়ত আমাদের মধ্যে একটা অন্যরকম মনের মিল তৈরী হয়েছে। আমাদের দুজনের  সংসার কি ভাবে চলে আর কেউ জানে না কারণ কারোর অভিজ্ঞতা র ওপর আমাদের সংসার টা তৈরী হইনি। সংসার পাতার ওই  টক মিষ্টি দিনগুলো একান্তই আমাদের। এটা আমাদের দুজনের সংসার।  

৭টি মন্তব্য:

  1. Good start ... chaliye ja .. banglay type korata besh chaper seta kintu bojha jache :)

    উত্তরমুছুন
  2. Sotti re banglai type korata ektu chaper. Ar ami to prothom bar try korlam. Prochur spelling mistake to nischoi ache.but oi ar ki ja mone elo likhlam. dhorjyo niye porechis thank u.

    উত্তরমুছুন
  3. Good work joyita.. tomader sonsar bhishon bhalo thakuk.. may god bless you both

    উত্তরমুছুন
  4. Daroon likhecho... khoob e bhalo laglo Porte... amio std 12 er por theke sob somoy nijei nijer songsar guchiyechi prothome college e, tarpor chakri jibone deshe bideshe... but buyer por onsite e dujonei korechilam Ma sasuri ar Google er help niye 😉... sotti it's fun and very romantic too.
    Please keep writing and may God bless your songsar 🙂

    উত্তরমুছুন
  5. Sonsari hoito ami chirokal. Home is the most important part of my life. Sob i ma er deoa.

    উত্তরমুছুন